Latest News

লতাজি’র ফোন রেখে দেওয়ার পর চোখে জল এসেছিল মান্না দে’র

সুদেব দে

আজ আমার সত্যিই কথা বলার মতো অবস্থা নেই। ভারতবর্ষের সঙ্গীত জগতের আজ একটা কালো দিন। জন্ম থেকে লতাজির গান শুনে বড় হয়েছি আমরা। আমার শ্রদ্ধেয় সেজকাকু মান্না দে’র সঙ্গে লতাজি’র এক সুদীর্ঘ পারিবারিক ও সাঙ্গীতিক সম্পর্ক ছিল, এ কথা জানেন অনেকেই।
গানের ছাত্র হিসাবে আমি বিভিন্ন সময়ে লতাজি সম্পর্কে যা যা শুনেছি, সে সব কথা বলতে গেলে সারা দিনেও শেষ হবে না। স্মৃতিচারণ করতে গিয়েও আজ গলা বুজে আসছে আমার।

আমাদের ভারতবর্ষের সর্বকালের সর্বসেরা সঙ্গীতসাধিকা ছিলেন লতা মঙ্গেশকর। সেজকাকুর মুখে লতাজি’র প্রসঙ্গ আসত বারবার। আমি তো একাধারে ওঁর ভাইপো, সন্তালতুল্য, আবার অন্যদিকে ওঁর সাক্ষাৎ ছাত্রও। আমার সঙ্গে গান নিয়ে বসে প্রায়শই সেজকাকু একটা কথা বলতেন, বলতেন অনেকেই গানকে দুভাগে ভাগ করেন, একটা ক্লাসিকাল, অন্যটা সেমি-ক্ল্যাসিকাল বা লাইট ক্ল্যাসিকাল। এটা যে কতবড় অন্যায় কী বলব! তবে আমার তো তাঁদের সঙ্গে তর্ক করার সময় নেই। এ প্রসঙ্গে সেজকাকু লতাজির উদাহরণ দিতেন। বলতেন, ‘সঙ্গীতের সা থেকে নি পর্যন্ত যে বারোটা পর্দা আছে, সেই বারোটা পর্দা যদি সঙ্গীতের আধার হয়ে থাকে, তাহলে সেই আধারের অধীশ্বরী ছিলেন লতা মঙ্গেশকর। লতা মঙ্গেশকর সারাজীবন যত রকম গান গেয়েছেন তা যেকোনও সঙ্গীতসাধকের কাছে শেখার জায়গা।এ প্রসঙ্গে সেজকাকুর একটা কথা বলি, তিনি বলতেন ‘মিউজিক ডিরেক্টর যখন একটা নতুন গান তোলাতেন, গানটা দুতিনবার শুনেই গলায় তুলে ফেলত লতা। হয়তো আমার মতো নোটেশন করতে পারত না। বারবার বলত, মান্নাদা এই নোটেশন কীভাবে করা যায়, যদি বলেন!’ সেজকাকু বলতেন ‘তুমি নোটেশন না শিখেই যেভাবে গান কর তাই অননুকরণীয়। আমি অবধি হাঁ করে শুনি তোমায়।’ লতাজির আর একটা বৈশিষ্ট্য ছিল। পারফেকশন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই লতাজির উদাহরণ দিতেন সেজকাকু। বলতেন “ধরো, একটা গানের মধ্যে গা রে নি রে মা শুধু এইটুকু নোট আছে। গানটা শোনার পর যখন আবার প্রোডাকশন করছে লতা, তখন আমি অবাক হয়ে দেখলাম, শুধু ওই নির্দিষ্ট পাঁচটা নোটই গাইছে সে। এর বাইরে তার গলায় কোনও সাপোর্টিং নোট লাগছে না। পর্দা এতটুকু কাঁপছে না। আমরা অনেকক্ষেত্রে গাইবার সময় কিছু স্বাধীনতা নিই। কিন্তু লতাজি’র সেসব লাগত না।” মিউজিক ডিরেক্টর না বললে যে বাড়তি স্বাধীনতাটুকুও নিতে নেই, সেটাই যেন অক্ষরে অক্ষরে দেখিয়ে গেছেন তিনি।

