Latest News

বঙ্গ বিজেপিতে উল্কা উত্থান অমিতাভর, নেপথ্যে কি এই দক্ষিণী

দ্য ওয়াল ব্যুরো: অমিতাভ চক্রবর্তী কে গো? কে এই অমিতাভ চক্রবর্তী? অমিতাভ চক্রবর্তী নামে যাঁকে নিয়ে হইচই, কে তিনি?

রাজ্য বিজেপিতে এখন মুখে মুখে ঘুরছে এই প্রশ্ন। কারণ, দলের সাধারণ সমর্থকেরা তো বটেই, অনেক কর্মী, এমনকী সংগঠনেরও অনেকের নামটি জানা ছিল না। মিডিয়ার সূত্রে, আবার এই অপরিচিত মুখকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি চর্চা।

কেন? কী ভাবে? কে এই অধুনা চর্চিত বিজেপি নেতা?

দুশোর স্বপ্ন দেখিয়ে ৭৭-এ থেমে যাওয়া বিজেপি সাংগঠনিক ভাবে যে ফাঁপা তা ২ মে টের পাওয়া গিয়েছিল। তারপর থেকে বিজেপি বাংলায় শুধুই ভেঙেছে। ক্ষয় আর ক্ষয়। এর মধ্যেই সাংগঠনিক রদবদল, নতুন কমিটি, চেনামুখগুলোকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া সব মিলিয়ে বিজেপি কার্যত জতুগৃহ। ক্ষোভের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে গেরুয়া শিবির। যে ক্ষোভ মূলত অমিতাভ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। বনগাঁ লোকালের কামরা থেকে বিজেপি রাজ্য দফতরের অদূরে তাঁর বিরুদ্ধে পোস্টার, ফ্লেক্স- অমিতাভ চক্রবর্তী হঠাও, বিজেপি বাঁচাও।

তাঁকে উদ্দেশ করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর বলেছেন, একজন ব্যক্তি বাংলা বিজেপিকে কুক্ষিগত করতে চাইছেন। কোনও পোস্টারে লেখা অমিতাভ চক্রবর্তী দুর হটো। কোনোটায় লেখা তিনি তৃণমূলের দালাল, ভোট কুশলী পিকের লোক।

বিজেপির মতো একটা রেজিমেন্টেড পার্টিতে কী ভাবে এত শক্তিধর হয়ে উঠলেন তিনি? নেপথ্যে কে? অমিতাভর উত্থানই বা হল কী ভাবে?

বছর ৪৪-এর এই নেতা গঙ্গারামপুরের ভূমিপুত্র। গঙ্গারামপুর কলেজে পড়ার সময়ে পতাকাহীন হয়ে লড়ে হারিয়ে দিয়েছিলেন এসএফআই-কে। ওই সময়ে সিপিএমের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রার্থী হওয়াটাই ছিল চ্যালেঞ্জিং। তার উপর আবার জয়।

সেই সময়ে তেমন কোনও মতাদর্শগত অবস্থান না থাকলেও ধীরেধীরে সঙ্ঘের ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদে যুক্ত হন অমিতাভ। নিষ্ঠাভরে সংগঠন করার কারণে এবিভিপি-তে তাঁর উত্তরণটাও দেখার মতো। বিদ্যার্থী পরিষদের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। তারপর পূর্ব ক্ষেত্রের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) নিযুক্ত হন। বাংলা, বিহার, ওড়িশা, আন্দামান ছিল তাঁর কাজের ক্ষেত্র।

২০১৮ সালে রাজ্য বিজেপির সংগঠন সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চট্টোপাধ্যায়ের সহকারী করে দু’জনকে পাঠায় দিল্লি। এক অমিতাভ চক্রবর্তী এবং দুই কিশোর বর্মন। সুব্রত ছিলেন দিলীপ ঘোষের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নিউটাউনের এক বাড়িতে থাকেন সঙ্ঘ থেকে উঠে দুই প্রচারক।

রাজ্য বিজেপি-তে সুব্রত-দিলীপের জুটির কথা মুখে মুখে ঘোরে। দেখা যায় সেই তাঁকেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে লোকসভা ভোটের পরে। সুব্রতর স্থলাভিষিক্ত হন অমিতাভ।

