Latest News

কল্যাণময়ের সই তাঁদের সার্টিফিকেটে! ১০ বছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের আক্ষেপ ঝরে পড়ছে

প্রসূন চন্দ ও আকাশ ঘোষ

স্কুল সার্ভিস দুর্নীতি মামলার তদন্তে বৃহস্পতিবার মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করেছে সিবিআই (CBI)। শুক্রবার তাঁকে আদালতে পেশ করা হলে বিচারক ২১ সেপ্টেম্বর সিবিআই হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে কল্যাণময়ের (Kalyanmoy Ganguly) এই গ্রেফতারের ঘটনায় দৃশ্যত আন্দোলিত বাংলার শিক্ষা মহল। তা আন্দোলিত করে দিয়েছে প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রীদেরও।
২০১২ সাল থেকে টানা ১০ বছর মধ্যশিক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন কল্যাণময়। তাঁর গ্রেফতারির পর সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল নিন্দেমন্দ।

‘একজন দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের সই নাকি রাজ্যের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্টে রয়েছে! এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে’— এমন পোস্টে ছেয়ে গিয়েছে ফেসবুক। এই বিষয়ে দ্য ওয়ালের সামনে মুখ খুলেছেন খোদ পড়ুয়ারা, যাঁরা এই দশ বছরে মাধ্যমিক পাশ করেছেন। নিজেদের মতামত জানিয়েছেন স্কুল শিক্ষক থেকে অভিভাবকরাও।

তবে এখানে বলে রাখা ভাল, কল্যাণময় (Kalyanmoy Ganguly) নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে গ্রেফতার হলেও তাঁকে এখনই দোষী বলা যাবে না। বাগ কমিটির রিপোর্টে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ-ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। সিবিআই এদিন আদালতে যা বলেছে, তাও কেবলই অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে সেই সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বা আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্তও করেনি।

পার্থ-কল্যাণময়ের সিবিআই হেফাজতের নির্দেশ, চট্টোপাধ্যায়কে জেল থেকে নিয়ে যাওয়া হবে নিজামে

তবে দৃশ্যত স্পষ্ট যে, সে সবের পরোয়া কেউ করছে না। বরং তাাঁদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে সমাজমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের সামনে। হুগলির বৈদ্যবাটির বাসিন্দা সৌম্যজিৎ ঘোষ। শেওড়াফুলি সুরেন্দ্রনাথ ঘোষ বিদ্যমন্দির থেকে ২০১৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করেছেন সৌম্যজিৎ। তিনি বলেন, ‘১০ বছর ধরে যে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী বাংলায় মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের কাছে এটা লজ্জার। আমিও লজ্জিত! কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায় আপাতত জেলে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু আমাদের এই কলঙ্ক আজীবন বয়ে নিয়ে যেতে হবে”।

সৌম্যজিতের কথায়, “পরবর্তী প্রজন্মকে বলতে হবে যে, কী দুর্বিষহ সময়ে আমরা পড়াশোনা করেছি। যাঁর সই রয়েছে মাধ্যমিকের মার্কশিটে, তিনি ঘুষকাণ্ডে জেলে।’ তাঁর বাবা সঞ্জয় ঘোষ, ছোট দোকানদার। তাঁর কথায়, “বিষয়টা ছেলেমেয়ে এবং অভিভাবক- সবার কাছেই অস্বস্তিকর। এমন পরিস্থিতি না হলেই ভাল হত”।

আরও এক পড়ুয়া ইছাপুরের শ্রেয়সী বর্মন। তিনি ২০১৫ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। ইছাপুর গার্লস হাই স্কুলের পড়ুয়া ছিলেন শ্রেয়সী। তিনি বলেন, “খবর দেখে জানতে পেরেছি যে, স্কুল সার্ভিস নিয়োগ দুর্নীতিকাণ্ডে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায় (Kalyanmoy Ganguly) । আমাদের জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার রেজাল্টে তাঁর স্বাক্ষর জ্বলজ্বল করছে। যদিও তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত কিনা, তা এখনও প্রমাণসাপেক্ষ। তবে সত্যিই এটা ভেবে খারাপ লাগছে যে, মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্টে তাঁর সই রয়েছে। শুধু আমি নই, আমার মতো অগুণতি ছেলেমেয়ের রেজাল্টেই আছে। আমি ২০১৫ সালে মাধ্যমিক দিয়েছি। বেশ কিছু বছর পেরিয়েছে। তখন এত কিছু ভাবার জায়গায় ছিলাম না। তবে আজ এই খবরে সত্যিই একটু খারাপ লাগছে। আর একটু রাগ হচ্ছে বটে এই সিস্টেমের উপরে”।

সিঁথির মোড়ের বাসিন্দা বছর তেইশের তরুণী অন্তরা চন্দ ২০১৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কাল সংবাদমাধ্যমে খবরটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ওঁকে চিনতে পারি। আমাদের মাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন সকালে টিভিতে উনিই মেধাতালিকা ঘোষণা করেছিলেন। সিবিআই নাকি তাঁকেই গ্রেফতার করেছে। এবার আমাদের মাধ্যমিকের সার্টিফিকেটটার বৈধতা থাকবে তো? একটু সংশয়ে আছি।’

বরানগর নরেন্দ্রনাথ বিদ্যমন্দিরের গণিতের শিক্ষক অভিষেক সেনগুপ্ত। এই ঘটনায় প্রবল ক্ষুব্ধ তিনিও। এদিন অভিষেকবাবু বলেন, ‘অঙ্ক শেখানোর পাশাপাশি বাচ্চাগুলোকে এতদিন ধরে শিখিয়েছি, চুরি করা কত বড় অন্যায়। এদিকে তাদের মাধ্যমিকের রেজাল্ট আর সার্টিফিকেটেই কিনা একজন চোরের সই! বিষয়টি যদিও বা বিচারাধীন, তবে এমন ঘটনা তো আগে কোনওদিন এই রাজ্যে দেখিনি। লজ্জা লজ্জা!’

এই বিষয়ে পড়ুয়াদের আশ্বস্ত করেছেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার। অনেকেই যেহেতু তাঁদের মাধ্যমিকের রেজাল্টের বৈধতা নিয়ে চিন্তিত, তাই পবিত্রবাবুর এই বিষয়ে মতামত জানতে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্যে রয়েছেন। তবে যাঁরা তাদের এই অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছেন দায় তাঁদের। এই জন্য পড়ুয়াদের কোনও দায় নেই। এই সই কোনও ব্যক্তি বিশেষের নয়, এটা একটা পদের। যে এই পদে যখন থাকেন তিনিই সই করেন। তবে সেই সইয়ের জন্য পরে কোনও পড়ুয়াকে বিপদে পড়তে হবে না। তাঁরা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। আমি বলব, এইসব চিন্তা না করে তাঁদের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’

You might also like