Latest News

ভারতীয় সাহিত্যের ম্যাক্সিম গোর্কি, কে এই লেখক?

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: রাশিয়া থেকে ভারতবর্ষ প্রায় ৫০০০ কিলোমিটারের দূরত্ব। অথচ এই দুই দেশের মাটিতে মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে এমন দুজন মানুষ জন্মেছিলেন যাঁদের শৈশব কৈশোর ছিল এক সুতোয় বাঁধা। একজন ম্যাক্সিম গোর্কি (১৮৬৮ — ১৯৩৬), অন্যজন মুন্সি প্রেমচন্দ (১৮৮০ — ১৯৩৬)। দুজনেই ছদ্মনামে বিখ্যাত। দুজনেরই ছোটোবেলা কেটেছে ভয়াবহ অভাবে অনটনে অবহেলায়। দুজনেই বাবা মা’র স্নেহ ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দুজনেরই লেখাতে উঠে এসেছে সর্বহারা, শোষিত, হতভাগ্য মানুষের কঠিন জীবনযুদ্ধের কথা। দুজনেরই মৃত্যু ঘটেছে একই বছরে, ১৯৩৬ এ। মুন্সি প্রেমচন্দকে বলা হয় হিন্দি সাহিত্যের ম্যাক্সিম গোর্কি। কেউ কেউ অবশ্য তাঁকে বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তুলনা করে থাকেন। শরৎচন্দ্রের মতোই তাঁর গল্প উপন্যাসে ছড়িয়ে আছে এদেশের ধূলিধূসর প্রান্তিক মানুষের ঘাম, অশ্রু, আর্তনাদ ও জেহাদ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনার সঙ্গেও তাঁর লেখার আদর্শগত মিল আছে। (Munshi Premchand)

Image - ভারতীয় সাহিত্যের ম্যাক্সিম গোর্কি, কে এই লেখক?
মুন্সি প্রেমচন্দ

বাবা মায়ের মৃত্যুর পর দশ বছরের গোর্কিকে তাঁর নিষ্ঠুর বদমেজাজি দাদু পরিষ্কার মুখের উপর বলে দিয়েছিলেন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। ওইটুকু বয়সে পথে বেরিয়ে জার-শাসিত নিষ্ঠুর রাশিয়াকে নিজের চোখে দেখলেন গাের্কি। সেই সময় বেঁচে থাকার জন্য কিশোর গাের্কিকে এই নির্মম বাস্তব পৃথিবীতে যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, তা শুনলে পাষাণ মানুষের চোখেও জল আসবে।

ম্যাক্সিম গোর্কি

১৮৮০ সালের ৩১ জুলাই বেনারসের লামহিতে জন্মেছিলেন ধনপত রায় শ্রীবাস্তব। বাবা ছিলেন ডাকঘরের সামান্য কেরানি। কাকা স্নেহবশত নাম রেখেছিলেন নবাব। গোর্কির কাঠমিস্ত্রি বাবার মতোই প্রেমচন্দের বাবাও ছিলেন প্রায় দিন আনি দিন খাই মানুষ। দারিদ্র‍্যের কারণে গোর্কির প্রথাগত শিক্ষালাভের সুযোগ হয়নি। কিন্তু আশ্চর্যভাবে তাঁর ছিল বই পড়ার নেশা। গোর্কি ছিলেন স্বশিক্ষিত মানুষ। দারিদ্র‍্যের জন্য প্রেমচন্দেরও লেখাপড়া ব্যাহত হয়েছে বারবার। কিন্তু তাঁরও ছিল অসম্ভব বই পড়ার নেশা। (Munshi Premchand)

প্রেমচন্দকে বলা হয় আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের জনক। ১৯১০ সালে ‘বড়ে ঘরকী বেটি’ প্রকাশিত হলে উর্দু সাহিত্যে তিনি বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘গোদান’।

