Latest News

পুনীত একা নন, কম বয়সে, ফিট শরীরে বাড়ছে হার্ট অ্যাটাক! কী বলছেন ডাক্তারবাবুরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র ৪৬ বছর বয়সেই হৃদরোগে প্রয়াত হয়েছেন জনপ্রিয় কন্নড় অভিনেতা পুনীত রাজকুমার (puneeth rajkumar)। শুক্রবার সকালে জিম করতে করতেই আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয় তাঁর। পড়ে যান হঠাৎ। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, আইসিইউতেও ভর্তি করা হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

পুনীতের এই অকালমৃত্যু সারা দেশের অনুরাগীদের মনে করিয়ে দিয়েছে আরও একটা নাম। সিদ্ধার্থ শুক্ল। এই বলিউড অভিনেতাও গত মাসেই আচমকা হৃদরোগের শিকার হয়ে মারা গিয়েছেন। তাঁর বেলাতেও পুনীতের মতোই শোকে বিহ্বল হয়েছিল সারা দেশ। প্রশ্ন উঠেছিল, এত ফিট একজন অভিনেতা, স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইলে থাকার পরেও এভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারেন!

ফিটনেসের সঙ্গে হার্টের শত্রুতা!

একই প্রশ্ন নাড়া দিয়ে যাচ্ছে পুনীতের মৃত্যুর পরেও। পুনীতকে ফিটনেস-ফ্রিক বলেই চেনেন সকলে। চেনেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলে, সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা মেনে চলার জন্য। তার পরেও কেন এমন অকালে মারণ অসুখ হার্টের! একই ঘটনা ঘটল জুন মাসেও। বলিউডের পরিচালক-প্রযোজক ও মন্দিরা বেদির স্বামী রাজ কৌশল মারা গেলেন মাত্র ৫০ বছর বয়সে, হৃদরোগে।

সিঁড়ি ভাঙলে হাঁফ ধরছে, খেলার মাঠে অজ্ঞান! হৃদরোগের উপসর্গগুলি চিনুন

শুধু পুনীত, সিদ্ধার্থ, রাজই বা কেন। কয়েক মাস আগে বলিউডের নৃত্যশিল্পী রেমো ডিসুজার হার্ট অ্যাটাকের খবরেও একই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল জনমানসে। আর তার আগে বাংলার ঘরের ছেলে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের হার্টে আচমকা ব্লকেজ ধরা পড়ার খবরও এখনও টাটকা সকলের মনে। এই দু’ক্ষেত্রেই অবশ্য সময় ও সুযোগ পাওয়া গেছিল চিকিৎসার, সুস্থও হয়ে উঠেছেন তাঁরা। সেই সৌভাগ্য হয়নি সিদ্ধার্থ ও পুনীতের।

কোথায় দাঁড়িয়ে ভারতের হৃদরোগের গ্রাফ!

আগে মনে করা হত, বয়স্করাই বুঝি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিটা অন্য। হার্টের যে কোনও অসুখ হানা দিতে পারে যে কোনও বয়সে। মোদ্দা কথা, হৃদরোগ বয়স বাছবিছার করে আসে না। কোনও মানুষ যখন জন্মায়, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে তার হার্ট কাজ করতে শুরু করে। বলা ভাল, তারও আগে থেকে কাজ করতে শুরু করে। সেই যে শুরু, শরীরের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই অঙ্গের বিশ্রাম নেই। শরীরের অন্য সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই কোনও না কোনও সময় থামে, রেস্ট পায়, সে ঘুমের সময় হোক বা বিশ্রামের সময়। কিন্তু হার্টের ছুটি নেই। তাই এই নিরন্তর ছুটে চলা অঙ্গটিও ততটাই গুরুত্ব দাবি করে।

পরিসংখ্যান বলছে, ভারতবর্ষে হৃদরোগের সংখ্যা যত বাড়ছে, তেমনি তার বয়সও কমছে। চল্লিশের আগে, এমনকি ৩০ বছর বয়সেও কোনও রোগ-অসুখ ছাড়া হার্ট অ্যাটাক এখন আর মোটেও বিরল নয়। শুধু তাই নয়, এই বিপদটা ক্রমবর্ধমান। আজকের ছোটরা আগামী প্রজন্মে পৌঁছে অনেক বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত হতে পারে হৃদরোগে। সারা বিশ্বে যেখানে হৃদরোগ শুরু হওয়ার গড় বয়স ৬৫, আমাদের দেশে অর্থাৎ ভারতে এই বয়সটা নেমে এসেছে চল্লিশে।

কেন এমনটা হচ্ছে? কী বলছেন ডাক্তারবাবুরা?

