Latest News

আজ স্নানের দিন

অদিতি বসুরায়

Image - আজ স্নানের দিন

(৬)
রাজর্ষি সিংদেও

 
 আগে এতো ঘুমের সমস্যা ছিল না।  আজকাল দেরি হয় ঘুম আসতে রাতে। সারাদিন এতো ব্যস্ত থাকি, তবু বিছানায় পড়লে আর কিছুতেই দু চোখের পাতা এক হতে চায় না । ভোরের দিকে সামান্য তন্দ্রা আসে। আর সকালে যখন সবার উঠে পড়ার সময় হয়ে আসে, পাখি-ডাকা আরম্ভ করে, নামাজের আওয়াজ পেতে থাকি– তখনই আমার ঘুম গাড় হয়। বাজার, ইউনিভার্সিটি থাকে। ফলে বেশিক্ষণ ঘুম হয় না। উঠে পড়তে হয়। ক্লান্ত লাগে ভারি!
আজ সকালে উঠে দেখি, ইরাবতীর জায়গাটা খালি। আমার এখন রাতে ঘুম হয় না বলে পারতপক্ষে ও আর ডাকে না ভোরে। একাই উঠে যায়। সকালে ওকে না দেখতে পেলে, ভালো লাগে না আমার। শুধু সকালই বা বলি কেন! সারাদিন যে কতবার ওকে শুধু একটিবার দেখব বলে ঘুরি, তা কেবল আমিই জানি। ও কি আমার আজকের ইরা? শিশুকাল থেকে আমরা পরস্পরকে চিনি। সেই ছেলেবেলার প্রাইমারি ইস্কুলের শান্ত, জেদি মেয়েটা! সেই সময় থেকেই ওর মুখে একরকম স্থায়ী বিষাদের ছাপ। পরে যা প্রবাহিত হয়েছে রণোর মুখে। ওর ওই বিষাদটাই আমাকে আজও চুম্বকের টানে টান দেয়। – ওই বিষাদই ইরার অনুপম সৌন্দর্যের কারণ। তাই পনেরো বছরের সেই কিশোরীকেই এখনও আমি দেখতে পাই আজকের সামান্য ভারী চেহারার ইরার মধ্যেও। সে-ই আমার পাশে ঘুমায় রোজ। বঙ্কিমবাবু লিখেছিলেন, বাল্যপ্রেমে নাকি অভিশাপ আছে। আমাদের বেলাতে তা পুরোটা না খাটলেও খানিকটা মিলে গেছে। তাই তো জীবনের প্রথম পনেরো বছরের পর দীর্ঘদিনের জন্য আমরা, কেউ কাউকে দেখিনি। (Bengali Novel)
বাবা-মা ছিল না ইরার। এক পিসির কাছে থাকত। ওর বাবা-মা বাইক দুর্ঘটনায় মারা যান। ইরার বয়েস তখন তিন। শুনেছি, বাবা-মা মারা যেতে, ওর কোনও আত্মীয়ই ওকে রাখতে চাননি। শেষকালে পিসি এসে নিয়ে যান। সেখানেও যত্ন পায়নি ও। অবহেলায় ফোটা ঘাসফুলের মতো কেবল বেঁচে ছিল। পিসি স্কুলে পড়াতেন। পিসেমশাই কিছু করতেন না। তাঁদের দুটি মেয়েও ছিল। কিন্তু অনাথ শিশুটির প্রতি স্বাভাবিক স্নেহ তাঁদের আসেনি। আজও বুঝে পাইনা, কী করে মানুষ এমন মায়া-দয়াহীন হতে পারে! নিজের মেয়েদের টিফিন করে দিতেন। নিজেও খেতেন। স্বামীর জন্য গুছিয়ে রেঁধে বেড়ে সাজিয়ে রেখে যেতেন। অথচ ওইটুকু শিশু টিফিন তো দূরের কথা, প্রায়ই অভুক্ত অবস্থায় স্কুলে আসত। ও কথা প্রায় বলতই না। টিফিনে একা একা বসে থাকত। আমাদের