Latest News

কেন ‘যশ’ নয়, ‘ইয়াস’? জেনে নিন ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ বৃত্তান্ত

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিভার, আমফান, ফণী, তিতলি, বুলবুল, তাউটে…আর এখন ইয়াস। বাহারি নাম, বাহারি অর্থও। প্রতিবার মহাসাগরের বুকে ঘূর্ণিঝড় পাকিয়ে উঠলেই কিছু সাধারণ কৌতূহল জাগে। এবারের ঝড়ের নাম কী হতে চলেছে? না জানি সে নাম কোন দেশি! কীই বা তার অর্থ!

এই যেমন তাউটের কথায় আসা যাক। ঘূর্ণিঝড় তাউটে সম্প্রতি তাণ্ডব চালিয়ে গেল গুজরাত সহ পশ্চিম উপকূলে। সেই তাউটের নামের বানান অনুযায়ী কিন্তু উচ্চারণ হয় ‘তাউকতায়ে’, সে না হয় সঠিক বার্মিজ উচ্চারণেই আমরা ঝড়কে চিনলাম। হ্যাঁ, তাউটে নামটি মায়ানমারের আবহাওয়াবিদদেরই প্রস্তাবিত। এর অর্থ টিকটিকি জাতীয় একধরনের সরীসৃপ, যেটি মুখ দিয়ে জোরে আওয়াজ করে। এর সঙ্গে ঝড়ের তেমন কোনও সম্পর্ক নেই, তবু নাম নামই। আবার পূর্ব উপকূলে আছড়ে পড়া আরেক ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘নিভার’ দিয়েছিল ইরান। আগামী দুদিনের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ফুঁসে উঠতে চলা ‘ইয়াস’- এর নামটা দিয়েছে ওমান। ইয়াস আসলে একটি পার্সি শব্দ। এর অর্থ জুঁই ফুলের মতই সুগন্ধি ঝিরঝিরে কোনও সাদা ফুল। তবে নাম যেমন সমধুর, কাজে তেমন হওয়া সম্ভাবনা মোটেই নেই। বরং অতি তীব্র এই ঘূর্ণিঝড়ের জন্য সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে সরকারের।

বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একেকটি দেশ আগাম স্থির করে রাখে। কী ভাবে এই নামকরণ হয়?


ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের নামকরণের ইতিহাস
১৯ শতকের শুরুর দিকে ঝড়ের নামকরণের এত ধুম ছিল না। যে বছর ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে কখনও সেই সাল দিয়ে আবার কখনও সাধু সন্তদের নামেই ঝড়ের নামকরণ করা হত। পরের দিকে যেখানে যেখানে ঘূর্নিঝড় হত সেই জায়গার নামেই সাল জুড়ে দিয়ে ঝড়ের নাম হত। যেমন ‘১৮৬৪ ক্যালকাটা সাইক্লোন’।
আরও একটা মজার উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। আটলান্টিক মহাসাগরে একবার একটা ঝড় আছড়ে পড়েছিল যার নাম ‘আন্তজের হারিকেন’। জানা গেছে, এরকম নামের কারণ আর কিছুই নয়। সেই ঝড়ে আন্তজে নামের একটা জাহাজের মাস্তুল ভেঙে দিয়েছিল! সেই স্মৃতিতে এই নামকরণ হয়ে যায়।

ক্রমশই বিশ্ব জুড়ে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বাড়তে থাকায় খাপছাড়া নামে চিহ্নিত করতে খুবই বেগ পেতে হচ্ছিল। এরপরই ঘূর্ণিঝড়ের আলাদাভাবে নামকরণের কথা ভাবেন বিশিষ্ট আবহাওয়াবিদ ক্লিমেন্ট রাগে।

বিশ শতকের দুনিয়া নতুন করে ঝড়ের নামকরণের পথ বেছে নিল। পশ্চিমী আবহাওয়াবিদরা একই সমুদ্রের বুকে বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়কে আলাদা আলাদা নামে ডাকতে শুরু করলেন। সেসব নাম অবশ্য পশ্চিমী মহিলাদের নাম অনুসারেই। মৌলিক কিছু নয়। ১৯৯৭ সালে হংকং থেকে প্রতিবাদ আসে। পশ্চিমী নামে তাঁরা তাঁদের স্থানীয় ঝড়ের নাম রাখবেন কেন? স্থানীয় ঝড়ের নাম স্থানীয়ই হবে। বহিরাগত নাম নৈব নৈব চ! অতএব বহুমত বহুপথে বেঁকে যায়। প্রসঙ্গত, ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশের ওপর দিয়ে এক তুমুল ঝড় বয়ে যায় যাতে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ মারা যান। সেই ঝড়ের নামকরণ হয়েছিল ভোলা। ভয়াবহ সেই ঝড় কিন্তু স্থানীয় নাম দিয়েই স্মরণে রাখা হয়েছে।


২০০০ সালে বিশ্ব আবহাওয়া দফতর ঝড়ের নামকরণের বিষয়ে একটা সমঝোতায় আসতে চায়। উত্তর ভারত মহাসাগরের ওপর ঘনিয়ে ওঠা ঝড়গুলোর জন্যই আগে নামের প্রস্তাব চেয়ে পাঠানো হয়। ভারত শুরুতেই নাম প্রস্তাব করতে চায় কিন্তু মঞ্জুর হয়নি। দীর্ঘ ৪ বছর পর ভারতের প্রস্তাবিত নাম গ্রাহ্য হয়। ২০০৪ সালের সাইক্লোনের নাম হয় ‘অনিল’।

