Latest News

জন্মশতবর্ষে বিশ্বভারতীতে উপেক্ষিত শিল্পী সোমনাথ হোড়, আক্ষেপ মোহন সিং খাঙ্গুরার

দ্য ওয়াল ব্যুরো : তাঁর শিল্পকলা আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে সমাদৃত। ভাস্কর্যের পাশাপাশি ম্যুরাল পেন্টিং আর স্কেচে নতুন ধারা আনেন তিনি। বিশ্বভারতীর কলাভবনের শিক্ষকতার সময় সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ, বিনোদবিহারীর মতো শিল্পীদের। তাঁর ছাত্রছাত্রীরাও আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে যশস্বী শিল্পী হিসেবে খ্যাত। এবছর সেই শিল্পী সোমনাথ হোড়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেশবিদেশে চলছে অনুষ্ঠান। অথচ বাংলার এই খ্যাতনামা শিল্পীকে জন্মশতবর্ষে কার্যত উপেক্ষাই করছেন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। আক্ষেপ করেছেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী মোহন সিং খাঙ্গুরা।

তখন তেভাগা আন্দোলন চলছে। আন্দোলনের খবর বিশদে পেতে ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার সাংবাদিক সোমনাথ লাহিড়ী চিত্রশিল্পী সোমনাথ হোড়কে দিনাজপুরের গ্রামে পাঠিয়েছিলেন। সে সময় ক্যামেরার চল ছিল না। কমিউনিস্টদের পত্রিকা ‘স্বাধীনতা’-য় সোমনাথ হোড়ের লেখা তেভাগার ডায়েরি প্রকাশিত হয়েছিল, সঙ্গে তাঁর হাতে আঁকা অনবদ্য স্কেচ। ক্যামেরার থেকেও যা কম যায়নি। যা নিয়ে রীতিমতো আলোড়ন উঠেছিল রাজ্য ছাড়িয়ে, দেশ-বিদেশে, কে সেই শিল্পী? বিস্মিত হয়েছিল শিল্পজগৎ। তাঁর ‘ক্ষত সিরিজ’ আজও জীবন্ত! ক্যামেরার চেয়েও বিশদে দেখতেন সেই শিল্পী, তবু আজ ক’জন বাঙালি তাঁর নাম বললে চিনবেন সন্দেহ।

১৯২১ সালে চট্টগ্রামে জন্ম হয়েছিল শিল্পী সোমনাথ হোড়ের। জীবিকার তাগিদে বিশ্বভারতীর কলাভবনের শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। তখন পাশে পেয়েছেন নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীদের। ভাস্কর্যের পাশাপাশি মিউরাল পেন্টিং আর স্কেচে নতুন ধারা আনেন সোমনাথ হোড়। বাংলায় গ্রাফিক ডিজাইনের অন্যতম দুই শাখা মিউরাল আর এচিংয়ে দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন সোমনাথ হোড়। সেইসঙ্গে গড়তেন ব্রোঞ্জের অপরূপ মূর্তি। বিশ্বভারতীর কলাভবনে প্রিন্ট মেকিং বিভাগের প্রধান হিসেবে বহুদিন অধ্যাপনা করেছেন সোমনাথ হোড়। পেয়েছেন পদ্মভূষণ সম্মান। ২০০৬-এর অক্টোবরে শান্তিনিকেতনে প্রয়াত হন শিল্পী।

শিল্পী সোমনাথ হোড়ের পরিবারের অত্যন্ত কাছের মানুষ, বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষ তথা বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মোহন সিং খাঙ্গুরা এই বিস্মৃতির জন্য আক্ষেপ করেছেন। পাশাপাশি প্রিয় মানুষের স্মৃতিচারণাও করেছেন দ্য ওয়াল-এর কাছে। মোহন সিং খাঙ্গুরার বক্তব্য, সোমনাথবাবুর অসামান্য কীর্তি তাঁর ক্ষত সিরিজ। সমাজের আনাচেকানাচে যেখানে যত যন্ত্রণা প্রত্যক্ষ করেছেন সেসবই রূপ দিয়েছেন তাঁর শিল্পে। তাঁর শিল্পকলা আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে সমাদৃত। ভিয়েতনামের যুদ্ধজয়ে আপ্লুত শিল্পী গড়েন ভিয়েতনামের মা, কিন্তু রাতারাতি সে ভাস্কর্য উধাও হয়ে যায় কলাভবন থেকে। ক্ষোভে ফেটে পড়েন সকলে। অসামান্য চিত্রী ও ভাস্কর সোমনাথ হোড়ের স্ত্রী রেবা হোড়ও ছিলেন শিল্পী, তাঁদের একমাত্র কন্যা চন্দনা হোড়ও শিল্পী।

বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনের অধ্যক্ষ তথা বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মোহন সিং খাঙ্গুরা জানিয়েছেন, শিল্পকলার ইতিহাসে বাঙালি চিত্রশিল্পী সোমনাথ হোড়ের অবদান ভোলার নয়। মানুষের দেখার চোখ ক্যামেরার চেয়েও ক্ষমতাশালী, তা বুঝিয়ে গেছেন সংবেদনশীল সেই ভাস্কর। সোমনাথবাবুর ছাত্রছাত্রীরাও আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে এখন যশস্বী শিল্পী হিসেবে খ্যাত। এবছর তাঁরাও প্রিয় সোমনাথদার জন্মশতবর্ষ পালন করছেন। দেশ-বিদেশে চলছে অনুষ্ঠান। কিন্তু মোহন সিং খাঙ্গুরার আক্ষেপ, বিশ্বভারতী এখন সংকীর্ণ রাজনীতির গণ্ডিতে আবদ্ধ। বাংলার অন্যান্য খ্যাতনামা শিল্পীদের মতো সোমনাথ হোড়ের জন্মশতবর্ষকেও কার্যত উপেক্ষাই করছেন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ।

You might also like