লতাজিকে সেজকাকু ‘লতা’ বলে সম্বোধন করতেন। লতাজি ওঁকে ডাকতেন মান্নাদা বলে৷ উনি সেজকাকুকে অন্তর থেকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। যখন টেলিফোনে কথা হত, ও প্রান্তের কথা শোনা না গেলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধটা বুঝতে অসুবিধা হত না। এমনকি, কথা বলে ফোন রেখে দেওয়ার পর সেজকাকুর চোখ জলে ভরে এসেছে, তাঁর একটু বেশি বয়সে, এ দৃশ্যও দেখেছি।

আগেও একটা গোটা পর্ব জুড়ে লতাজি আর সেজকাকুর সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা বলেছি। আজকের এই দুঃখের মুহূর্তে সেসব পুনরুক্তি করে কাজ নেই। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে লতাজি’র সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাইনি, কিন্তু ওঁকে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ভারতরত্ন পাওয়ার প্প্র একটি সাক্ষাৎকারে লতাজি বলেছিলেন ‘আমি ভারতরত্ন পেয়েছি বটে, কিন্তু এ সম্মানে সত্যিকারের দাবি যাঁদের, তাঁদের অন্যতম মান্নাদা। সঙ্গীতের সবরকম ধারা নিয়ে একমাত্র মান্নাদাই কাজ করতে পারতেন। এখন লতা মঙ্গেশকরের উপর তো কথা হয়না। সেজকাকুকে নিয়ে তাঁর এই মন্তব্যও প্রমাণ করেন তিনি তাঁর ‘মান্নাদা’কে কতটা শ্রদ্ধা করতেন!সেজকাকুর সঙ্গে লতাজির বাংলা, হিন্দি নানা ভাষায় অনেক অনেক ডুয়েট গান আছে। সেসব গানের বয়সই হয়তো ৫০-৬০ বছর। কিন্তু এখনও কী প্রাসঙ্গিক! এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে সেসব গান। এখনও নানা অনুষ্ঠানে দর্শকের অনুরোধে আমাদের গাইতে হয় সে গান। কিছু গান উল্লেখ না করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে লেখাটা। তেমনই কিছু গান, ‘ইয়ে রাত ভিগি ভিগি’, ‘প্যার হুয়া ইকরার হুয়া হ্যায়’, ‘তুম গগনকে চন্দ্রমা’, ‘নয়ন মিলে চ্যয়ন কাঁহা’ ‘আজা সনম মধুর চাঁদনি মে হাম’ প্রভৃতি। বাংলা গানের মধ্যে এক্ষুনি মনে পড়ছে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’র কথা। মনে পড়ছে ‘রামধাক্কা’ ছবিতে ‘দেখো না আমায় ওগো আয়না’, ওই গানটা সেজকাকুর সুরে গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর।

 

কাকার মুখে শুনেছি, কোনও একটা সময় লতাজি সেজকাকুকে বলেছিলেন, ‘মান্নাদা, আমি একটা বাংলা গান রেকর্ড করব, আপনি সুর করে দিন।’ কথা মতো কাকা একটা গানে সুর বসান। রেকর্ডিং-এর সব ঠিকঠাক, তখন নানা ব্যস্ততায় একটা ডেট ফেল করলেন লতাজি। তারপর আরও একটা ডেট ফেল করলেন। কাকা ভিতরে ভিতরে খুব অভিমানী মানুষ ছিলেন। পরপর দুটো ডেট লতাজি যখন ফেল করলেন, তখন কাকার মনে হল, নাহ! এ গান আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না। মিউজিশিয়ানেরা রেডি ছিল। সেই গান কাকা নিজের কণ্ঠেই রেকর্ড করলেন। ১৯৫৩ সালে প্রকাশ পেল সেই ঐতিহাসিক রেকর্ড, ‘কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল’ আর ‘হায় হায় গো রাত যায় গো’। এই দুটো গান কাকার বেসিক রেকর্ডিং, কিন্তু শুরুতে গানদুটো গাওয়ার কথা ছিল লতা মঙ্গেশকরের।

লতাজি সারা জীবনে যত গান গেয়েছেন, যতরকম গান গেয়েছেন, সেটুকুই যদি শুনতে পারি, সঙ্গীতের ছাত্র হিসাবে সেটাই আমাদের বিরাট প্রাপ্তি। তাঁর উদ্দেশ্যে আমার শতকোটি প্রণাম। এমন প্রতিভা আর কোনওদিন জন্মাবে কী না সন্দেহ! বিশ্বসঙ্গীতের দরবারে সারা ভারতবর্ষের মুখ উজ্জ্বল করে গেছেন লতাজি, আমাদের প্রিয় লতা মঙ্গেশকর।

You might also like