Latest News

ঘাসফুল ও জোড়াফুল

অমল সরকার

২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের বেশ কয়েক মাস পরের কথা। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছে। কথায় কথায় বললেন, ভোটের রাজনীতিতে আমি হাফ সেঞ্চুরি করতে চললাম। কিন্তু কোনও দিন এত অপমানিত বোধ করিনি যা ইদানীং করছি।

প্রসঙ্গ তৃণমূল-আইপ্যাক চুক্তি। দলের এক কমবয়সি নেতার মুখ থেকে সুব্রতদা ততদিনে শুনেছেন, তৃণমূলে আইপ্যাকের ভূমিকা কী হবে। সেদিন বারেবারেই সুব্রতদা বলছিলেন, ‘ভাবতে পারো, আমাদের মতো বুড়োদেরও নাকি ওদের কাছ থেকে জনসংযোগ শিখতে হবে! এত বছর তবে মাঠে-ময়দানে রাজনীতি করলাম কেন? রাজনীতি শেখাবে কিনা প্রাইভেট কনসালট্যান্ট! এরপর তো দেখছি পার্টি-পলিটিক্স করতে ডিগ্রিধারী হতে হবে।’ সেই ‘অসম্মান’ মেনে নিয়েই দলে এবং সরকারে আমৃত্যু ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়।

মাস কয়েক আগে প্রয়াত হয়েছেন রাজনীতির সেই পোড়খাওয়া মানুষটি। তাঁর বিলাপের সঙ্গে তৃণমূলের চলমান বিতর্কের খানিক মিল আছে। আইপ্যাক-তৃণমূল সুসম্পর্ক নিয়ে চলতি বিতর্কে সেটি একটি ইস্যু। আর আছে এক ব্যক্তি এক পদ এবং দল ও সরকারের নেতৃত্বে বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া। লক্ষ্যনীয় হল, সব ক’টি ইস্যুতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠদের থেকে আলাদা। তৃণমূল নেত্রী মুখ না খোলায় তাঁর অবস্থান নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। ফলে ‘পিসি-ভাইপো বিরোধ’ জাতীয় আলোচনায় মশগুল রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কে আগ্রহী মানুষজন।

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হল, ইস্যুগুলির অবতারণা করছেন স্বয়ং দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক। নেতাকুলের মধ্যে তিনিই আবার সর্ব কনিষ্ঠ। তৃণমূলের জন্মের পরে বিগত ২৪ বছরে এমন সব বিষয়ে আলোচনা, বিতর্কের নজির নেই। এমনকি শাসক দল হিসেবে ফেলে আসা ১১ বছরের দিকে নজর ফেরালেও দেখা যাবে এমন বিতর্কের দৃষ্টান্ত ঘাসফুলের পার্টিতে নেই। জেলায় জেলায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, তোলাবাজি নিয়ে জেলা নেতাদের শাসন করতেই বেলা গড়িয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের শূন্যতার সুযোগে সারদা, নারদ কেচ্ছার পরও তৃণমূল রাজ্যপাটে আরও বেশি শক্তি সঞ্চয় করে আসীন হয়েছে।

অভিষেকের তোলা ইস্যুগুলি বরং সেদিক থেকে নতুন এবং স্বাস্থ্যকর। এমন সব বিষয়ে আর পাঁচটা দলে যা হয়ে থাকে তাঁর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর অভিমত দলে সর্বজনগ্রাহ্য নয়, নানা প্রতিক্রিয়ায় তা স্পষ্ট। সেটাও দলীয় গণতন্ত্রের প্রশ্নে ইতিবাচক।

ঘাসফুলের কথা বলছিলাম। ঘাসফুল কথাটা তৃণমূল নেতাদের মুখেও বহুকাল শুনি না। মিডিয়াতেও হয়তো সেই কারণে শব্দটি উধাও। আড়াই দশক আগে পার্টির জন্মের পর বহু বছর তৃণমূলকে লোকে ঘাসফুলের পার্টি বলেই চিনত, জানত। এখন লক্ষ্য করি, দেওয়ালে দলের প্রতীকটি আঁকার সময়ে জোড়া ফুল দুটি আঁকতে কর্মীরা যতটা যত্নবান, ততটা নন নীচের ঘাসপাতাগুলি আঁকার ক্ষেত্রে। হতে পারে সেটা দেখার ভুল, আরোপিত ভাবনা। কিন্তু ঘাসফুল কথাটির ব্যবহার নেই, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে বলে মনে হয় না।

