Latest News

চারুলতা করতে গিয়ে হাতের লেখা পাল্টে ফেলেছিলেন সৌমিত্রবাবু: মাধবী মুখোপাধ্যায়

শারদপ্রাতে মাধবীরাতের বউঠাকুরানি রূপে চিরন্তন ‘চারুলতা’ তিনি। উত্তম ও সৌমিত্র (Soumitra Chatterjee) দুই নায়কেরই নায়িকা তিনি। তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি মাধবী মুখোপাধ্যায়।

সৌমিত্র-মাধবী জুটি বাঙালীর চির ভালোবাসার। শুধু নায়ক-নায়িকাই নন, বন্ধুও তাঁরা। অমল-চারু জুটির অমল পাড়ি দিলেন অনন্তলোকে। অমলের চারুলতা মাধবী মুখোপাধ্যায় আজ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানালেন তাঁদের প্রথম যৌবনের নানান কাহিনি। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মুখে সেই কাহিনি শুনলেন দ্য ওয়াল-এর প্রতিনিধি শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

দ্য ওয়াল – আপনার সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি ‘চারুলতা’। কিন্তু আপনাদের প্রথম দেখা তো মৃণাল সেনের ‘পুনশ্চ’ ছবি করতে গিয়ে?

মাধবী – হ্যাঁ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রথম চাক্ষুষ করি মৃণাল সেনের ‘পুনশ্চ’ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে। সুন্দর শিক্ষিত চেহারার মানুষ। আমার অবশ্য আর ‘পুনশ্চ’-তে শেষ পর্যন্ত অভিনয় করা হয়নি। সেই না করতে পারার কারণটা আমি আজ আর বলতে চাই না। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-কণিকা মজুমদার করলেন ছবিটা। তারপর সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে দেখা একেবারে ‘চারুলতা’ করতে গিয়ে।

দ্য ওয়াল – চারুলতা বলেও তো আপনাকে ডাকতেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।’চারুলতা’র শ্যুটিংয়ের গল্প কিছু যদি বলেন।

মাধবী – চারুলতা তো সত্যজিৎ রায়ের ছবি। ওঁর ছবিতে কাজ করতে গেলে সিরিয়াসনেসটা সবসময় থাকতে হয় অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে টেকনিশিয়ানদের ভিতর। আমি আমার চরিত্রের মধ্যে ছিলাম। সৌমিত্রবাবু তাঁর চরিত্রের মধ্যে ছিলেন। চারুলতায় মানিকদা একটা লেখার স্টাইল সৌমিত্রবাবুকে দেখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন “সৌমিত্র তোমার লেখাটা এইরকম করতে হবে।”

চারুলতার অমল করতে গিয়ে সৌমিত্র বাবু নিজের হাতের লেখা পাল্টেছিলেন। ‘নষ্টনীড়’ গল্পটা ছিল রবীন্দ্রপূর্ব যুগের। আর সৌমিত্র বাবুর হাতের লেখা ছিল খুব রাবিন্দ্রিক। তাই মানিকদা সৌমিত্রবাবুকে ওই স্টাইল পাল্টে তার আগের যুগের হস্তাক্ষরের মতো করতে বলেন। সেই লেখাটা সৌমিত্রবাবু প্র্যাকটিস করেছিলেন এবং সেই লেখাই ছিল ‘চারুলতা’-তে।

জানেন সিনেমার নাম ‘নষ্টনীড়’ না হয়ে ‘চারুলতা’ নাম কেন ?’

দ্য ওয়াল – ‘নষ্টনীড়’ নামে আগে একটা ছবি ছিল। একই নামে একটা সময়ের ব্যবধানে দুটো ছায়াছবি করার নিয়ম ছিল না।

মাধবী – হ্যাঁ একদম তাই। মানিকদার ছবিটার আগে সুনন্দাদেবী একটা ছবি করেছিলেন, তার নাম ছিল ‘নষ্টনীড়’। তাতে সুনন্দাদেবী প্রযোজনা করেন। নায়িকার চরিত্রও তিনিই করেছিলেন। কিন্তু ওঁর ছবিটা রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ নয়। নিয়ম ছিল, একটা নামে ছবি থাকলে সেই নামটা অন্য ছবিতে ব্যবহার করা যাবে না। তখন বদল করে ‘চারুলতা’ নাম হল।

দ্য ওয়াল – উত্তম না সৌমিত্র! কে সেরা? বাঙালির চিরকালের তর্কের বিষয়। আপনি তো দু’জনেরই অনেক বিখ্যাত ছবির নায়িকা। তো আপনি কী বলবেন, এই দুই আইকনিক ক্লাসিক হিরোর তফাত কী? কে সেরা ?

