Latest News

‘ডাইনি’ অপবাদে ৮ মাস ঘরছাড়া, গ্রামে ফিরতে এসডিওর দ্বারস্থ বোলপুরের আদিবাসী পরিবার

দ্য ওয়াল ব্যুরো, বীরভূম: প্রায় ৮ মাস ‘ডাইনি’ অপবাদে ঘরছাড়া করে রাখার অভিযোগ নিয়ে খোদ মহকুমাশাসকের দ্বারস্থ হলেন বোলপুরের এক আদিবাসী পরিবার। অভিযোগ, পরিবারটির প্রায় ১২ জন সদস্যের এতগুলো দিন কেটেছে নানা জায়গায়। গাছের তলায়। ভোটের ভরা বাজারে এমন খবরে নড়ে বসেছে জেলা প্রশাসনও।

দুর্দশার কথা বলতে চোখে জলের বাঁধ মানেনি ওই পরিবারের মধ্যবয়সি বধূর। মহকুমা প্রশাসনিক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে সামনে থাকা একরত্তি শিশুগুলোকে জল খাওয়াতে খাওয়াতেই প্রশ্ন করলেন, “ঠিকানা না থাকলে কাজ করব কী করে? আমরা গরিব বলেই কি থানা-পুলিশ গ্রাহ্য করে না?” আরও বললেন, “যে পাড়াতেই যাচ্ছি আমাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। বলছে আমরা খারাপ। শুধু ঘরে ফিরে যেতে চাই। তাই আবারও আজকে এসডিও অফিসে এসেছি।”

বীরভূমের নানা প্রান্তে অতীতে তো বটেই আজও ডাইনি অপবাদের মতো কুসংস্কার রয়ে গিয়েছে। এমন প্রথার মূলে আছে অশিক্ষা। সেটা নানা সমীক্ষাতেও স্পষ্ট হয়েছে। এর সঙ্গে অনেক সময় যুক্ত থাকে আর্থিক বিষয়টিও। এক্ষেত্রে ঘটনাটি কি?

ওই আদিবাসী পরিবার সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০২০ সালের ২১ জুলাই মণিকুণ্ডুডাঙা গ্রামে একটি সালিশি সভা বসে। মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত ওই গ্রামের জনসংখ্যাও বেশি। সেই সভাতেই ওই বধূ এবং তাঁর ছেলে-বৌমাদের ডাইনি অপবাদ দেওয়া হয়। তারপরই তাঁদের গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নিদান দেওয়া হয়। গ্রাম না ছাড়লে পরিবারের সকলকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়। ওইদিনই তাঁরা গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন। এরপরই বোলপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। গ্রামে ফেরানোর জন্য সিয়ান মুলুক গ্রাম পঞ্চায়েত এবং বোলপুর-শ্রীনিকেতন ব্লকেও লিখিত আবেদন জানানো হয়। পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী গাঁওতার পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এরইমধ্যে পেরিয়ে গিয়েছে প্রায় আটমাস। এখনও গ্রামছাড়া ওই পরিবারের ১২জন। কখনও গাছের তলায়, কখনও আত্মীয়ের বাড়িতে, কখনও রাস্তায় দিন কাটছে।

পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী গাঁওতার বোলপুর-শান্তিনিকেতন শাখার পক্ষ থেকে শিবু সরেন বলেন, “ঘটনার কথা জানার পর থেকেই পরিবারটির সঙ্গে ছিলাম। প্রশাসনিক সব রকম কাজ করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনও পরিবারটিকে গ্রামে ফেরাতে পারিনি। আজকে মহকুমাশাসকের কাছে এসেছি আরও একবার আবেদন করতে যাতে এই নির্বাচনের আগে তাঁরা গ্রামে ফিরে যেতে পারেন। খুবই কষ্টে আছেন ওঁরা।”

পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের তরফে বিজ্ঞানকর্মী শুভাশিস গড়াইয়ের প্রতিক্রিয়া, “ডাইনি অপবাদে একটি পরিবার আটমাস ঘরছাড়া খুব দুঃখজনক ঘটনা। আমরা ওই গ্রামে গিয়ে মানুষের মধ্যে যে কুসংস্কার আছে, অন্ধবিশ্বাস আছে তা দূর করার জন্য যাবতীয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। তবে ওই পরিবারকে গ্রামে ফেরানোর এবং নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে প্রশাসনকে।”

বীরভূম জেলায় ডাইনি সন্দেহে নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষত আদিবাসী সমাজে বারবার এমন ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়তেই অনেকে ফিরে গেছেন ২০১৮ সালে। ডাইন অপবাদে পাড়ুই থানার রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের বছর সত্তরের বৃদ্ধ ফন্দি সর্দারের দু’হাতের দশটি আঙুল কেটে দেওয়া হয়েছিল সেবার। নিদান দিয়ে তাঁর নিজের ছেলেকে দিয়েই এই কাজ করানো হয়েছিল। গ্রামে ফিরে যেতে পারলেও পরবর্তীতে এমন কোনও ঘটনা যাতে ওই  পরিবারের সঙ্গে না ঘটে সেই বিষয়ে প্রশাসনকে সক্রিয় থাকতে হবে বলেও মত বোলপুরের বাসিন্দাদের।

বোলপুরের মহকুমাশাসক মানস হালদার জানান, বিষয়টি এসডিপিও (বোলপুর), বিডিও (বোলপুর-শ্রীনিকেতন ব্লক), আইসি (বোলপুর থানা)-কে জানিয়েছেন তিনি। গ্রামবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব পরিবারটিকে গ্রামে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

You might also like