Latest News

শাহজাহান কিন্তু লক্ষ্মণ শেঠ নয়, ও এলাকায় পপুলার, সন্দেশখালির মূল অভিযুক্তকে ‘সার্টিফিকেট’ মমতার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সন্দেশখালি সংঘর্ষের পরেই সামনে এসেছিল শেখ শাহজাহানের নাম। একদা সিপিএমের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা শাহজাহান এখন বসিরহাট ব্লকের তৃণমূলের ‘সম্পদ।’ বিজেপি-র অভিযোগ ছিল, তাদের কর্মীদের খুন করেছে শাহজাহানের বাহিনীই। এখনও অধরা তিনি। এর মধ্যেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বসে কার্যত সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন শাহজাহানকে। বললেন, “সিপিএমের সব লোক খারাপ আমি মনে করি না। শাহজাহান কিন্তু লক্ষ্মণ শেঠ নয়। ও এলাকায় পপুলার।”

অনেক বছর পর গত লোকসভা ভোটের সময়ে নামটা সামনে এসেছিল। সন্দেশখালির শেখ শাহজাহান। সামনে এনেছিলেন বসিরহাট কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সায়ন্তন বসু। গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে বিতর্কেও জড়িয়েছিলেন। বলেছিলেন, “শাহজাহান হোক আর ঔরঙ্গজেব হোক, তৃণমূলের যে বাহিনীই আসুক, আমি কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের বলব পা নয়, বুকে গুলি করুন।”
ভোট মিটে গিয়েছে। হেরে গিয়েছেন সায়ন্তন। জিতেছেন নুসরত জাহান। নির্বাচন পরবর্তী সন্দেশখালি-সন্ত্রাসে ফের উঠে এসেছে শাহজাহানের নাম। কিন্তু কে এই শাহজাহান?

এক সময়ে ছিলেন সিপিএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। গোটা বসিরহাট মহকুমায় লাল ঝাণ্ডার অ্যাকশন স্কোয়াডের নেতা ছিলেন এই ব্যক্তি। কিন্তু ২০০৯- এ তৃণমূলের উত্থানের সময় থেকেই রং বদলাতে শুরু করেন শাহজাহান। উনিশের লোকসভার পর বিজেপি-র অভিযোগের তির তাঁর দিকেই। গেরুয়া শিবিরের অভিযোগ, শাহজাহানের নেতৃত্বেই শনিবার রাতে নৃশংস হামলা চলেছে ন্যাজাটে। ঘুমন্ত অবস্থায় বিজেপি কর্মীদের বাড়ি থেকে তুলে এনে গুলি করে খুন করে শাহজাহানের দল।

বসিরহাট মহকুমার রাজনীতি সারা বছর উত্তপ্ত থাকার এক এবং একমাত্র কারণ ভেড়ি দখল। একরের পর একর মাছের ভেড়ি। যার দখলে ভেড়ি সাম্রাজ্য, সে-ই নেতা। বলা ভাল এখানে টাকাই জল, জলই টাকা। বসিরহাটের রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন যাঁরা ওয়াকিবহাল তাঁদের কথায়, বাম জমানায় সিপিএমের শীর্ষ নেতারাই ভেড়ি দখলের সমবায় খুলে দিয়েছিলেন। তৎকালীন এক বাম সরকারের মন্ত্রী তথা সিপিএমের উত্তর চব্বিশ পরগনার এক তাবড় নেতার স্নেহেই ২০০৩ থেকে শাহজাহানের উত্থান। এক বাম নেতার কথায়, “২০০৩-এর পঞ্চায়েত ভোটে ইন্টারভিউ হয়েছিল শাহজাহানের। দু’হাতে বন্দুক চালাতে পারত। চারের লোকসভায় একা সামলেছিল ভোট।”

এক সময়ে শাহজাহানের লাল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বসিরহাট মহকুমা অফিসে ধর্না দিয়েছিলেন বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী তথা উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা তৃণমূল সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। কিন্তু সময় বদলেছে। শাহজাহান এখন তৃণমূলে। এখন বিজেপি নেতারা সরব তাঁর বিরুদ্ধে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলায় যে-ই শাসন করুক, শাহজাহান যেন তাদেরই সম্পদ হয়ে ওঠেন।

ঠিক যে ভাবে ২০০৩-এর পঞ্চায়েতে অপারেশন চালিয়ে সিপিএমে নিজের খুঁটি শক্ত করেছিলেন শাহজাহান, ২০০৯-এর ভোটে একই ভাবে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন তৃণমূলে। বসিরহাটের লাল দুর্গ চুরমার করে জিতেছিলেন হাজি নুরুল ইসলাম। তারপর থেকে ভেড়ি সাম্রাজ্য চলে যায় তাঁর দখলেই।

রাজনৈতিক মহলের মতে, প্রদীপ মণ্ডল নামের যে বিজেপি কর্মী খুন হয়েছেন সন্দেশখালিতে, তাঁর বাবা আগে ছিলেন সিপিএমের পঞ্চায়েত সদস্য। তাঁরও ভেড়ি রয়েছে। কিন্তু শাহজাহানের সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। তাই বাবার পার্টি ছেড়ে তিনি যোগ দিয়েছিলেন বিজেপি-তে। টার্গেট একটাই, শাহজাহানের সাম্রাজ্যে থাবা বসিয়ে নিজের দখলদারি কায়েম।

অনেকের মতেই, উপরে রাজনীতির রাংতা থাকলেও, আসলে গোটাটাই ভেড়ির কাঁচা পয়সা। উত্তর চব্বিশ পরগনার শুধু বসিরহাট নয়, বারাসত মহকুমার শাসন, হাড়োয়াও একই কারণে বাম জমানা থেকে উত্তপ্ত। সিপিএম জমানায় সেখানকার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন দাপুটে নেতা মজিদ মাস্টার।
বসিরহাটে তৃণমূল বড় ব্যবধানে জিতলেও, ন্যাজাটে এ বার মুখ পুড়েছে শাসক দলের। ১৬টি বুথের মধ্যে ১২টি বুথে জিতেছে বিজেপি। বিজেপি-র একটি সূত্রের খবর, গেরুয়া শিবিরে ভেড়ার চেষ্টা করেছিলেন শাহজাহান। কিন্তু সুবিধে করতে না পেরে থেকে যান তৃণমূলেই। অনেকের মতে, দলের কাছে শক্তি বোঝাতেই ন্যাজাটে অপারেশন করেছিলেন শাহজাহান। যে অপারেশন নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে রাজভবন।

রাজ্য বিজেপি-র এক মুখপাত্র বলেন, “এটাই বাংলার অবস্থা। যেখানে মুখ্যমন্ত্রী দাগি ক্রিমিনালকে সার্টিফিকেট দেয়!”

You might also like