মাধবী – যদি আপনারা ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কত বিশাল মাপের অভিনেতা। এত সুন্দর অভিনয় করেছেন। অনীক দত্ত ছবিটাও খুব সুন্দর করেছেন। বহুদিন পর এমন একটা সুন্দর ছবি দেখলাম।

দ্য ওয়াল – আপনিও ছিলেন তো!

মাধবী – হ্যাঁ, আমার একটা ছোট্ট রোল ছিল এই ছবিতে। তবে আমার রোলটা বড় কথা নয়। আমি বলব এটা একটা ভাল ছবি এবং সৌমিত্রবাবুর অসাধারণ অভিনয়।

আর কে সেরা এসব তর্ক এতদিন করে এসেছে বাঙালি। কিন্তু আমাদের এখানে চলচ্চিত্র সংরক্ষণ বা শিক্ষার ব্যবস্থাতো কিছু নেই। যদি উত্তম কুমারের পরপর করা ছবিগুলো দিয়ে একটা শিক্ষার জায়গা তৈরি করা হত তাহলেই উত্তর পাওয়া যেত কেন উত্তম কুমার আজও বেঁচে আছেন। ছবি নিয়ে তর্ক করি আমরা অথচ ছবির সংরক্ষণ বা ছবি থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাঠ নেই। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বেঁচে থাকবেন। দু’জনের একরকমের চেহারা নয়। দু’জনের অভিনয়ের ধরন আলাদা। কিন্তু তাঁরা দু’জনেই বেঁচে থাকবেন। বলতেই হয় আরও অনেকে আছেন যাঁরা ভাল ভাল আর্টিস্ট। অনেকে চলে গেছেন। তাঁরাও কিছু কম ছিলেন না। যাঁরা সূর্য-চন্দ্র উত্তম-সৌমিত্রর মাঝে পড়ে আড়ালে রয়ে গেলেন।

যেমন অনিল চট্টোপাধ্যায়- কিছু কি কম ছিলেন? অনিলবাবু আমার মাকে খুব ভালবাসতেন। তারপর যেমন দিলীপ রায়, খুব একটা ছবি করেননি। বিশেষত নায়কের চরিত্রে ছবি বেশি নয় কিন্তু খুব ভাল আর্টিস্ট ছিলেন। বড় পরিচালকও। যদিও আমি পরিচালক হিসেবে বলছি না। তাঁরও আগে যারা ছিলেন তাঁদের মধ্যে বিকাশ রায়। বিকাশ রায়ের সঙ্গে তুলনা করার মতো আর কাউকে খুঁজে পেলাম না এখনও অবধি।

তবে একটা কথা- লোকে বলে উত্তম-সৌমিত্র। যদিও উত্তমবাবুর কিছুটা পরে সৌমিত্রবাবু এসেছিলেন। বরং উত্তম কুমার আর বসন্ত চৌধুরী একসঙ্গে শুরু করেছিলেন। বসন্ত চৌধুরীও কিছু কম না। এসব অভিনেতা- তাঁদের ক্লাস তো এখন আর দেখা যায় না। ‘রাজা রামমোহন’ কি বসন্ত চৌধুরী ছাড়া অন্য কাউকে ভাবা যায়? তাঁরা সকলেই ভাল অভিনেতা ছিলেন। সৌমিত্রবাবুও খুব বলতেন এঁদের কথা। তাঁদের অভাব তো পূরণ হওয়ার নয়। কী আর করা যাবে!

দ্য ওয়াল – মানুষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে কী বলবেন?