ইস্কুলের মাঠে একটা আশ্চর্য গাছ ছিল। একটা না বলে, বলা ভাল দুটো। হঠাৎ দেখলে, রাধাচূড়া আর কৃষ্ণচূড়া পরস্পরকে জড়িয়ে বেড়ে ওঠা ওই গাছদুটিকে আলাদা করা যেত না। সেই গাছের নীচে ইরা বসে থাকত। আমি ঘুরে ফিরে যেতাম ওর কাছে। প্রথমদিন ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার বুঝি মা আছে?”- “আছেই তো। সে তো সবার থাকে। তাতে কী?” – “মোটেও সবার থাকে না। আমার তো নেই”।
আমি একটু থমকে, – “নেই? যাক গে। বাবা তো আছে”।
-“না। আমার বাবাও নেই”।
এবার আমি হতবাক! সেই সাত বছরের ক্ষুদ্র জীবনে, আমার সঙ্গে তখনও পর্যন্ত, এমন কারও মোলাকাত হয়নি, যার মাও নেই, বাবাও নেই। খানিক চুপ করে থেকে বলি,-“ও! চলো, খেলি। যাবে?” ইরা শান্ত গলায় জানায়, যাবে। কিন্তু জ্বর হয়েছে বলে, তার খেলতে  ভালো লাগছে না। পায়ে ব্যথা করছে! এইটুকু মেয়ে! বাবা নেই। মা নেই। জ্বর গায়ে ওকে ইস্কুলে আসতে হয়– আহা! আমি গিয়ে ইরার হাত ধরি এবার।
-“মাষ্টারমশাইকে বলি চলো। ছুটি করে বাড়ি চলে যাও”। আমিও তখন ছোট। অসহায় মুখে ইরা বলে, -“এখন বাড়ি গেলে পিসি বকবে”।
সে কী! বাড়ি ফিরলে কেউ বকা খায় নাকি? আমার মা স্নান সেরে খড়কে ডুরে তাঁতের শাড়ি পরে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে যে আমার জন্যে! নিতাইকাকু রিক্সা থেকে নামিয়ে দিলেই আমি ছুট্টে গিয়ে মায়ের কোলে উঠি। মা হাসতে হাসতে বলে, “ছাড়- ওরে ছাড়”! বলতে বলতেই আরও সাপটিয়ে ধরে আমাকে বুকের মধ্যে! সেখানে, এই মেয়ে কিনা বাড়ি গেলে বকা খায়? সে কেমন ব্যাপার- ভাবতে গিয়েই আমার বুকের ভেতর ভয়ের গুড়গুড়ানি। এখনও ইরাকে নিয়ে সেই ভয় আছে আমার। কেউ কিছু খারাপ কথা বল্লে, কাউকে কিছু বলতে পারে না। মুখের বিষণ্ণ ভাবটা বেড়ে যায় শুধু। আরও বেশি চুপ করে যায়।
“চা তো শরবত হয়ে গেল। কোথায় গেলে?” ইরাবতী ডাকছে। সারাদিনের মধ্যে এই সকালগুলোই আমাদের মুখোমুখি বসার সময়। ছেলেদুটো থাকে। তবে রোজ নয়। তারা সব মাঝরাত অব্দি জাগে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা যেমন করে আর কী! তাই এত সকালে তাদের পাওয়া মুশকিল।
আসছি। দাঁড়াও। চশমাটা পাচ্ছি না। কোথায় রেখেছ?
তোমার চশমা আমি কেন রাখতে যাব? দাঁড়াও !  আসছি। কি যে কর!
এই তো।
ইরা ড্রেসিং-টেবিলের পাশ থেকে বিজয়ীর ভঙ্গিতে তুলে নিয়ে এল আমার চশমা।
এবার চলো তো!
বাথরুম থেকে আসছি। তুমি যাও।

