Latest News

পুজোর মধ্যেও রাস্তার আন্দোলনে উত্তীর্ণরা, প্রতিশ্রুতি ভেসে যায় উৎসবের শহরে

দ্য ওয়াল ব্যুরো:‌ ‘‌আমাদের বুকে আগুন জ্বলছে। পুজোয় কোনও আনন্দ নেই। আমাদের পুজো কাটবে ধর্নামঞ্চেই।’‌ বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্তের কথাই জানিয়েছেন চাকরির (SSC) দাবিতে কলকাতায় ধর্নায় বসা যুবক–যুবতীরা। গান্ধী মূর্তির পাদদেশে ৫৬৪টি দিন ধরে ধর্নায় বসে রয়েছে বাংলার শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিরা।

Image - পুজোর মধ্যেও রাস্তার আন্দোলনে উত্তীর্ণরা, প্রতিশ্রুতি ভেসে যায় উৎসবের শহরে

আজ চতুর্থী। উৎসবের শহরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ইতিমধ্যেই ভিড় জমতে শুরু করেছে। রাস্তাঘাট ভেসে যাচ্ছে আলোর রোশনাইয়ে। কিন্তু চাকরিপ্রার্থীরা জানাচ্ছেন, তাঁদের চোখে অন্ধকার (SSC SCAM)। বাংলার খেতমজুর, প্রান্তিক কৃষক, কারখানার শ্রমিক, নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ির সন্তান এঁরা। অভাবী পরিবারের মধ্যে বড় হওয়ার জেদ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। সরকারি নিয়োগের পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে মেধা তালিকায় নামও উঠেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত নিয়োগপত্র মেলেনি। তাই পুজোর মুখে কারও চোখে জল, কারও গলা বুজে আসছে কথা বলতে গিয়ে। পরিবারের কথা বলতে গিয়ে অনেকেরই ঝাপসা হচ্ছে চোখ। তবু ধর্নামঞ্চ ছাড়বেন না তাঁরা।

কী দাবি চাকরিপ্রার্থীদের? ধর্নামঞ্চ থেকে শাহিদুল্লাহ বলেছেন, ‘আমাদের জীবন থেকে সব আনন্দ উবে গিয়েছে। আমাদের হকের চাকরি করছে জালিয়াতরা। যতদিন না চাকরি পাচ্ছি, আন্দোলন চলবে। পুলিশের তরফ থেকে এখনও আমাদের উঠে যেতে বলা হয়নি। তাই আমাদের পুজো (Durga Puja 2022) কাটবে কলকাতার রাজপথেই।’‌

পুলিশ বলেনি হয়তো ঠিকই, তবে শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে বলেছিলেন, ওয়েট লিস্টে থাকা প্রার্থীদের চাকরির ব্যবস্থা করতে সরকার সবরকম চেষ্টা করবে। এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। তা ছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও চান না, যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হোক। তাই ধর্না মঞ্চে থাকা প্রার্থীদের অনুরোধ করছি, বাড়ি যান, পুজোর সময়টা পরিবারের সঙ্গে কাটান।

কিন্তু বীরভূমের জয়ন্ত হাজরা এদিন বললেন, ‘আশা ছিল অন্তত এবার পুজোর আগে নিয়োগ হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তেমন আভাস নেই। এই দুর্নীতির সঙ্গে শাসকদলের নেতা–মন্ত্রী ও একাধিক আমলা যুক্ত। যারা টাকা দিয়ে নিয়োগ পেয়ে শিক্ষকতা করছে, তদন্ত করলেই তাদের অনায়াসেই ধরা যাবে। আমারা আন্দোলন চালিয়েই যাব। পুজোর মধ্যেও আমাদের ফিরে যাওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই। আমাদের পরিবারও আমাদের লড়াইয়ে সঙ্গে রয়েছে।’‌