মাধবী – আমার ছোট মেয়ের বিয়েতেও উনি এসেছেন। রাত হয়ে গেছিল আসতে। অন্য কাজ ছিল, তা সত্ত্বেও এসেছেন। সেটা ভোলার নয়। আজকেই আমার মেয়ে ফোন করেছিল। বলছিল, সৌমিত্রকাকুর আন্তরিকতা এত বেশি ছিল যে সেই আন্তরিকতাটা আমরা মিস করব উনি চলে যাওয়াতে। আমার মেয়েরা সৌমিত্রকাকু বলে ডাকে। সকলের সঙ্গেই সৌমিত্রবাবুর সম্পর্কটা খুব ভাল ছিল।

দ্য ওয়াল – সৌমিত্র বললেই সত্যজিতের ছবি নিয়েই আলোচনা হয়। এটা আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মহানগর, চারুলতা নিয়ে বেশি আলোচনা। অন্যদের ছবি ব্রাত্য। যেমন আপনাদের জুটিতে হরিসাধন দাশগুপ্তর ‘একই অঙ্গে এত রূপ’ দুর্দান্ত একটি ছবি। সে ছবির কথা ক’জন জানেন?

মাধবী – আমাদের দেশে এই ব্যবস্থাটাই নেই, এই শিক্ষাটাই নেই যে পুরনোকে একটা জায়গা দিয়ে রাখা। আপনি যদি ইংল্যান্ডে যান দেখবেন যে শেক্সপিয়রের পুরনো বাড়িটাকে কীভাবে সযত্নে রাখা। আর আমাদের এখানে চুঁচুড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়িটা দেখুন, আর ক’দিন বাদে গঙ্গায় হয়তো ভেসে যাবে। আজকে আমরা ‘বন্দেমাতরম’ বলছি, এই ‘বন্দেমাতরম’ শব্দটা কোথা থেকে এল? কাজেই ধরে নিতে হবে মানুষ মনে রাখবে না। সেভাবেই সত্যজিৎ রায় ছাড়াও অন্য পরিচালকদের কাজ যে মনে রাখা উচিত সে শিক্ষাই এ দেশে নেই। যা চলছে, চলছে।

দ্য ওয়াল – সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে আপনাদের জুটির মনে রাখার মতো দৃশ্য? আপনার মতে?

মাধবী – চারুলতা তো বললাম আগেই। যেমন ‘কাপুরুষ’-এর কথা বলব। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যে চরিত্রে ছিলেন সেই যুবকের কাপুরুষতা বারবার প্রমাণিত হচ্ছে সংলাপ ও দৃশ্যের এক আশ্চর্য সমন্বয়ে আর গানের ব্যবহারে। সেই পিকনিকে যাওয়া করুণার (আমি যে চরিত্রে) স্বামীর (হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়) চরিত্রের স্থূলতার নানা প্রকাশ যা করুণার রুচির সঙ্গে একেবারেই মেলেনা। করুণার গলায় সেই রবি ঠাকুরের গান ‘এ পথে আমি যে গেছি বার বার, ভুলিনি তো একদিনও।’ এই পথ ছেলেটির কাপুরুষতার স্মৃতিপথ ছাড়া করুণার কাছে আর অন্য কী ব্যঞ্জনা বহন করতে পারে?

ছেলেটির সঙ্গে করুণার আবার দেখা হয় স্টেশনে। ঘুমের ওষুধের শিশিটা ফিরিয়ে নিতে এসেছে। ‘লক্ষ্মীটি ওটা দিয়ে দাও।’
‘লক্ষ্মীটি’- এই একটিমাত্র শব্দে করুণার বিবাহিত জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার আকুলতা কি প্রকাশ পেল?
সেখানেও ছেলেটি পুনরায় কাপুরুষ। শিশি ফেরত দিল কিন্তু বলতে পারল না করুণাকে – আমার সঙ্গে চলো।

সৌমিত্রবাবুর ভালো অভিনয় একটা। আমার অভিনীত বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে করুণা আমার অন্যতম প্রিয় চরিত্র।

দ্য ওয়াল – সত্যজিৎ রায়ের ছবির বাইরে আপনার পছন্দের সৌমিত্র অভিনীত ছবি?