একটু পরেই বাইরে এলাম আমরা।
হরির বউ দাঁড়িয়েছিল, -“চাল মেপে দিন, বউমণি। ভাত বসাতে হবে”।
-তুমি গিয়ে তিন কাপ চালের ভাত বসাও চারটে আলুসেদ্ধ দিয়ে। আমি আসছি। আর শোনো, মনে করে পাঁচ-সাতটা উচ্ছেও ভাতে দিয়ে দিও। কেমন!
বড়ভাই উঠেছে? খাবে?
নাহ! ওঠেনি এখনও। দেখি কী করে! তুমি ভাত বসিয়ে দাও। ছোট ভাইয়ের স্কুল আছে। দাদাও কলেজ যাবে তো। তাড়াতাড়ি করো।
সকালে ভাত খাওয়ার রেওয়াজ আমার মায়ের আমল থেকে। বাবা, আমি ভাত খেয়ে বেরোতাম। মায়ের ধারণা ছিল, বাড়ি থেকে ভাত না খেয়ে বেরোলে কাজ করা যায় না। সকাল-সকাল বেরতে হত বলে, মা আর আলাদা করে জলখাবার করতেন না আমাদের জন্য। জলখাবার হত, রোববার। লুচি, আটার পুরি, আলুর পরোটা, ছাতুমাখা, চিঁড়ের পোলাও – মা খুব ভালো তৈরি করতে জানতেন।
তখন আমরা থাকতাম চাষিপাড়ায়। ভাড়ায়। একটেরে লাল ইঁটের বাড়ি। বাড়ির সামনে ছিল ফুলগাছের বেড়া। তুলসি মঞ্চের পাশেই কুয়ো। বর্ষায় জলে থইথই করত উঠোন। শীতে চমৎকার রোদ পড়ত। লেপ, বালিশ, বিছানা সারা দুপুর রোদে দিত মা। যতই ঠান্ডা পড়ুক, রাতে এই কবোষ্ণ আরাম তাকে হারিয়ে দিত তিন গোলে। বড়ি, আচার শুকোতো ওই উঠোনেই। উঠোনের পরই ছিল বারান্দা। একটানা লম্বা। সেখানে বাবা কাজ করতেন। আমি পড়তে বসতাম। মা দুপুরে সেলাই নিয়ে বসত। অসামান্য সেলাই করতে পারত মা।ও-বাড়িতে মোট তিনটে শোওয়ায় ঘর ছিল। খুব বড় বড় জানালাওয়ালা ঘরগুলোতে হাওয়া-বাতাসের আনাগোনা ছিল অবাধ। আমাদের মতো ইরাও খুব ভালবাসত ওই বাড়িটাকে। মায়ের সঙ্গে হাত লাগিয়ে ফুল আর সব্জির বাগান করেছিল। মায়ের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছে ইরা । মা ওকে হাতে ধরে সব শিখিয়েছিলেন। বাগান করা থেকে রান্নার খুঁটিনাটি – ইরাকে এর আগে এমন করে শেখায়নি কেউ কিছু। আমার মায়ের সঙ্গে গোড়া থেকেই খুব সখীত্ব ছিল ইরার। দুজনে দুপুরে রিক্সা করে সিনেমা দেখতে যেত। গরমের দিনে, বিকেলে ছাদে জল ঢেলে শীতল পাটি পেতে গান গাইতো। শীতের রাতে, দুজনে মিলে যাত্রা দেখতে যেত চুপিচুপি। মা খুব যাত্রা দেখতে ভালবাসত। ইরাও যেত সঙ্গে। পুরনো কাপড় জুড়েজুড়ে খুব সুন্দর সব শাড়ি বানাত মা। পাঞ্জাবি বানাত। ইরাকেও শিখিয়েছিল। এখন বুঝতে পারি, আমাদের বাবা-ছেলের সংসারে মা খুব বন্ধুহীন হয়ে থাকতো। ইরা এসে সেই শূন্যস্থান ভরাট করে।
 মা এমনিতে খুব ব্যক্তিত্বময়ী ছিলেন বলে পাড়ার অন্যান্য বউ-মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারতো না। একটু দূরত্ব বজায় রাখতেই পছন্দ করতো। মামাবাড়ির সঙ্গে খুব আন্তরিক সম্পর্ক ছিল না মায়ের। বাবার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার ব্যাপারটাকে আমার মামা ও দাদুর একেবারে সমর্থন ছিল না।
 শমী হওয়ার সময়ে ইরার শরীর ভাল ছিল না। বেশ কিছু কমপ্লিকেশন তৈরি হয়েছিল। শরীরের ওপরকম অত্যাচার তো করেনি! ডাক্তার ওকে বেডরেস্টে থাকতে বলেছিলেন কড়া ভাবে। সেই সময়ে মা, রণোকে একেবারে বুকে করে রেখেছিলেন। কেউ ভাবতেও পারতো না, রণোর সঙ্গে মায়ের রক্তের সম্পর্ক নেই। বাবাও রণোকে খুব ভালবাসতেন। ইরা বলে, “আমার জীবনের প্রথম ভাগটা কেটেছে রাক্ষসের হাতে। আর দ্বিতীয় ভাগটায় সবাই যেন ঈশ্বর”। কথাটা খুব ভুল যে, তা নয়। আমি নিজেও ভাবতে পারি নি, মা-বাবা ইরা এবং রণোকে এমনভাবে কাছে টেনে নেবেন। খুব টালমাটাল অবস্থায় আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিই। ইরা