উর্দু দিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ‘সোজ-এ-বতন’ (১৯০৭) গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘দুনিয়া কা সবসে আনমোল রতন’। তাঁর প্রথম হিন্দি গল্প ‘সৌত’ প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে।
ডঃ কমলকিশোর গোয়েঙ্কা প্রেমচন্দের সমস্ত গল্প একত্রে প্রকাশ করেছেন। তিনি ১৪ টি উপন্যাস ও তিন শতাধিক ছোটোগল্প লিখেছেন। সেগুলি প্রকাশিত হয় প্রথম গল্প সংকলন “সোজ-এ-ওঅতন” থেকে আরম্ভ করে হিন্দি “সপ্ত-সরোজ”, “নও-নিধি, “বড়ে ঘর কী বেটী”, ” প্রেম-পচীশী”, “প্রেম-প্রসূন”, “প্রেমতীর্থ’, “প্রেম-চতুর্থী “, “পঞ্চ ফুল”, “অগ্নি-সমাধি”, “সুপ্ত-সুমন”, ‘প্রেম -পঞ্চমী’ ইত্যাদি গ্রন্থে। ভারতের প্রায় সমস্ত ভাষায় তাঁর ছোটোগল্প ও উপন্যাসসমূহ অনূদিত হয়েছে।

Image - ভারতীয় সাহিত্যের ম্যাক্সিম গোর্কি, কে এই লেখক?

প্রেমচন্দ বেশ কিছু নাটকও লিখেছেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘সংগ্রাম'(১৯২৩), কর্বলা(১৯২৪), প্রেম কি দেবী(১৯৩৩), ‘তজুর্বা, ‘রুহানী সাদি’ প্রভৃতি। তবে কথাশিল্পী হিসেবে তিনি যতটা সাফল্য অর্জন করতে পেরেছিলেন নাট্যকার হিসেবে ঠিক ততখানি সাফল্য পাননি। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলির মধ্যে বিশেষ সাড়া ফেলেছিল ‘হংস’, ‘মাধুরী’, ‘জাগরণ’ ইত্যাদি। এছাড়া সাহিত্যের উদ্দেশ্য, পুরনো সময় নতুন যুগ, স্বরাজের সুবিধে, কাহিনি কলা, হিন্দি-উর্দু ঐক্য, মহাজনী সভ্যতা , উপন্যাস, জীবনে সাহিত্যের স্থান- এইসব বিষয় নিয়ে একাধিক প্রবন্ধও লিখেছেন তিনি। (Munshi Premchand)

ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ হয়েছিল প্রেমচন্দের। বয়সে কিছুটা বড়, স্বভাবে মুখরা ও জেদি সেই স্ত্রী প্রেমচন্দের সৎ মায়ের সঙ্গে কলহ করে একবার গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে প্রেমচন্দ তাঁকে তিরস্কার করেন। রাগে ও অভিমানে সেই স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে বাপেরবাড়ি চলে যায় সারা জীবনের জন্য। এর বেশ কিছুকাল পরে শিবরানি নামে এক বিধবাকে বিয়ে করেন প্রেমচন্দ। বিধবাবিবাহ সেসময় এক বিতর্কিত ও জ্বলন্ত সামাজিক সমস্যা ছিল। এই বিয়ের জন্য যথেষ্ট মূল্য দিতে হয়েছে প্রেমচন্দকে। তাঁকে কী তীব্র সামাজিক দ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়েছিল সেসময়, তার জীবন্ত স্বাক্ষর ফুটে উঠেছে তাঁর ‘প্রেমা’ উপন্যাসে। ওই উপন্যাসের অমৃত রায় বিধবাবিবাহ করেছিল বলে গ্রামের দোকানদার তার কাছে কোনও জিনিস বিক্রি করত না। মক্কেলরা তাকে এড়িয়ে চলত। সহকর্মীরা তার সমালোচনা করত। প্রতিবেশীরা ভাবত সে বিধর্মী হয়ে গেছে।

