Latest News

ভ্যাকসিন কতটা কাজ দিয়েছে? টিকাকরণের এক বছরে কী বলছেন রাজ্যের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা

চৈতালী চক্রবর্তী

কুড়ি সালের মার্চ মাস থেকে করোনা মহামারী নাড়িয়ে দিয়েছিল দেশকে। গোটা বিশ্বে তখন ত্রাহি ত্রাহি রব। ভারতে শুরুর দিকে সংক্রমণ অতটা দেখা যায়নি। ঝড়টা আছড়ে পড়ে এপ্রিলের পর থেকে। আক্রান্ত হাজার থেকে লাখ ছাড়িয়ে যায়। ভাইরাস ঠেকানোর প্রতিষেধক ভ্যাকসিন কবে আসবে সে নিয়ে হইচই শুরু হয়ে যায়। আতঙ্কের প্রহর কাটে, কোভিড ভ্যাকসিন আসতে শুরু করে একুশের জানুয়ারি থেকে। ১৬ জানুয়ারি প্রথম টিকাকরণ হয় দেশে। সে সময় চার ক্যাটেগরিতে কারা টিকা পাবেন তা বেঁধে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। প্রথম ক্যাটেগরিতে ছিলেন ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। জরুরি ভিত্তিতে প্রথম করোনা টিকার ডোজ নেন তাঁরাই।  তারপর এক বছর কেটে গেছে। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ পেরিয়ে বিধ্বংসী থার্ড ওয়েভ হানা দিয়েছে। এক বছর পরে এখন কেমন আছেন ডাক্তারবাবুরা, ভ্যাকসিন কতটা কাজে দিয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা?

ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বললেন রাজ্যের কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক।

 

বুস্টার ডোজ আরও আগে আসা দরকার ছিল

 

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (সিনিয়র পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্ট) ডাক্তার সুবর্ণ গোস্বামী বলেছেন, টিকাকরণের শুরুতেই ডাক্তাররা ভ্যাকসিনের ডোজ পান। তখন কোভিশিল্ড বা কোভ্যাক্সিনের দুটি ডোজের মধ্যে এতটা সময়ের ব্যবধান রাখা হয়নি। একমাসের ব্যবধানেই দুটি ডোজ দেওয়া হয ডাক্তারদের। করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদেরই থাকতে হবে আগে। দিবারাত্র কোভিড ওয়ার্ডে ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। সে সময় করোনা রোগীদের চিকিৎসাতেই দিনরাত অতিবাহিত করছিলেন ডাক্তাররা। অনেকেই সংক্রমিত হয়ে পড়েছিলেন, মৃত্যও হয়েছিল অনেকের। তাই ডাক্তারদের আগে সুরক্ষিত রাখাটা দরকার ছিল।

এই এক বছরে করোনাভাইরাসে অনেক বদল এসেছে। ডাক্তারবাবু বলছেন, টিকার দুটি ডোজ প্রথম ধাক্কাটা সামলে দেয়। সেকেন্ড ওয়েভের সময় যেভাবে সংক্রমণ বেড়েছিল তাতে ভ্যাকসিন না এলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারত। সেক্ষেত্রে টিকা নিঃসন্দেহে সুরক্ষা দিয়েছে অনেকটাই। তবে সংক্রমণের এই বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতে গেলে দরকার ভ্যাকসিনের তৃতীয় ডোজ তথা বুস্টার। এই বুস্টার ডোজ গত বছর নভেম্বরেই দেওয়ার ভাবনাচিন্তা হয়েছিল, পরে সিদ্ধান্তে বদল আসে। ডাক্তারবাবুর বক্তব্য, বুস্টার ডোজ যদি আরও আগে দেওয়া হত তাহলে সংক্রমণের এতটা বাড়াবাড়ি হত না। সার্স-কভ-২ ভাইরাসকে যে ভ্যাকসিন দিয়ে পুরোপুরি ঠেকানো যাবে তা বলা হয়নি। তবে বুস্টার ডোজ সংক্রমণের ধাক্কা অনেকটাই রুখে দিতে পারে। জটিল রোগ হওয়ার সম্ভাবনাও সেক্ষেত্রে কম।

 

ভ্যাকসিন নেওয়ার উৎসাহ বাড়ানোই লক্ষ্য

 

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কমিউনিটি মেডিসিন) ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ অনির্বাণ দলুই বলেছেন, ভ্যাকসিন কার্যকরী নিঃসন্দেহে, তবে টিকা নেওয়ার উৎসাহ তৈরি করাই আসল লক্ষ্য। যত বেশি মানুষ ভ্যাকসিন নেবেন, ততই তাড়াতাড়ি সংক্রমণ জয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাব আমরা।