মানুষের শরীরের হার্ট একটা যন্ত্র বই কিছু নয়। কিন্তু সে যন্ত্রের মেকানিজম জানলে অবাক হতে হয়। যেন মনে হয়, সারাজীবন কোনও ভুল না করে নিয়ম মেনে হার্টের চলনটাই একটা আশ্চর্য ব্যাপার! অ্যাপোলো গ্লেনেগলস হাসপাতালের ডাক্তার ও অধ্যাপক শঙ্খ শুভ্র দাস বুঝিয়ে দিলেন হার্টের এই যান্ত্রিক গতি।

সুস্থ মানুষের হৃদযন্ত্র এক মিনিটে ৬০-৮০ বার পাম্প করে অক্সিজেনযুক্ত বিশুদ্ধ রক্ত শরীরের কোষে কোষে পৌঁছে দেয়। এই পাম্প করার ক্ষমতাকে চালনা করার জন্য হার্টের নিজস্ব পেসমেকার থাকে যাকে বলে সাইনাস নোড (এসএ নোড)। এই সাইনাস নোডের কাজ হল হার্টবিট তৈরি করা। ২৪ ঘণ্টাই কাজ করছে হার্টের এই নিজস্ব পেসমেকার। ইলেকট্রিক্যাল স্পন্দন তৈরি করছে, যে কারণে হৃদস্পন্দন তৈরি হচ্ছে এবং হার্ট পাম্প করে বিশুদ্ধ রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কোনও ভাবে যদি এই সাইনাস নোড ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে হৃদস্পন্দন তার স্বাভাবিক ছন্দ হারায়, কখনও বেড়ে যায় আবার কখনও কমে যায়। ডাক্তারি ভাষায় আমরা একে বলি অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন। অনেক সময়েই এই অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন বুঝতে পারি না আমরা, তবে কিছু আগাম ইঙ্গিত দেয় হার্ট। যেমন বুক ধড়ফড় করতে পারে, মাথা ঘোরা বা ব্ল্যাক আউট হতে পারে রোগীর, ঘনঘন সোডিয়াম-পটাশিয়াম লেভেলে বদল হতে পারে। পরীক্ষা করালে দেখা যাবে হার্টবিট হয়তো প্রতি মিনিটে বেড়ে ১৫০ থেকে ২০০-তে পৌঁছে গেছে। তখন সতর্ক হতে হবে।

সাডেন কার্ডিয়াক ডেথের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর ভিটি 

আরও একটা অসুখ হয়, যা বর্তমান সময় চিন্তার কারণ। তা হল ভিটি (ভেন্ট্রিকুলার ট্যাকিকার্ডিয়া)। সহজ করে বললে, ধরা যাক মানুষের হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা ৬০%, যদি তা কমে ৩০% এ নেমে যায় তাহলে আচমকা হার্টরেট অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। থেমে যেতে পারে স্পন্দন।

অনেক সময় রাস্তাঘাটে, খেলার মাঠে দেখা যায় রোগীর আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, সময়ও পাওয়া যায়নি চিকিৎসার, রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই ভিটি হল সাডেন কার্ডিয়াক ডেথের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর।

হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি নয় তো! পরীক্ষা জরুরি

অ্যাপোলো হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর অরিত্র কোনার জানালেন, আর এক ধরনের কার্ডিওমায়োপ্যাথির নাম হাইপারট্রফি। অনেক সময়ে শোনা যায়, কমবয়সি মানুষ বা কোনও খেলোয়াড়, খেলতে গিয়ে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছেন। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে, হয়তো মারাও গেছেন। এটার প্রধান কারণই হল হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি। এর একটা অন্যতম কারণ হল, হার্টের দুই নিলয়ের মধ্যে যে পর্দা থাকে, সেটা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পুরু থাকা। এটা জন্মগত ভাবে থাকে, একই পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের থাকতে পারে, বংশ পরম্পরায় পরিবাহিত হতে পারে।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে কোনও উপসর্গ না থাকলে হার্টের পরীক্ষানিরীক্ষা করানো হয় না চট করে। সেক্ষেত্রে, এই হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি আছে কিনা, বোঝা যাবে কীভাবে? পরিবারের কারও এমন আচমকা হৃদরোগের ইতিহাস আছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। থাকলে তাঁর ভাই, বোন, ছেলে, মেয়েদের স্ক্রিনিং ইকোকার্ডিওগ্রাফি করে দেখতে হবে। সেটা কম বয়স থেকেই করতে হবে, তাহলেই এড়ানো যাবে বড় অসুখ। ওষুধ বা অস্ত্রোপচার—দুরকমের চিকিৎসাই করা যায় ধরা পড়লে, যাতে হঠাৎ বড় বিপদের মুখে পড়তে না হয়।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like