Latest News

School Dress: স্কুল খুললেও এখনও মেলেনি ইউনিফর্ম, চিন্তিত অভিভাবকরা

আকাশ ঘোষ

‘মা, স্কুলের জামাটা ছোট হচ্ছে’, বলেই মায়ের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ছেলেটা। মাও একটু ইতস্তত করে জবাব দেন, ‘কষ্ট করে পরে নে বাবা, দেখ না স্কুলে গিয়ে, নতুন জামা দিতে পারে।’

করোনার ভয়াবহতা কাটিয়ে চলতি বছরের ফেব্রয়ারি মাসে ধাপে ধাপে রাজ্যের স্কুলগুলো খুলতে শুরু করেছিল। সেই সময় বাড়িতে বাড়িতে দেখা গিয়েছিল এমনই চিত্র (School Dress)।

২০১৯ সালে শেষবার রাজ্যের স্কুল পড়ুয়ারা সরকারের থেকে জামা জুতো (School Dress) পেয়েছিল। তখনও করোনা চোখ রাঙায়নি। ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যায় স্কুলের দরজা। তারপর কেটেছে প্রায় দু’বছর, করোনার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ঢেউ পেরিয়ে ফের স্বাভাবিক হয়েছে স্কুলের পঠনপাঠন। স্কুল বন্ধ থাকায় পড়ুয়াদের জামা জুতো (School Dress) দেওয়ার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখায়নি রাজ্য সরকার। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে স্কুল খোলার তিন মাস কেটে গেলেও এখনও রাজ্যের স্কুল পড়ুয়ারা জামা, জুতো পায়নি।

অগত্যা ভরসা করতে হচ্ছে পুরনো জামার ওপরই। নয়তো বা দোকান থেকে নতুন জামা জুতো কিনতে হচ্ছে অভিভাবকদের। কিংবা চেয়েচিন্তে চালাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, কবে আবার স্কুল থেকে ড্রেস দেওয়া হবে?

সর্ব শিক্ষা মিশনের অধীনে স্কুলে স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের জামা, জুতো দেওয়া হয়। এখন সেই জামা, জুতোরই প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন অভিভাবকরা।

বরানগর নরেন্দ্রনাথ বিদ্যামন্দিরের ছাত্র শৌনক ভট্টাচার্য। তার অভিভাবক বলেন, ‘স্কুল থেকে ইউনিফর্ম তো দেওয়ার কথা। আগে দিত। এখন লকডাউনের এই গ্যাপটার পর স্কুলই তো ঠিকমতো হচ্ছে না। এই স্কুল খুলছে এই আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পুরনো ইউনিফর্ম একটু ছোট হয়ে গেছে, ওই পরেই পাঠিয়েছি স্কুলে। এখনও নতুন কিনিনি। আবার তো স্কুল বন্ধ হয়ে গেল।’

বিটি রোড সিআইটি স্কুলের ছাত্র রূপাঞ্জন ভট্টাচার্য। তার অভিভাবক বললেন, ‘লকডাউন যেবার হল তার একটু আগে স্কুল থেকে ইউনিফর্ম দিয়েছিল। ২০১৯ সালে মনে হয়। তারপর তো স্কুল বন্ধ ছিল, আর দেয়নি। কিছুদিন আগে ২০২১ সালে একবার স্কুল থেকে জুতো দিল। ড্রেস দেয়নি। আমার ছেলে লম্বা হয়েছে। আগের ড্রেস পরিয়ে স্কুলে পাঠানো যাচ্ছে না। নতুন কিনতে হয়েছে।’

বারুইপুরের রাসমণি স্কুলের ছাত্রী স্বস্তিকা ঘোষ। স্কুলের ড্রেস দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার মায়ের গলাতে ফুটে উঠল একরাশ বিরক্তি। জানালেন, ‘যখন স্কুল বন্ধ হয়েছিল মেয়ে তখন ক্লাস ফাইভে পড়ত, এখন সেভেন হয়ে গিয়েছে। লম্বা হয়ে গিয়েছে। পুরনো জামা আর গায়ে হচ্ছে না। ভেবেছিলাম এর মধ্যেই কিনে দেব। তার আগেই স্কুল ছুটি পড়ে গেল আবার। দেখি স্কুল খুললে কি হয়।’