বিজেপিতে সংগঠন মহামন্ত্রীর গুরুত্ব, ক্ষমতা বিপুল। অনেকের মতে, একুশের ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করেই অমিতাভ রাজ্য কমিটি সাজিয়েছেন। যাতে ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে গেরুয়া শিবির।

সবাইকে এ ভাবে একসঙ্গে ছেঁটে ফেলা কম বড় কথা নয়। প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়ন্তন বসু, রীতেশ তিওয়ারি—রাজ্য বিজেপির পরিচিত মুখ সবাই বাদ। এঁদের ক্ষেত্রে নব্য বিজেপির তকমাও দেওয়া যাবে না। এঁরা যে অন্য দল থেকে গেরুয়া শিবিরে ক্ষমতার ঝোঁকে ঢুকেছেন তাও নয়। অনেকের মতে, এই নেতাদের বাদ দিয়ে দেওয়ায় অমিতাভর বিরুদ্ধে রাজ্য পার্টিকে কুক্ষিগত করার অভিযোগ অনেকের কাছেই মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতাদের সম্মানজনক পদ দিতেই পারতেন অমিতাভ।

সকলেরই গেরুয়া যুগ কৈশোর অথবা তরুণ বেলার। সেই তাঁদের ছেটে ফেলতেও ক্ষমতা লাগে। কোথা থেকে এল এই ক্ষমতা? অমিতাভ কি একাই সবটা করছেন? নাকি নেপথ্যে রয়েছেন অন্য কেউ?

অনেকে বলছেন, বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) বিএল সন্তোষের জোরেই বাংলা বিজেপির খোলনলচে বদলে দিতে চেয়ছেন অমিতাভ। তিনি সন্তোষের অত্যন্ত স্নেহভাজন ও ঘনিষ্ঠ। যাঁরা মনে করেন, দল বদলে আসা নেতাদের দিয়ে বাংলা বিজেপির নতুন কিছু করা সম্ভব নয়। বিজেপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে, সংগঠনকে মতাদর্শগতভাবে পোক্ত করতে হলে, ফিরে যেতে হবে গোড়ায়। ব্যাক টু বেসিক। সেটা কী? সেটা আরএসএস মানে সঙ্ঘ নেতৃত্ব। আর এই সত্যটা জানা থাকায় বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের অমিতাভর করে দেওয়া রাজ্য কমিটিতে সিলমোহর দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। যদিও দুজনের সম্পর্কের রসায়ন মোটেই সৌহার্দের নয়। আসলে সুকান্ত এখনও রাজ্য পার্টিতে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেননি।

দেখা যাচ্ছে বাংলায় যাঁদের নিয়ে সংগঠন সাজিয়েছেন অমিতাভ তাঁরা সকলেই তাঁর সঙ্গে এবিভিপি করতেন। পাঁচ জন সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে লকেট চট্টোপাধ্যায় আর অগ্নিমিত্রা পালকে বাদ দিলে বাকি তিনজন জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, দীপক বর্মন এবং জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো—অমিতাভর সঙ্গে বিদ্যার্থী পরিষদ করতেন। যুব মোর্চার সভাপইতি ইন্দ্রনীল খাঁ এবং মহিলা মোর্চার সভাপতি—সকলেই সঙ্ঘের ছাত্র শাখা বিদ্যার্থী পরিষদ থেকে উঠে এসেছেন।

যা দেখে অনেকেই মনে করছেন, বাংলা বিজেপিকে আরও তীব্র হিন্দুত্বের লাইনে হাঁটানোই লক্ষ্য অমিতাভদের। যা অন্য দল থেকে আসা নেতাদের দিয়ে হবে না বলেই তাঁরা মনে করছেন। ধ্রুপদী ধারণাতেই বাংলা বিজেপির সংগঠনকে ঢেলে সাজতে চাইছেন অমিতাভ। আর তাতেই মুরলীধর সেন লেনের গেরুয়া বাড়ির ভিতরের ঝগড়া সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে নেমে এসেছে। বনগাঁয় বিক্ষুব্ধদের বনভোজন, পোর্ট ট্রাস্টের গেস্ট হাউসে পৃথক বৈঠক, লাইন দিয়ে বিধায়ক-নেতাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া—এসবই অন্তর্দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। যার কেন্দ্রে অমিতাভ। যাঁকে হয়তো অনেক জেলা বা ব্লক স্তরের বিজেপি নেতাও চেনেন না।

You might also like