একেবারেই রাজি হচ্ছিল না! ওকে হ্যাঁ করাতে অনেক নাকানিচোবানি খেতে হয়েছে। এদিকে আমাদের বাড়িতে নানান ঝামেলা চলছে তখন। একটা জমি কেনা নিয়ে খুব সমস্যা হচ্ছিল। বাবার রিটায়ার করার দিন এগিয়ে আসছে। মায়ের শরীর ভাল যাচ্ছে না। ইরাবতীকে বিয়ে করার ঠিক তিনমাস বাদে ফুলদিহির জমিটা কেনেন বাবা। ওই জমিই যেন আমাদের পরিবারে ওপর অভিশাপ হয়ে আসে। মানুষ সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কত কি করে! আমার বাবা একটা অনাথ আশ্রম গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আর ভাগ্যের কি খেলা, আমার ইরাও অনাথ ছিল। বাবা বোধহয় এই জন্যেই আমাদের বিয়েতে সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন ।যেদিন আমরা বিয়ে করবো, ঠিক করি, সেদিন বাড়িতে ফিরে মাকে সব জানিয়েছিলাম। মা ইরাকে চিনতেন আগে থেকেই। ওর পিসির বাড়ি, আমাদের পাড়া থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। খবরা-খবর সবই পাওয়া যেত! ইরার গল্প শুনে মা প্রায়ই আমার টিফিনের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দিতেন ওকে খাওয়ানো রজন্য। সেই ই স্কুলের আলাপ হওয়ার দিন থেকেই। বাড়ি ফিরে পুটুর-পুটুর করে গল্প করতাম মায়ের কাছে সব। অন্যকিছু বুঝতেন কিনা অবশ্য জানিনা। একদিন বলতে শুনেছিলাম, “আমার খোকনের খুব মায়াদয়া হবে প্রাণে”। সম্ভবত বাবাকেই বলেছিলেন কথাটা ।ঠিক করে আজ আর মনে নেই। আজকাল অনেক কথাই  ভুলে যাই। বয়েস হচ্ছে বলেই বোধহয়। সেরাতে, খাওয়া দাওয়ার পর, বাবার ঘরে আমার ডাক পড়ে। বাবাকে জীবনে ভয় পাইনি আমি। কিন্তু সেদিন কেন যেন,পা কাঁপছিল। যদিও জানতাম, কোন ভুল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিনা তবুও বেশ টেনশন হচ্ছিল। বাবাকেও মনে হচ্ছিল গম্ভীর। এমনিতে বাবা আমুদে মানুষ। তবে খুব জেদি। বিহারের পাটনার কাছে আমার ঠাকুরদাদার র্বাড়ি ছিল। একান্নবর্তী পরিবার। কিন্তু সম্পত্তি নিয়ে কাকা-জেঠাদের কাজিয়ায় বিরক্ত হয়ে গিয়ে বীরভূমের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসে বাড়ি ভাড়া নেন। তারপর স্থানীয় হাইস্কুলে ছবি আঁকা শেখাতে শুরু করেন। তখন আঁকার জন্য শিক্ষক এলোট করতো না স্কুল শিক্ষা দপ্তর। হেডমাস্টারমশাই নিজের তহবিল থেকে সামান্য কিছু দিতেন বাবার হাতে। আর ছিল টিউশন। মূর্তি গড়া। চলে যেত সংসার । বাবা বেশ অন্যরকম মানুষ ছিলেন। লোভ নামের কোনও বস্তু তাঁর চরিত্রে ছিল না। নিজের জামা-কাপড় নিজেই কেচে নিতেন। ইস্ত্রি করতেন। শুধু নিজের জামা-কাপড় নয় আমার আর মায়ের গুলোও করে দিতেন। গরমের জ্যোৎস্না রাতে আমরা উঠোনে বসে চাঁদ দেখতাম । মা গান গাইতেন। রবি ঠাকুরের গান। শীতকালে কোপাইয়ের তীরে পিকনিক করতে যেতাম। হরি আসার পরে, ওকেও সঙ্গে নেওয়া হতো। ওখানেই যোগাড়-যন্ত্র করে, মাটির উনুন জ্বালিয়ে মা খিচুড়ি রাঁধতেন। বাবার ছাত্র-ছাত্রীরাও যেত আমাদের সঙ্গে। বেগুন পোড়া, খিচুড়ি আর রসোগোল্লা যে যত পারে খাওয়া হতো। প্রাচুর্য না থাক, আনন্দের শেষ ছিল না আমাদের বাড়িতে। মা খুব দেখে শুনে সংসার চালাতে পারতেন। আমাদের বিয়ের আগে পর্যন্ত মা-ই সবগুনেগেঁথেরাখতেন।মানেটাকাপয়সাআরকি।ইরা এবাড়িতে আসার পর সমস্ত দায়িত্ব ধীরে ধীরে মা  ওর হাতেই দিতে শুরু করেন। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকলাম।
 

You might also like