কী চমৎকার সব ছোটোগল্প লিখে গেছেন মুন্সি প্রেমচন্দ। ‘নরক কা মার্গ’ গল্পে এক গৃহবন্দিনী নারীর প্রবল মুক্তিকামনা প্রকাশিত হয়েছে। স্বামী বেঁচে থাকতে সে সিঁদুর পরেনি। বিধবা হবার পরেও হাতের চুড়ি ভাঙেনি। স্বাধীন জীবনযাপনের প্রত্যাশায় শেষ পর্যন্ত ঘর ছাড়ে সে। দাঙ্গার আবহে লেখা ‘মন্দির ঔর মদজিদ’ গল্পে সম্প্রীতির আশ্চর্য ছবি তুলে ধরেছিলেন প্রেমচন্দ। সে গল্পের নায়ক চৌধুরী ইতবাৎ আলী ধর্মপ্রাণ মুসলমান হয়েও সমস্ত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সে গঙ্গায় নিয়মিত স্নান করে, গঙ্গাজল পান করে। সমস্ত ধর্মগ্রন্থই তার প্রিয়।

‘সওয়া সের গেহু’ একটি অসাধারণ সৃষ্টি। গ্রামের এক গরিব চাষি অতিথিসেবার জন্য এক পুরোহিতের কাছে সোয়া সের গম ধার করেছিল। ফসল ওঠার পরে ওই গম সে ফেরত দেয়। কিন্তু মুখে বলেনি যে, ধার শোধ হল। পুরোহিত তাই সেটাকে তার বাৎসরিক প্রণামী বলে ধরে নেয়। এবং সাত বছর পরে সুদে আসলে সেই গম ফেরত চায়। তখন তার মূল্য ১০০ কেজি গম বা ১২০ টাকা। পুরোহিত তাকে ধর্মের ও পাপের ভয় দেখায়। নিরীহ চাষি ওই ধার ফেরত দেবার চেষ্টা করে। কিন্তু সুদের অঙ্ক বেড়েই চলে। কুড়ি বছরেও শোধ হয় না ঋণ। চাষির মৃত্যুর পর ঋণ শোধের দায়িত্ব নেয় তার ছেলে। কিন্তু ছেলেও পুরোহিতের দাসত্ব করে পিতৃঋণ শোধ করতে পারে না। অর্থনৈতিক শোষণের ও ধর্মীয় ভণ্ডামির এক জ্বলন্ত চিত্র এই গল্প।

সদগতি গল্পে চামার বস্তির দুখী গ্রামের পণ্ডিত ঘাসিরামের ঘরে তীব্র দহনবেলায় কাঠ চেরাই করে। বেগার শ্রম দেয়। দুর্বল শরীরে অত কঠিন পরিশ্রম করতে গিয়ে সে মারা যায়। চামার বস্তির লোকেদের ডাকলেও তারা আসেনা দুখীর মৃতদেহ সৎকারের জন্য নিয়ে যেতে। পণ্ডিতও চামারের মৃতদেহ ছোঁয় না। শেষে পায়ে দড়ি বেঁধে ঘাসিরাম তাকে টানতে টানতে গ্রামের বাইরে ফেলে এসে গঙ্গাস্নান করে দুর্গানাম নিয়ে ঘরে ফেরে। আর দুখীর মৃতদেহ শকুন কুকুরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। তার জীবনব্যাপী সেবা, নিষ্ঠা ও ব্রাহ্মণভক্তির এটাই পুরস্কার। জাতিভেদ প্রথা ও সামাজিক শোষণের এক করুণ আলেখ্য এই গল্প।

