Latest News

যোগী-রাজ্যে ‘লড়কি হুঁ, লড় সকতি হুঁ’! স্লোগানে সনিয়া, রাহুলকেও বার্তা প্রিয়াঙ্কার?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মহিলা ভোটারদের সবচেয়ে বেশি করে কাছে টানার চেষ্টা করছে। অন্য দলগুলি যখন জাতপাতের চেনা অঙ্কে ভোটের ঘুঁটি সাজাচ্ছে, তখন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এগোতে চাইছেন মহিলাদের নিয়ে। ওই রাজ্যের ৪৫ শতাংশ মহিলা ভোটারকে মূল টার্গেট করছেন যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কংগ্রেসের এই সাধারণ সম্পাদক। দু’দিন আগেই তিনি মহিলাদের জন্য পৃথক একটি ইস্তাহার প্রকাশ করেছেন। আগেই ঘোষণা করেছেন কংগ্রেস এবার ৪০ শতাংশ মহিলা প্রার্থী দেবে।

মহিলাদের জন্য কংগ্রেস প্রকাশিত ইস্তাহারের মূল স্লোগান ‘লড়কি হুঁ, লড় সকতি হুঁ।’ অর্থ সহজ, মহিলারা যে পুরুষের তুলনায় কোনও অংশে কম নয় সেটাই তুলে ধরা, নারী সমাজকে উৎসাহিত করা। কংগ্রেসের প্রচার ভিডিও-তেও দেখানো হয়েছে, সাইকেল থেকে যুদ্ধ বিমান, মহিলারা সব ক্ষেত্রেই পুরুষের সমকক্ষ। দেখানো হয়েছে মহিলাদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও।

যোগী আদিত্যনাথের সরকারের বিরুদ্ধে সব দলই মহিলাদের উপর অত্যাচার, যৌন আক্রমণের ঘটনা নিয়ে সরব। তারই মধ্যে প্রিয়াঙ্কার গলাই সবচেয়ে চড়া। বস্তুত, ধর্মীয় মেরুকরণের পাশাপাশি এই বিষয়টিকেও অন্যতম ইস্যু করে তোলার কৃতিত্ব অনেকেই দিচ্ছেন সনিয়া কন্যাকে। বিজেপি, সমাজবাদী পার্টি মহিলাদের সম্মান করে না, এগিয়ে যাক চায় না, তারা নারী বিদ্বেষী, একের পর এক সভায় বলছেন প্রিয়াঙ্কা। কিন্তু এরই মধ্যে মহিলা ভোটারদের আকর্ষণ করতে প্রিয়াঙ্কার তৈরি মূল স্লোগানটি নিয়ে কংগ্রেসের অন্দরেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে। কানাঘুষো শুরু হয়েছে, প্রিয়াঙ্কার ওই স্লোগানের মধ্যে কি মা সনিয়া এবং দাদা রাহুলের জন্যও ভবিষ্যৎ বার্তা রয়েছে?

কংগ্রেসের সাধারণ কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে প্রবীণ নেতা, সকলের সব পরামর্শ দূরে ঠেলে সনিয়া রাহুল গান্ধীকেই তাঁর উত্তরসূরী বেছে নিয়েছিলেন। রাহুল প্রথমে কংগ্রেসের সহ-সভাপতি, পরে সভাপতি হন। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিপর্যয়ের পর সভাপতি পদ ছেড়ে দেওয়ায় সনিয়া এখন কার্যনির্বাহী সভাপতি।

কিন্তু রাহুলকে দলের ব্যাটন দেওয়ার সময় গোটা দেশ থেকেই আওয়াজ ওঠে প্রিয়াঙ্কা লাও, কংগ্রেস বাঁচাও। প্রিয়াঙ্কার চেহারা এবং বাচনভঙ্গির মধ্যে ঠাকুমা ইন্দিরারে খুঁজে পান কংগ্রেস কর্মীরা। সেই দাবিতে সনিয়ার দুয়ারে মিটিং মিছিল হলেও তাতে আহ্বানে সাড়া কংগ্রেস সভানেত্রী।