কিন্তু এমন অনেকেই আছে যাদের পরিবারের কাছে পড়াশোনাটাই যেখানে বাহুল্য, সেখানে স্কুলের ড্রেস কিনে দেওয়া তো অলীক স্বপ্ন। অগত্যা তাই হয় বাবা মায়েরা পুরনো জামা কোনরকমে পরিয়ে স্কুলে পাঠাচ্ছেন, নয়তো বাড়ির জামা পরেই স্কুলে যাচ্ছে তাঁদের বাচ্চারা।

স্কুল খোলার পর থেকেই বারবার অভিভাবকরা ভিড় করছিলেন স্কুলের দরজার সামনে। প্রশ্ন ছিল, কবে মিলবে ড্রেস? সদুত্তর দিতে পারছিলেন না স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিক্ষিকারা। সেই সময়কার সেই ছবিই স্মরণ করে তিলজলা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকা অভিনন্দা ঘোষ দস্তিদার জানালেন, ‘স্কুল খোলার পর ড্রেস নিয়ে সত্যিই খুব অসুবিধা হয়েছে বাচ্চাদের মধ্যে। দেখতাম অনেকেরই ড্রেস ছোট হয়ে গেছে। অভিভাবকেরা বারবার স্কুলে এসে জিজ্ঞেস করতেন। যদি ড্রেস তাড়াতাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করে খুব ভাল হয়। না হলে জুনে স্কুল খুললে খুব অসুবিধা হবে।’

একই অসুবিধার কথা শোনালেন কমলা চ্যাটার্জি গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা দেবযানী দাস। বললেন, ‘অনেক বাচ্চার জামা ছোট হয়ে গেছে। এতদিন স্কুল ছুটি ছিল তাই মনে হয়নি। তবে এখন সমস্যা হচ্ছে। আশা করছি গরমের ছুটির পর স্কুল খুললে সরকারের থেকে ড্রেস পেয়ে যাবে বাচ্চারা।’ ফেব্রুয়ারিতে স্কুল খুললে এমন সমস্যা দেখার পর একটি উপায় ভেবে বার করেছিলেন দেবযানী দেবী। যেসব বাচ্চা একেবারেই নতুন জামা কিনতে পারছে না, তাদের জন্য বড় ক্লাসের বাচ্চাদের কাছে পুরনো জামা চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘যখন আমি বাচ্চাদের থেকে তাদের পুরনো জামা চেয়েছিলাম সকলেই খুব হাসি মুখে দিয়েছিল। তাতে কিছুটা সুরাহা হয়েছিল।’

কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক তথা শিক্ষা অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেড মিস্ট্রেসের রাজ্য সম্পাদক চন্দন মাইতি জানালেন, ‘বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও স্কুল ইউনিফর্ম শিক্ষা দফতর দিতে পারল না। বারে বারে মাপ নেওয়া, তথ্য প্রদান করা হলেও ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল ইউনিফর্ম পাচ্ছে না। প্রায় দু’বছর আগে পাওয়া পুরানো ইউনিফর্ম গায়ে দিয়ে আসতে পারছে না। শিক্ষা দফতরের বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত।’

বাচ্চাদের এই সমস্যার যাতে শীঘ্রই  কোনও সমাধান সূত্র বেরোয় সেইদিকে নজর দেওয়ার কথা বললেন যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক তথা শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ড: পরিমল ভট্টাচার্য। তিনি জানান, ‘স্কুল ইউনিফর্ম সত্যিই শিক্ষা ক্ষেত্রে খুব জরুরি বিষয়। যেমন শিক্ষার অধিকারের মধ্যে পরে মিড ডে মিল, তেমনই স্কুল ইউনিফর্ম দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দু’বছর আগে ছাত্র-ছাত্রীরা যে ইউনিফর্ম পেয়েছে তা ছোট হয়ে গিয়েছে। তাই যদি ইউনিফর্ম নিয়ে কোনও দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব তৈরি হয় তা অবিলম্বে নিরসন করে বাচ্চাদের ইউনিফর্ম দেওয়ার ব্যবস্থা করুক স্কুল শিক্ষা দফতর।’

এখন এটাই দেখার কবে এই সমস্যার সমাধান হয়? স্কুল খুললে আদৌ নতুন ড্রেস পরে কি দেখা যাবে পড়ুয়াদের? সময়ই তার উত্তর দেবে।

আরও পড়ুন : মমতার ছবি ফুটবলারদের ঘরে টাঙাতে বললেন মন্ত্রী অরূপ, অনুপ্রেরণা দিতে পেপ টক

You might also like