কফন গল্পে মাধব ও তার বাপ ঘিসু দরজার সামনে বসে আলু পোড়া খাচ্ছে। এই দরিদ্র চামার পরিবারের হাতে কোনও কাজ নেই। ক্ষুধা তাদের নিত্যসঙ্গী। ঘরে ভিতরে মাধবের বউ বুধিয়া প্রসববেদনায় আর্তনাদ করছে। কিন্তু বাবা ও ছেলের মধ্যে কেউ আলুর মালসা ছেড়ে উঠে যাচ্ছে না বুধিয়াকে সাহায্য করতে, পাছে অন্যজন বেশি আলু খেয়ে ফেলে। একসময় বুধিয়া মারা গেল। তখন বাবা ও ছেলে জমিদারের কাছে গেল কফনের কাপড় কেনার জন্য ভিক্ষে চাইতে। জমিদার ও মহাজনেরা দু আনা চার আনা করে মোট পাঁচ টাকা দিল। পথে যেতে যেতে তারা ভাবল, কাপড় তো আগুনে পুড়েই যাবে। কী হবে কাপড় কিনে। তার চেয়ে এই পাঁচ টাকা দিয়ে একদিন অন্তত পেট ভরে পান ভোজন করা যাক। বুধিয়া পুণ্যাত্মা। সে ঠিক স্বর্গে যাবে। কারণ সে মরে গিয়ে তাদের একদিনের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সে স্বর্গে যাবে না তো কি ওই মোটা মোটা লোকগুলো স্বর্গে যাবে, যারা গরিবকে দুহাতে লুটে খায় আর গঙ্গায় পাপ ধুয়ে মন্দিরে গিয়ে জল ঢালে? জামিয়া পত্রিকায় (১৯৩৬) এই গল্পটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে সাড়া পড়ে গিয়েছিল।
শোনা যায় প্রেমচন্দ একবার তাঁর গল্পসংগ্রহের ভূমিকা লেখার জন্য শরৎচন্দ্রের কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র গল্পগুলি পড়ে বলেছিলেন, এ বইয়ের ভূমিকা লেখার উপযুক্ত মানুষ একমাত্র রবীন্দ্রনাথ। তবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রেমচন্দের সম্ভবত কখনও সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ খোঁজখবর রাখতেন তাঁর লেখালেখির। তাঁর মৃত্যুর পর শোকাহত রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন : ‘এক রত্ন পেয়েছিলে, তোমরা হারিয়ে ফেলেছ।’
৫৭ টি অধ্যায়ে সম্পূর্ণ সেবাসদন উপন্যাসটি প্রেমচন্দকে বিপুল অর্থ ও জনপ্রিয়তা দান করে। প্রেমাশ্রম উপন্যাসে অত্যাচারের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ভারতের চাষিদের সমবেত প্রতিবাদ ও জাগরণের চিত্র লক্ষ করি। গোদান হল গ্রামীণ ভারববর্ষের কৃষিনির্ভর মানুষের এক সুবিশাল গদ্যে রচিত মহাকাব্য। সামন্ত প্রভু ও ধনিকশ্রেণির শোষণের নির্মম বর্ণনায় ঋদ্ধ এই উপন্যাসটি। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হরি। সে যেন এ দেশের নিম্নবর্গীয় শোষণক্লিষ্ট মানুষের প্রতিনিধি।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর ১৯২০ সালে গান্ধিজির সঙ্গে প্রেমচন্দের সাক্ষাৎ হয় গোরখপুরে। এর প্রতিক্রিয়ায় গান্ধিজির অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে প্রেমচন্দ তাঁর কুড়ি বছরের সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন। ১৯২১ সালে গোরখপুর থেকে ফিরে আসেন বেনারসে।

Image - ভারতীয় সাহিত্যের ম্যাক্সিম গোর্কি, কে এই লেখক?

১৯২৩ সালে বেনারসেই গড়ে তোলেন ‘সরস্বতী প্রেস’। উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু তাঁর এই পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ে অচিরেই। প্রেসে ক্রমাগত লোকসান হয়। সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি তখন মধ্যগগনে। কিন্তু আর্থিক সমস্যা কিছুতেই দূর হচ্ছিল না। দেনার দায়ে ডুবে যাচ্ছে প্রেস। সেই দুঃসময়ে মুম্বাইয়ের এক ফিল্ম কোম্পানির প্রস্তাব আসে প্রেমচন্দের কাছে। তাঁরা তাঁর ‘সেবাসদন’-এর কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে চান। মাত্র ৭৫০ টাকার বিনিময়ে প্রেমচন্দ ‘সেবাসদন’-এর কপিরাইট বিক্রি করে দিলেন। কিন্তু তাতেও বিশাল দেনার কিছুই প্রায় শোধ হয় না। এর কিছুদিন পর মুম্বাইয়ের অজন্তা সিনেটনের মোহন ভবানী তাঁকে সিনেমার জন্য গল্প লেখার প্রস্তাব দিয়ে মুম্বাইতে আমন্ত্রণ জানান। ১৯৩৪ সালের জুন মাসে মাসিক ৭০০ টাকা বেতনের চুক্তিতে সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখার কাজ নিয়ে মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন তিনি।