আইপ্যাক প্রসঙ্গে ফেরা যাক। তারা একটি পেশাদার কোম্পানি। আর পাঁচটা কোম্পানির মতো তারাও এক জায়গার সাফল্য আর এক জায়গায় প্রোজেক্ট করে ব্যবসা বাড়াতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের অভাবনীয় সাফল্যের পিছনে এই সংস্থার অবদান অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই, কারণ প্রার্থী বাছাই থেকে প্রচার, সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারেই তারা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।

সমস্যা হল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই সংস্থার অবদানকে যেভাবে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে স্বীকার করে নিয়েছেন, বিশেষ করে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মতো অনেকেই তা অন্তত প্রকাশ্যে মানতে নারাজ। তারা হয়তো মনে করেন, তাতে রাজনীতিতে তাঁদের লম্বা সফর এবং অর্জনকে খানিক খাটো করা হবে। মেনে নিতে হবে, এত বছর মাঠে ময়দানে রাজনীতি করার পরও মানুষের মন বুঝতে তাঁরা ব্যর্থ।

কিন্তু দলের নবীন নেতা অভিষেক কুণ্ঠিত নন। কারণ, মাত্র ৩৩ বছর বয়সে একজন পেশাদার সর্বক্ষণের রাজনীতিক, দু’বারের সাংসদ হলেও আদতে তিনি ম্যানেজমেন্ট জগতের মানুষ। এই জায়গায় তাঁর ও প্রশান্তর অবস্থান অভিন্ন। দু’জনেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁদের ম্যানেজমেন্ট শিক্ষাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে চলতি মত-পার্থক্যের পিছনে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ একটি কারণ তো বটেই।

যদিও ছোট-বড় সব দলেই নবীন প্রজন্ম এভাবেই দলকে চালিত করছে। উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ, বিহারে তেজস্বী, ঝাড়খণ্ডে হেমন্ত সোরেন, অন্ধ্রপ্রদেশে জগনমোহন– কে নয়? বাদ নেই কংগ্রেস, বিজেপির মতো বড় পার্টিও।

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পেশাদার সংস্থার সম্পর্ক এখন আর ভোটের আগে প্রচারের কৌশলে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তারাই বাতলে দিচ্ছে রাজনীতির কোন সন্ধিক্ষণে কোন কথাটা কীভাবে বলতে হবে। নাটক-সিনেমার স্ক্রিপ্টের মতো নেতা-নেত্রীদের সম্বৎসর কনসালট্যান্ট সংস্থার তৈরি বুলি আউড়ে যাওয়াই দস্তুর। আসলে এখন কনসালটেন্সি আর ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির রাজ চলছে সর্বত্র। রাজনীতির তা থেকে দূরে থাকার কথা নয়।

লক্ষ্যনীয় হল, অভিষেকের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত নন যাঁরা, তাঁরা একজনও তাঁকে সাধারণ সম্পাদক করা নিয়ে প্রকাশ্যে অন্তত প্রশ্ন তোলেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের মাথায় থাকা পর্যন্ত সে স্পর্ধা কেউ দেখাবেন বলেও মনে হয় না। মজার বিষয় হল, আঞ্চলিক দলগুলির প্রায় সবই কংগ্রেসের ঘোর নিন্দুক, আবার একই সঙ্গে গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টির পরিবারতন্ত্রকে নকল করতে ছাড়ে না।

দলে অভিষেকের উত্থানকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল পরিবারতন্ত্র বলে মানতে নারাজ। একথাও ঠিক, গত বছর বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইয়ে পিসি-ভাইপো সমানতালে লড়াই করেছেন। ফল ঘোষণার অল্পদিনের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাই ভোট-যুদ্ধে লড়াইয়ের পুরস্কার হিসাবেই অভিষেককে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে বসিয়ে দেন। বিধানসভা ভোটের আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, মন্ত্রী হতে চান না। দলকে বড় করার কাজেই ব্যস্ত থাকতে চান।

সাধারণ সম্পাদক হওয়ার অল্পদিনের মধ্যে ত্রিপুরা, গোয়া, মেঘালয় এবং আরও কিছু রাজ্যে তৃণমূলের ঝাঁপিয়ে পড়া অভিষেকের সেই ঘোষণারই প্রতিফলন। দল ভাঙানোর খেলায় তৃণমূল খানিক সফলও বটে। কিন্তু গড়ের মাঠের দলবদল বা আইপিএলের প্লেয়ার কেনাকাটা আর রাজনীতিতে দল ভাঙানো এক জিনিস নয়। যেমন এক নয় লুইজিনহো ফেলেইরোর মতো কিছু নেতাকে দলে এনে গোয়াবাসীর মনজয় করা। গোয়ার এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে তৃণমূল সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করার পাশাপাশি রাতারাতি রাজ্যসভায় পাঠিয়ে দিল একজনকে মাঝপথে পদত্যাগ করিয়ে। সেই লুইজিনহো দলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে বিধানসভা নির্বাচনের লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। কারণ তিনি জানেন, বিধানসভায় জয় বা পরাজয় কোনওটিতেই তাঁর কিছু যায় আসে না। তিনি বরং বুঝেছেন, এমএলএ ভোটে জিতে গেলে তৃণমূল তাঁকে বলতে পারে রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করে বিধায়ক হিসাবে কাজ করে যেতে।