এরপর বিশ্ব আবহাওয়া দফতর এশিয়ার কয়েকটি দেশের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্থানীয় আবহাওয়া সংস্থা গঠন করে। শুরুতে তার সদস্য হয় বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং তাইল্যান্ড। ২০১৮ সালের পর থেকে ইরাক, ইরান, সৌদি আরব-সহ মধ্য প্রাচ্যের আরও ৫টি দেশকে সদস্য করে নেওয়া হয়। এখন সেই সংস্থার অধীনে ১৩টি দেশ মিলেই স্থানীয় ভূপ্রকৃতি সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। নামকরণের কাজও এখন থেকেই হয়।

নামকরণ পদ্ধতি 

সামুদ্রিক ঝড়ের জন্য আগাম নামকরণ করা থাকে। তালিকা ফুরোলে আবার নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রতিবার ১৩টি দেশ ১৩টি করে নামের প্রস্তাব পাঠায়। সবমিলিয়ে নামের ভান্ডার ১৬৯টি। গতবছর সাইক্লোনের নাম যে ‘আমফান’ বাছা হয়েছিল, জানা যায় সেটা পুরনো তালিকার নাম। ব্যবহার না হওয়ায় এবার নতুন তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব দেশের দেওয়া নামই মনোনীত এবং নির্বাচিত হয়।

কেন সাইক্লোনের নাম দেওয়া জরুরি? আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগ সাধনের সহজ উপায় তো এটাই। মানুষকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে অমুক সালের অমুক ঝড়ের মত না বলে একটা নাম দিয়ে সতর্কতার মাত্রা চিহ্নিত করা যায়। দ্বিতীয়ত, একই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ তটে একাধিক ঝড় এলে তার নাম আলাদা থাকলে সুবিধে হয়। তাছাড়া, প্রযুক্তিগত শব্দ বা বৈজ্ঞানিক নামের বদলে ঝড়ের বিশেষ নামকরণের ফলে আবহাওয়াবিদদের ও কাজে সুবিধে হয়, এমনটাই জানাচ্ছেন বিশ্ব আবহাওয়া দফতরের আধিকারিকরা।

তবে ঝড়ের নামকরণ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আছে। কোনও রকম ধর্মীয় বিতর্ক এবং লিঙ্গ বৈষম্য এড়িয়ে এই নামকরণ করতে হবে। কারও ব্যক্তিগত মূল্যবোধে আঘাত হানতে পারে এমন নাম গ্রাহ্য হবে না। কঠিন, নিষ্ঠুর বা অপশব্দ প্রয়োগ করা চলবে না। কোনও রাজনীতিবিদ কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের নামও এক্ষেত্রে গ্রাহ্য হবে না। নামের ধরন হবে ছিমছাম, হালকা এবং মিষ্টি। সর্বাধিক আট অক্ষরের মধ্যেই নাম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। সেইসঙ্গে প্রস্তাবিত নাম অক্ষর ভেঙে সঠিক উচ্চারণ সহ পাঠাতে হয়।

উপরিউক্ত শর্তগুলো মেনেই ১৩টি দেশের আবহাওয়া প্রতিনিধিরা নাম প্রস্তাব করেন। ভারতের তরফে সম্প্রতি ১৩টা নাম গেছিল। তার মধ্যে ছিল – গতি, তেজ, মুরাসু, আগ, প্রবাহ প্রভৃতি। কিছু নাম দেশের জনগণের থেকেও চাওয়া হয়েছিল। সেগুলো তালিকাভুক্ত করে এএমডি দফতরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে মনোনীত হলে চূড়ান্ত নাম ঘোষণা করা হয়।

তবে, কোনও বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের নাম দ্বিতীয়বার রাখা যাবে না। একটা নাম একবারেই শেষ। এমনটাই নামকরণ দফতরের সিদ্ধান্ত। এই গেল নামকরণ বৃত্তান্তের সংক্ষেপ।

যশ না ইয়াস? 

এখন ‘ইয়াস’ কে ঘিরে মানুষের মনে জমাট বাঁধছে সংশয়। অনেকে বলছিলেন ‘যশ’। কিন্তু পরে মনে করা হয় পার্সি উচ্চারণ মেনে সেই নামেই ডাকা উচিত। জুঁইফুলের সৌরভ যার নামে মিশে, ভয়াবহতায় তার অভিঘাত কী হবে তা জানা নেই। হাওয়া অফিসের খবর অনুযায়ী, বিধ্বংসী হতে চলেছে ইয়াস। গত বছর আমফানের স্মৃতি এখনও টাটকা। এই পরিস্থিতিতে ‘ইয়াস’এর তেজ কতটা মারাত্মক হবে সেই নিয়েই আতঙ্কিত উপকূলবাসী।
বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা দুই রাজ্যই নেমে পড়েছে। সেই সঙ্গে নেমে পড়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও।

 

You might also like