সেখানে তাঁর প্রথম প্রোজেক্ট ছিল ‘মিল মজদুর’। মিল শ্রমিকদের অধিকারের লড়াইকে সামনে রেখে চিত্রনাট্য লিখলেন তিনি। এক কাপড়মিলের মালিকের কুলাঙ্গার পুত্র মিলের শ্রমিকদের বঞ্চিত করতে থাকলে, মালিকেরই কন্যাই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ায় এবং প্রতিরোধের মাধ্যমে নিজেদের দাবি-দাওয়া বুঝে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। এই ছবিতে ধর্মঘটী এক নেতার চরিত্রে অভিনয় করেন প্রেমচন্দ নিজেই। ১৯৩৫-এর ৫ ফেব্রুয়ারি সিনেমা তৈরির কাজ শেষ করে পাঠানো হল সেন্সর বোর্ডের কাছে। কিন্তু সেই সিনেমা দেখে সেন্সর বোর্ডের কর্তারা প্রমাদ গুনলেন। ১৯২৯ এর আর্থিক মন্দার ক্ষত তখনও শুকোয়নি। মুম্বাইয়ের মিল শ্রমিকদের দুর্দশা তখন চরমে উঠেছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ‘মিল-মজদুর’ সিনেমার কাহিনি জনরোষ তৈরি করতে পারে, শ্রমিক ও মালিক পক্ষের মধ্যে সংঘাত দেখা দিতে পারে— এই অজুহাত দেখিয়ে সেন্সর বোর্ড মুম্বাইতে এই ছবির মুক্তি নিষিদ্ধ করে দেয়। প্রাথমিকভাবে লাহোর, দিল্লি এবং লখনৌতে ছবিটি মুক্তি পেলে সেখানকার কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে বিশেষ প্রতিরোধী মনোভাব দেখা দেয়। ফলে সাত দিনের মধ্যে সেইসব অঞ্চলেও ছবিটিকে ব্যান করা হয়। এসবের মূলে ছিলেন সেন্সর বোর্ডের মেম্বার বৈরামজি জিজিভাই-এর প্ররোচনা। এই বৈরামজি জিজিভাই ছিলেন সেই সময় ‘Bombay Mill Owners’ Association’-এর সভাপতি। এদিকে প্রেমচন্দের সরস্বতী প্রেসের কর্মচারীরা তাঁরই লেখা সিনেমার কাহিনিতে এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠল যে, প্রেসে তালা ঝুলিয়ে দিল তারা। নিজেদের বকেয়া পাওনা বুঝে নিতে তারা প্রেসের মালিক প্রেমচন্দের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে সামিল হয়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!

প্রেমচন্দের গল্প উপন্যাস নিয়ে বহু চলচ্চিত্র, টেলিফিল্ম ও নাটক অভিনীত হয়েছে। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছেন তাঁর ‘সদগতি’, ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’। এছাড়া ‘কাফন’, ‘বড়ে ঘর কি বেটি’, ‘গোদান’, ‘সেবাসদন’ প্রভৃতিও ছায়াছবির রূপ পেয়েছে। নাটকের মঞ্চেও বারবার অভিনীত হয়েছে তাঁর কাহিনি। অভিনেতা ও পরিচালক গৌতম হালদার চমৎকার অভিনয় করেছিলেন প্রেমচন্দের ‘বড়ে ভাই সাহাব’ নাটকে।

১৯৩৬ সালের ৮ অক্টোবর মুন্সি প্রেমচন্দের জীবনাবসান ঘটে।

You might also like