চাকরির দাবিতে গান্ধী মূর্তির তলায় অবস্থান করছেন এসএসসি চাকরিপ্রার্থীরা। সংলগ্ন এলাকাতেই অবস্থান করছেন ২০১৪ সালের টেট উত্তীর্ণদের একাংশ। কেউ আসেন বসিরহাট থেকে কেউ কৃষ্ণনগর। অনেক ভোরে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়। ফিরতে রাত। কেউ একদিন না আসতে পারলে, তাঁর হয়ে আসেন বাবা–কাকা বা পরিবারের কেউ। বাড়িতে অনেকেরই ছোট বাচ্চা রয়েছে। পরিবারের অন্যরাই দেখভাল করে তাদের। সারাদিন মায়ের দেখা পায়না সেইসব শিশুরা। অনেকেরই বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। ছেলেদের অনেকেই কলকাতায় সস্তায় ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে পাঁচ–ছ’‌জন মিলে থাকেন। সকাল হলেই নাইলনের ব্যাগে প্লাকার্ড, ফেস্টুন ঠেসে নিয়ে আসেন ধর্নামঞ্চে। এটাই তাঁদের দীর্ঘ রুটিন। পুজোতেই তার অন্যথা হবে না বলেই জানাচ্ছেন চাকরিপ্রার্থীরা। সকাল ১০টা থেকে ৫টা, সময় বেঁধে দিয়েছে মহামান্য আদালতই।

Image - পুজোর মধ্যেও রাস্তার আন্দোলনে উত্তীর্ণরা, প্রতিশ্রুতি ভেসে যায় উৎসবের শহরে

কলকাতায় ভাড়া বেশি, তাই সংলগ্ন শহরতলিগুলিতেও বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছেন বহু এসএসসি পাস ছেলেমেয়েরা। একটা ঘরে দলবেঁধে ২০-২২জন মেয়ে কোনোরকমে রাতে মাথা গুঁজে থাকেন। শিলিগুড়ি, বহরমপুর, বীরভূম, মালদহ, রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে ওঁরা ১০টার মধ্যে পৌঁছে যান কলকাতায়। আবার সন্ধ্যায় ফিরে যাওয়া ভাড়া বাড়ির ঠিকানায়। ভাড়ার বাড়িতে যাঁরা নেই, তাঁরা ট্রেন বাসের নিত্যযাত্রী।

চাকরির প্রতীক্ষায় থেকে অনেকেই বাবা, মাকে হারিয়েছেন। জানা গেল, অপেক্ষায় থেকে নিজেকে সামলাতে পারেননি অতনু মিস্ত্রি নামে মেধা তালিকায় থাকা এক যুবক। আত্মঘাতী হয়েছেন তিনি। আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেও প্রাণে বেঁচেছেন আরও এক তরুণী। তিনি আজও আসেন ধরনায়। চাকরির আশায়।

তাঁদের কথায় উঠে এল, ২০১৮সালে ২৯দিন কলকাতা প্রেস ক্লাবের সামনে ধর্নায় বসার পর তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। সঙ্গে এনেছিলেন পার্থ চ্যাটার্জিকে। স্বচ্ছ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারপর ২০১৯সালে সেন্ট্রাল পার্কে টানা ১৮৭দিন ধর্নার পর এখন ওঁদের ঠাঁই হয়েছে ময়দানের গান্ধীমূর্তির তলায়। ২০২১ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া সেই ধর্না এখন ৫৬৪ দিনে। ধর্নামঞ্চের পাশ দিয়ে হু হু করে ছুটে যায় গাড়ি। ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে গেলে বাসের জানলা দিয়ে, গাড়ির কাচের ভিতর দিয়ে সহ নাগরিকরা দেখেন ওঁদের। ফুটপাতের ধর্না মঞ্চ থেকে স্লোগান দেন বহরমপুর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়া যুবক সুদীপ মণ্ডল, ‘দিদি তোমার প্রতিশ্রুতি/ কবে হবে ফলশ্রুতি/ তাই সংগ্রাম চলছে।’

সুদীপ বললেন, ‘গতবছর পঞ্চমীর দিন পুলিশ এসে আমাদের তুলে দিয়েছিল। না হলে গতবছরও আমরা পুজোয় ধর্নামঞ্চেই কাটাতাম। এবছর এখনও পুলিশ কিছু বলেনি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পুজোর মধ্যেও ধর্না চালিয়ে যাব। আসলে আমাদের জীবনটাই এলোমেলা হয়ে গেয়ে। পুজোয় বাড়িতে গিয়ে কী করব। বাড়িতে অভাব। পুজোয় একটা নতুন জামাও কিনিনি। আমরা কেউ ভালো নেই। আমরা আমাদের নায্য চাকরি চাই।’

বেআইনি চাকরি পাওয়া শিক্ষকরা আবর্জনা, ছাত্ররা এঁদের দিকে আঙুল তুলবে: বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু

You might also like