রাহুল যখন একের পর এক নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়ে দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছেন, তখন প্রিয়াঙ্কা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে ভোট যুদ্ধে দলের হাল ধরেছেন। পাঁচ বছর আগের বিধানসভা ভোটেও তিনি ছিলেন একজন প্রচারক।উত্তরপ্রদেশে নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে কংগ্রেসের মৃতসঞ্জিবনী হয়ে উঠতে দিনরাত খাটাখাটুনি করছেন এই কংগ্রেস নেত্রী। গত বিধানসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে জোট করে মাত্র সাতটি বিধানসভা আসন জিতেছিল কংগ্রেস। ভোট পেয়েছিল ছয় শতাংশ। যদিও কংগ্র্সে যে ১৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল সেগুলিকে প্রাপ্ত ভোটের হিসাব ধরলে হাতচিহ্নের ঝুলিতে গিয়েছিল ২২ শতাংশ ভোট। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ফের বড় ধাক্কা খায় কংগ্রেস।

এই পরিস্থিতিতে কোনও দলই বিধানসভা ভোটের মুখে এখন কংগ্রেসের হাত ধরতে চায়নি। সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব। তিনি উল্টে কংগ্রেস শূন্য উত্তরপ্রদেশ করার ডাক দিয়েছেন।

তাই প্রিয়াঙ্কার অঙ্ক মহিলা ভোট। কারণ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকে ধাপে ধাপে কংগ্রেসের জাতভিত্তিক ভোট ব্যাঙ্ক ক্রমশ চলে গিয়েছে বিভিন্ন দলের কাছে। উচ্চবর্ণের ভোট গিয়েছে বিজেপি শিবিরে। দলিত, ওবিসি এবং মুসলিম ভোট ভাগাভাগি করে নিয়েছে সমাজবাদী ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি।

মুলায়ম, অখিলেশ, মায়াবতীর মতো কোনও নেতা না থাকায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস একেবারে নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে প্রিয়াঙ্কার তাস মহিলা ভোট। ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে একাদশ শ্রেণিতে পড়া মেয়েদের ল্যাপটপ দেবে। কলেজ ছাত্রীরা পাবেন স্কুটি। আত্মসম্মান, সম্মান, শিক্ষা, স্বাবলম্বন এবং স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা, মহিলাদের জন্য এই ছয়টি বিষয় কংগ্রেস নিশ্চিত করবে বলে ঘোষণা করেছেন প্রিয়াঙ্কা। আর সব কিছু মিলিয়েই তাঁর স্লোগান, ‘লড়কি হুঁ, লড় সকতি হুঁ।’

ভোটের বাক্সে প্রতিফলন হবে কি না, তা যদিও ভবিষ্যৎই বলবে, তবু কংগ্রেসের পাশাপাশি বিরোধী শিবিরেও প্রিয়াঙ্কার সভার ভিড় নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। যা থেকে চাপাস্বরে এই আলোচনাও সামনে আসছে, প্রিয়াঙ্কার নেতৃত্বে কংগ্রেস যদি গতবারের থেকে ভালো ফল করতে পারে তাহলে গান্ধী পরিবারেও দলীয় ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে ভাবনার ঝড় ধাক্কা দেবে। প্রিয়াঙ্কাকে যখন নেতৃত্বে সামনের সারিতে আনার কথা হয়েছিল তখন তিনি নিজেই তেমন একটা উৎসাহ দেখাননি। মূলত, প্রচারেই মা, দাদাকে সঙ্গ দিতেন। দলের অন্য বিষয়ে ঢুকতেন না। কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবৎ তিনি বেশ সক্রিয়। ইতিমধ্যে তাঁর সাংসারিক চাপও অনেকটা কমে গিয়েছে দুই সন্তান বড় হয়ে যাওয়ায়।

আগামী বছরের মাঝামাঝি নাগাদ সনিয়ার কংগ্রেস সভাপতির পদ ছেড়ে দেওয়ার কথা। দলের ওয়ার্কিং কমিটির শেষ বৈঠকে প্রাথমিক কথাবার্তায় ঠিক হয়ে আছে রাহুল গান্ধীই ফের কংগ্রেস সভাপতি হবেন। অনেকে মনে করছেন, উত্তরপ্রদেশে প্রিয়াঙ্কার নেতৃত্বে কংগ্রেস আগের তুলনায় ভাল ফল করলে সনিয়ার পক্ষে নেতৃত্বে বারে বারে ব্যর্থ প্রমাণিত রাহুলকে দ্বিতীয়বারের জন্য কংগ্রেস সভাপতি করে দেওয়া সহজ কাজ হবে না। ফের আওয়াজ উঠবে, প্রিয়াঙ্কা লাও, কংগ্রেস বাঁচাও। স্বয়ং প্রিয়াঙ্কার তাতে সায় থাকবে না কে বলতে পারে!

You might also like