মাধবী – ‘একটি জীবন’। খুব বেশি লোক দেখেননি। কিন্তু সৌমিত্রবাবুর মনে রাখার মতো অসাধারণ অভিনয়। অনেক ছবি করেছেন, অনেক রকমের চরিত্র করেছেন।

তপন সিনহার ‘অন্তর্ধান’-এ সৌমিত্রবাবুর অনবদ্য অভিনয়। দুটো দৃশ্য বলি।মেয়ে নিরুদ্দেশ। ফেক ছেলেকে ভালবেসে পালিয়ে গেছে, বাবা-মা দুশ্চিন্তায়। কোনও কিছু করতে বাদ রাখছেন না মেয়ের খোঁজে।
সেখানে আমি আর সৌমিত্রবাবু শতাব্দী রায়ের বাবা-মায়ের রোলে।

তো আমায় সৌমিত্রবাবু বলছেন, ‘ইনা যাবার আজ চোদ্দ দিন হল। এতদিন প্রায় কিছুই খাওনি। দুঃখে ব্যথায় বুক টনটন করে, আবার পেটে খিদেও পায়। ইনা যাবার পর থেকে দেখছি তুমি মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছ। তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবন আমাদের, আমি জানি তুমি কী খেতে ভালবাস। কিন্তু আমি এখনও তো বেঁচে আছি। তবে এ কোন অকাল বৈধব্য মেয়েটা তোমার উপর চাপিয়ে দিয়ে গেল। কোন অধিকারে?’ তারপর আমার একটা বুকভাঙা কান্না ছিল।

আবার ‘অন্তর্ধান’-এর শেষ দৃশ্যে সৌমিত্রবাবুর সেই সংলাপ কি ভোলা যায়! মেয়ে ফিরে এসে বলছে ‘আমার শরীর ওরা অপবিত্র করে দিয়েছে বাবা।’ তখন সৌমিত্র বাবু বলছেন, ‘শরীর মন্দিরের মতো ইনা। ঈশ্বরের অনবদ্য সৃষ্টি। কেউ সেটা অপবিত্র করতে পারে না। মানুষ শুধু তার মনকে অপবিত্র করে।’
তখন আবহে বাজছে-
‘আমার ভাঙল যা তা ধন্য হল চরণপাতে
আমি রাখব গেঁথে তারে রক্তমণির হারে
বক্ষে দুলিবে গোপনে নিভৃত বেদনাতে
তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে সুপ্তরাতে।’

সব কিছু ধুয়েমুছে আবার পরিস্কার করে নেওয়া যায়। এই জায়গাটা উনি অসাধারণ করেছেন।

দ্য ওয়াল – আর একটা ছবি করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ‘অগ্রদানী’।

মাধবী – অগ্রদানী আমার ভাল লাগেনি এইজন্য যে, সৌমিত্রবাবুকে আমি কিছুতেই ওই অগ্রদানী ব্রাহ্মণ মানতে পারিনি। উনি ভালো অভিনয় করেছেন ঠিক কথা। অনেকেই বলবেন। কিন্তু আমি ওঁকে ওই রোলে মানাতে পারিনি। একটা জিনিস দেখুন, সত্যজিৎ রায় যাঁকে যে চরিত্র মানাবে তাঁকে সেটাই দিয়েছেন। কিন্তু যাঁকে মানাচ্ছে না তাঁকে নিয়ে ছবি করেছেন সত্যজিৎ রায়, এরকম নয়। ‘আগুন্তুক’-এ তো সৌমিত্রবাবুকে নেননি, উৎপল দত্তকে নিয়েছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জীবনে কোনওদিন সেক্রেটারি রাখেননি

যখন যাঁকে নেওয়ার তখন তাঁকে নিয়ে ছবি করা, এটাই একজন পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে আমাদের কৃতিত্ব কিন্তু কিছু নেই। আপনারা রিভিউতে লেখেন এর অভিনয় ভাল নয়, মন্দ নয় ইত্যাদি। কিন্তু দোষগুলো আমাদের নয়, যিনি ডিরেক্ট করেন, তাঁর। এজন্যই শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া উচিত। ছবিগুলো বারবার দেখো তবেই তোমরা বুঝতে পারবে।

দ্য ওয়াল – দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের বেশি ষাটের কাছাকাছি সৌমিত্র-মাধবী জুটি অভিনয় করল। প্রেমের বিবর্তন কী ভাবে হল বাংলা সিনেমায়?