ডাক্তারবাবু বলছেন, ভ্যাকসিন সুরক্ষিত, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তেমনভাবে হয়নি। ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সময়েই দেখা গেছে সাইড এফেক্টস হলেও তা খুবই নগন্য। তাছাড়া, ভ্যাকসিনের আরও একটা কার্যকরী দিক হল জটিল রোগের আশঙ্কা কমিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে কোমর্বিডিটির রোগীদের অনেকটাই সুরক্ষা দিয়েছে কোভিড ভ্যাকসিন। এবারে লক্ষ্য হল ভ্যাকসিনের সচেতনতা বাড়ানো। ভ্যাকসিন নেওয়া কেন দরকার সে নিয়ে বার বার বোঝানোর পরেও দেখা গেছে, যখনই কোভিডের কোনও ওয়েভ এসেছে মানুষ ভ্যাকসিন নেওয়ার উৎসাহ হারিয়েছেন। প্রথম ডোজ নেওয়ার পরে সেকেন্ড ডোজ নিতে অনীহা দেখা গেছে অনেকের। যদি ভ্যাকসিনেশনের হার দেখা হয়, তাহলে বোঝা যাবে গ্রাম ও শহরের মধ্যে টিকা নেওয়ার হারে কতটা তফাৎ রয়েছে। তাই সার্বিক স্তরে সচেতনতা বাড়ানোই লক্ষ্য।

সরকার ভ্যাকসিনের জোগান দিচ্ছে, আর আমাদের কাজ ভ্যাকসিন নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো, এমনটাই বললেন ডা. অনির্বাণ দলুই। ডাক্তারবাবু বলছেন, সারা রাজ্যেই কোভিড কেয়ার নেটওয়ার্ক সক্রিয়। এদের কাজ হল সাধারণ মানুষকে ভ্যাকসিনের উপকারিতা বোঝানো। ভাবনা প্রকল্পও কাজ করছে বাংলায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার নানা জায়গা, সুন্দরবন, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরে ভাবনা প্রকল্প কাজ করছে। গ্রামীণ বাংলার মানুষকে ভ্যাকসিন নিতে উৎসাহিত করাই এই প্রকল্পের কাজ। যত বেশি মানুষ টিকা নেবেন ততই দ্রুত হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হবে। বার বার করোনার নতুন নতুন ঢেউ আছড়ে পড়বে না।


মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়েছে ভ্যাকসিন

আইসিএমআর-নাইসেডের প্রাক্তন বিজ্ঞানী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ দীপিকা সুর বলছেন, ভ্যাকসিন নিয়ে কোমর্বিডিটির অনেক রোগীই সুরক্ষা পেয়েছেন। আবার ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও সংক্রমণ হতে দেখা গেছে অনেকের। কোভিডের রিইনফেকশন হয়েছে এমন উদাহরণ অজস্র। এখন ওমিক্রন-ডেল্টার সময় ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও সংক্রমিত হয়েছে বহু মানুষ। তাই ভ্যাকসিন যে পুরোপুরি সফল তা বলা যায় না, তবে ভ্যাকসিনের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হল সংক্রমণের প্রথম ধাক্কাটা ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে অনেকটাই। ভ্যাকসিন না থাকলে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ত। ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ যাঁরা পেয়ে গেছেন তাঁরা আর কিছু না হলেও মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে বেঁচে গিয়েছেন। ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে হাসপাতালে ভর্তির সম্ভাবনাও কম।

ডাক্তার দীপিকা আগেই ‘দ্য ওয়াল’কে বলেছিলেন, ‘ব্রেকথ্রু ইনফেকশন’ অর্থাৎ ডেল্টা বা সংক্রামক স্ট্রেনের ইনফেকশন ফিরে আসার আশঙ্কা আছে। ব্রিটেন থেকে যে ডেল্টা স্ট্রেন ঢুকছে আর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে যে ডেল্টা স্ট্রেন ঢুকছে তারা কিন্তু জিনের বিন্যাসে আলাদা। কাজেই মিউটেশন বা জিনগত বদলের কারণে যদি নতুন কোনও স্ট্রেনের জন্ম হয় এবং পশ্চিমবঙ্গেই হয়, তাহলে দ্বিতীয় ঢেউয়ের থেকেও খারাপ অবস্থা তৈরি হবে।  ওমিক্রনের সংক্রমণ সেটাই প্রমাণ করেছে। ভ্যাকসিনের তৃতীয় ডোজ তথা বুস্টার বা প্রিকশনারি ডোজ এই সংক্রমণের ধাক্কা অনেকটাই রুখতে পারবে বলে মনে করছেন তিনি। তবে ডাঃ দীপিকার মত, ভ্যাকসিন নিলেও মাস্ক পরুন, সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং বজায় রাখুন। প্রায় কোনও বিধির তোয়াক্কা না করে মানুষজন যদি শঙ্খলার জলাঞ্জলি দেন, তাহলে কোভিডের ঢেউ একের পর এক আসতেই থাকবে।