আসলে আঞ্চলিক দলগুলি স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, আশা-ভরসাকে পাথেয় করে গড়ে উঠেছে। নামের ডগায় ‘অল ইন্ডিয়া’ শব্দযুগল কিংবা ভোটপ্রাপ্তির নিরিখে জাতীয় দলের স্বীকৃতি, আর দল ভাঙিয়ে রাজ্যে রাজ্যে পতাকা অস্তিত্ব জাহির জলভাত, সর্বভারতীয় দল হয়ে ওঠা মোটেই তেমন সহজ কাজ নয়। বরং সহজতর হল রাজ্যের শক্তিতে ভর করে জাতীয় রাজনীতিতে নির্ধারক হয়ে ওঠা। রাজ্যে রাজ্যে নেতা কিনে বড় হওয়ার চেয়ে সেটা অনেক গর্বের।

‘এক ব্যক্তি এক পদ’, প্রায় সব দলেই স্বীকৃত। আবার সব দলেই তার বিস্তর ব্যতিক্রম আছে। বাদ নেই কমিউনিস্ট পার্টিও। আসলে রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ যেমন আছে, তেমনই আছে পরিস্থিতি বুঝে চলার দায়। ২০১৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে অভিষেক ছিলেন না। শোনা যায়, শোভন চট্টোপাধ্যায়কে মেয়র পদে রেখেও মন্ত্রিসভায় একাধিক দফতর দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি মানতে পারেননি। হয়তো এক ব্যক্তি এক পদ নীতিতে তিনি অবিচল বলেই ফিরহাদ হাকিমের মেয়র এবং মন্ত্রী থাকা প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছিল।

অভিষেকের আপত্তিতেই তৃণমূলে ফেরা আটকে গিয়েছে শোভনের। ধরে নেওয়া যায়, এই ক্ষেত্রেও অভিন্ন নয় মমতা-অভিষেক অবস্থান। তার মূলে আছে দল পরিচালনায় দু’জনের ক্ষেত্রে সময় এবং পরিস্থিতির ফারাক। তৃণমূল নেত্রী দল চালিয়েছেন অনেকটা যৌথ পরিবার চালানোর মতো করে। রাতবিরেতে ঘটনা-দুর্ঘটনা, আপদ-বিপদে ফোনে ঘুম ভাঙিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছেন নেতা-কর্মীদের। কেউ কোনও দিন মুখের উপর না বলেছে বলে শুনিনি। ফলে দল চালনায় তাঁর বোধ-বিবেচনার সঙ্গে কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট চালিত ভাবনার ফারাক স্বাভাবিক। কাউকে দলের প্রয়োজনে বাদ দেওয়া আর মর্জিমতো কলম ছেঁটে ফেলা, দুটো এক নয়। সেই কারণেই মদন মিত্র ও অনুব্রত মণ্ডলদের জন্য তৃণমূলই একমাত্র পার্টি এবং যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই দলে শেষ কথা, ততদিন তাঁরাও নিরাপদ।

সহজ নয় নেতাদের বয়সসীমা বেঁধে দেওয়াও। বিজেপি এবং কমিউনিস্ট পার্টির মতো শৃঙ্খলাপরায়ণ দলেও এই নীতি সহজে কার্যকর করা যায়নি। ফোঁস করেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানির মতো মানুষও। স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমবয়সিদের নেতৃত্বে চান বলেই অভিষেকের উত্থান। আবার বয়সের কারণে বাদ পড়ার সম্ভাবনা যাঁদের, তাঁদের বেশিরভাগই তৃণমূল নেত্রীর লড়াই-সংগ্রামের গোড়ার সাথী। পার্টিতে নবীন আর প্রবীণ যেন দেওয়ালে আঁকা আবছা ঘাসফুল উপর ঝকমকে জোড়াফুল হয়ে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে পা ফেলাও দস্তুর তৃণমূল নেত্রীর।

তবু, অভিষেকের প্রশংসা প্রাপ্য তিনি দলীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক কিছু ইতিবাচক বিতর্কের অবতারণা করেছেন। এতে দলের ভালই হবে।

You might also like