মাধবী – কোনটা প্রেম আর কোনটা অশ্লীলতা সেটা আগে আজকালকার পরিচালকদের বুঝতে হবে।

সত্যজিৎ রায়ের কোনও ছবিতে কোনও অশ্লীলতা, ভালগারিজম নেই। কিন্তু তাই বলে কি প্রেম নেই? আছে। মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে ভালগারিজম আছে? নেই। কিন্তু সাহসী ঘটনা আছে। আমি যে চরিত্রটা করেছিলাম ‘সুবর্ণরেখা’-য়, মেয়েটি তখন আর কোনও রাস্তা না পেয়ে বেশ্যাবৃত্তি করছিল। বেশ্যাবৃত্তি করার দৃশ্য কিন্তু ঋত্বিক ঘটক কুৎসিতভাবে দেখাননি। মাত্রাটা জানতে হবে। এটাই হচ্ছে শিক্ষা, আর্ট, সব কিছু। সৌন্দর্যবোধ যদি না থাকে তাহলে তাঁর ছবি করা উচিত নয়।

এখনকার একটা ছবি দেখতে গেলে ভয় লাগে, আমার মেয়েকে বলব? আমার নাতনিকে বলব? আমার সঙ্গে ছবিটা দেখতে যেতে বলতে পারব না। একলা গিয়ে দেখতে হবে। এমন সব বেমানান অশ্লীল দৃশ্য থাকে যে দেখতে ভয় লাগে।

আরেকটা ব্যাপার, অনেকগুলো ছবিতে আমি বুঝতে পারি না যে এরা কোথায় বসবাস করেন! কোন দেশের মানুষ।

দ্য ওয়াল – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ফিল্ম পরিচালনা না করলেও মঞ্চে পরিচালনা করেছেন। ওঁর পরিচালিত নাটকে আপনি অভিনয় করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মাধবী – সৌমিত্রবাবুরই লেখা এবং তাঁরই নির্দেশনায় ‘ফেরা’ নাটকে আমি অভিনয় করেছি। ‘বিশ্বরূপা’-য় তখন এসি ছিল না। মে মাসের প্রচণ্ড গরম। সেই গরমের মধ্যে উনি উইংসয়ের পাশে বসে থাকতেন। মানুষটা এতটাই সিনসিয়ার ছিলেন। কেউ যাতে উল্টোপাল্টা সংলাপ না বলেন বা বেশি কথা না বলেন। প্রত্যেকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। উনি যা যা দেখিয়ে দিয়েছেন সেইভাবেই করতে হবে। যেমন আমার একটা জায়গায় সংলাপ ছিল ‘… চলো’ বলে। কিন্তু সেখানে আমি হাতটা তুলেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সৌমিত্রবাবু এসে বললেন, ‘আপনি হাতটা তুললেন কেন?’
সৌমিত্রবাবু এটাই বোঝাতে চাইলেন যে, আমার সংলাপ বলাটাই যথেষ্ট। হাত তুলে দেখাবার দরকার নেই।

দ্য ওয়াল – একসময় সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে আপনি কাজ করবেন না ঠিক করেন। ফিরিয়ে দেন অনেক ছবি। পরে আবার ‘গণদেবতা’-য় ওঁর সঙ্গে কাজ করেন। কেন?

মাধবী – এত পুরনো কথা আজ আর বলতে চাই না। তারপর তো আমরা প্রচুর কাজ করেছি। এই ২০২০ অবধি করে চললাম। ওঁর নাটকেও কাজ করেছি। ওঁর অনেক নাটক দেখতে গেছি। দীর্ঘদিন পথ চলতে চলতে মানুষ যে কখন আপন হয়ে যায় সেটা বুঝলাম সৌমিত্রবাবুর পরিচালনায় ‘আত্মচরিত’ দেখার পর। তিনি ছিলেন আমাদের আপনজন ।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like