 

শরীরের ইমিউনিটি বেড়েছে নিঃসন্দেহে, রিইনফেনকশ হলেও সেরে যাচ্ছে

ভ্যাকসিনের তিনটি ডোজ নেওয়া থাকলে মৃত্যুর মুখে যেতে হবে না, এমনটাই মনে করছেন এসএসকেএমের ইএনটি বিভাগে ‘ইনস্টিটিউট অব ওটোরাইনোল্যারিঙ্গোলজি অ্যান্ড হেড অ্যান্ড নেক সার্জারি’-বিভাগের প্রধান ডা. অরুণাভ সেনগুপ্ত। ডাক্তারবাবু বলছেন, “কুড়ি সালের মে মাসে আমি কোভিড আক্রান্ত হই। অবস্থা সঙ্কটজনক ছিল। বাঁচব কিনা ঠিক ছিল না। সেখান থেকে ফিরে আসি। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে জটিল রোগের সম্ভাবনা কমেছে। কোমর্বিডিটির রোগীদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন অবশ্যই কার্যকরী হয়েছে।”

ডাক্তারবাবু বলছেন, ভ্যাকসিন করোনাকে পুরোপুরি দমিয়ে দিতে পারছে তা নয়। কারণ টিকা নেওয়ার পরেও সংক্রমিত হয়েছেন বা এখনও হচ্ছেন অনেকে। তবে সেই সংক্রমণে জটিলতা কম। আক্রান্ত হচ্ছেন আবার সেরেও যাচ্ছেন। এর কারণই হল ভ্যাকসিন প্রাথমিক পর্যায়ে শরীরে ইমিউনিটি তৈরি করেই রেখেছে। তাই ভাইরাস ঢুকলেও তার বিভাজন ক্ষমতা শরীরে কমে যাচ্ছে। ফলে তেমন সঙ্কটজনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ নিয়েছেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে খুম কমজনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। বেশিরভাগই মৃদু বা মাঝারি সংক্রমণের পরে সেরে উঠেছেন। আর প্রিকশনারি ডোজ নিলে সংক্রমণের সম্ভাবনা আরও কমে যাচ্ছে। কারণ শরীরে নতুন করে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে।

ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সুবর্ণ গোস্বামী ও রাজ্যের বিশিষ্ট চিকিৎসকরা আগেই বলেছিলেন, কোভিড ভ্যাকসিনের দুটো ডোজ নেওয়ার পরেও সংক্রমিত হয়েছেন এমন রোগীরা আছেন, তবে রোগ ততটা জটিল হয়নি। প্রতি দশ হাজারে হয়তো কয়েকজনের দ্বিতীয়বারও সংক্রমণ মারাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে সেই সংখ্যা কম। পুণঃসংক্রমণ তখনই সিভিয়ার হবে যখন আক্রান্তের থেকে সংক্রমণ আরও কয়েকজনের মধ্যে ছড়াবে। ধরা যাক, যিনি ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ নিয়েছেন তাঁর দ্বিতীয়বারও সংক্রমণ হল। যেহেতু টিকা নেওয়া আছে তাই ভাইরাল লোড কম হল, এবার তাঁর থেকে যতজনের মধ্যে ছড়াবে তাঁদের রোগ কিন্তু বড় হয়ে দেখা দিতে পারে।

এই রিইনফেকশন রোখার একটা উপায় হল কোভিডের বুস্টার ডোজ। মানে দুটি ডোজের পরেও তৃতীয় ডোজ। সেকেন্ড ডোজ নেওয়ার ছ’মাসের মধ্যে এই বুস্টার ডোজ নিলে সংক্রমণ ফিরে আসার ঝুঁকি কমে। দেশে এখন বুস্টার বা প্রিকশনারি ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে। ডাক্তারবাবুরা মনে করছেন, এই বুস্টার ডোজ সকলে নিলে সিভিয়ার ইনফেকশন ও রিইনফেকশনের সম্ভাবনা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাবে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকাসুখপাঠ

You might also like