Latest News

চা ওয়ালা প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছলেন সাঁওতাল রমণীকে, বিজেপি ও সঙ্ঘের অঙ্কটা কী

অমল সরকার

গত ৯ জুন নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের (Presidential Election) নির্ঘণ্ট ঘোষণার দিনে দ্য ওয়ালে লেখা হয়েছিল, বিজেপি তথা এনডিএ-র প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ওড়িশার বিজেপি নেত্রী দ্রৌপদী মুর্মু (Draupadi Murmu)। আজ রাত সাড়ে ৯টায় বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা দ্রৌপদীর নাম রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

কে এই দ্রৌপদী মুর্মু? কেন বিজেপি তাঁকে বেছে নিল রাষ্ট্রপতির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য?

কোনও সন্দেহ নেই, দ্রৌপদী আদতে আরএসএসের পছন্দের প্রার্থী যাঁকে ঘিরে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi), অমিত শাহদের সঙ্গে সঙ্ঘের সংঘাত হওয়া দূরে থাক বরং অঙ্ক মিলে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: এনডিএ শিবিরের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী দ্রৌপদী মুর্মু! ঘোষণা নাড্ডার

আদিবাসীদের মধ্যে আরএসএসের সংগঠন একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই প্রভাবের জোরেই গত শতকের আটের দশকের শেষ লগ্নে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাতে ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল বিজেপি। যতদিন গিয়েছে, আদিবাসী সমাজে সঙ্ঘের প্রভাব বেড়েছে। পিছু হটেছে খ্রিস্টান মিশনারিরা। স্বভাবতই সেই প্রভাবকে আরও জোরদার করতেই সাঁওতাল সমাজের নারী দ্রৌপদীকে রাষ্ট্রপতি ভবনে পাঠাতে চাইছে আরএসএস।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহরাও কেন দ্রৌপদীর ব্যাপারে আগ্রহী হলেন? বেঙ্কাইয়া নাইডুর মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ওজনদার উচ্চ শিক্ষিত মানুষকে উপরাষ্ট্রপতি থেকে রাষ্ট্রপতি পদে কেন প্রমোশন দিল না আরএসএস ও বিজেপি?

আরও পড়ুন: মঙ্গলবার সাড়ে ন’ঘণ্টা জেরা রাহুলকে, রাতে ফের তলব করল ইডি

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী বা এযাবৎ যারা সাংবিধানিক প্রধান হয়েছেন তাঁদের মধ্যে বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এবং ইউপিএ জমানার প্রতিভা সিং পাতিল বাদে বাকিদের তুলনায় বিজেপির এই মহিলা নেত্রীর রাজনৈতিক উচ্চতা বেশ কম। তিনি একটা সময় ওড়িশায় বিজেপি-বিজেডি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। আর পাঁচ বছর ছিলেন ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল।

সেই দ্রৌপদীকে বিজেপি রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করতে পারে এমন সম্ভাবনা বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় ছিল। বস্তুত ২০১৭ সালে দ্রৌপদী যখন ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল তখনও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম দলের বিবেচনায় ছিল। শেষ মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহরা বেছে নেন বিহারের তৎকালীন রাজ্যপাল তথা উত্তরপ্রদেশের কানপুরের বাসিন্দা রামনাথ কোবিন্দকে।

পাঁচ বছর পর সেই দ্রৌপদী মুর্মুকেই মোদী-শাহরা দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের জন্য বেছে নিয়ে এক ঢিলে অনেক লক্ষ্যপূরণের আয়োজন করলেন।

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের বাসিন্দা দ্রৌপদী আদিবাসী সমাজের মানুষ। জাতিতে তিনি সাঁওতাল। অর্থাৎ সমাজের প্রান্তিক অংশের একজনকে বেছে নেওয়া হল রাষ্ট্রপতি ভবনের আগামী পাঁচ বছরের বাসিন্দা করার জন্য। ওড়িশার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে নির্বাচনে বিজেডির সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হল।

রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের প্রধান অঙ্কটি কোবিন্দ আর দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে অভিন্ন। তা হল এমন একজনকে বেছে নেওয়া, যিনি সঙ্ঘ ও বিজেপির ঘরের লোক, দল অন্তপ্রাণ কিন্তু রাজনীতিতে ওজনদার নন।

মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন ইউপিএ নির্বাচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায়। ফলে প্রথম দফার প্রথম তিন বছর প্রণববাবুর মতো ওজনদার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু নিজে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ের সময় তাঁকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিংহের কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে, যিনি ইন্দিরা গান্ধীর মতো প্রভূত ক্ষমতাশালী প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন।

আবার রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ের সঙ্গেই দল ও সরকারের বর্তমান রাজনৈতিক স্বার্থকে জড়িয়ে নিয়েছেন মোদী। কারণ, বিজেপি তাদের রাজনীতির একটা বড় সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছে যখন শুধু হিন্দুত্ব বা বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে আর নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করা সহজ নয়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যার বিতর্কিত জমি রাম মন্দিরের জন্য বরাদ্দ হয়েছে। সেখানে মন্দির নির্মাণের কাজ পুরোদমে চলছে। মন্দিরে ভক্তদের প্রবেশাধিকার শুরুর পর থেকে রাম মন্দির ইস্যুর সমাপ্তি ঘটবে, তা বিলক্ষণ জানে বিজেপি ও সঙ্ঘ।

অন্যদিকে কাশ্মীর থেকে সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং তিন তালাক বিরোধী আইন চালু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিও আংশিক চালু করে দিতে পেরেছে তারা। অর্থাৎ বিজেপির বিশ্বের বৃহত্তম দল হয়ে ওঠার পিছনে যে ইস্যু ও আন্দোলনগুলি মহৌষধ হিসাবে কাজ করেছিল সেগুলির ব্যবহারিক প্রয়োজন অনেকটাই ফুরিয়েছে। ধারও কমেছে চেনা সেই অস্ত্রগুলির।

বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারকে তাই নতুন ইস্যু হাতড়াতে হচ্ছে। উগ্র হিন্দুত্বের পথে আস্থা রেখেই তারা পরিচয় স্বত্তার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। ক্ষমতা দখল এবং টিকে থাকার লক্ষ্যে দলিত, ওবিসি এবং আদিবাসীদের মধ্যে প্রভাব আরও বাড়াতে বিজেপি গা থেকে উচ্চবর্ণের পার্টি তকমা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে দ্রুত। তাই মোদীর মন্ত্রিসভায় দলিত, আদিবাসী এবং ওবিসি প্রতিনিধিত্ব অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে। মন্ত্রীদের মধ্যে জেলে, মুচি, মেথর-সহ সমাজের প্রান্তিক বহু সম্প্রদায়ের মানুষ আছেন।

মোদীর আরও এক লক্ষ্য হল, মহিলা ভোট ব্যাঙ্ক মজবুত করা। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় নাম তোলার পথ সহজ করে দেওয়ায় মহিলা ও কম বয়সী ভোটার বাড়ছে দ্রুত গতিতে। প্রধানমন্ত্রী দু’দিন আগে ছিলেন নিজের রাজ্য গুজরাতে। সেখানে তিনি মহিলাদের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে ভোটার তালিকায় নারী ভোটার বৃদ্ধির বিষয়টিও উল্লেখ করেন। দ্রৌপদীকে প্রার্থী করে মহিলাদেরও বার্তা দেওয়া গেল। মোদী নিজে ওবিসি এবং চা বিক্রেতা ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে বেছে নিলেন একজন সাঁওতাল মহিলাকে। ফলে এই বার্তাও দেওয়া গেল, শীর্ষ পদের জন্য বিজেপি পারিবারিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেয় না। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও বিজেপি দেখালো, কংগ্রেসের মতো কোনও গান্ধী পরিবারের নির্ভরতা থেকে তারা মুক্ত।

আরএসএসের চাপ বা সুপারিশ হলেও মোদী নিজের এবং দলের অনেকগুলি অঙ্কপূরণের উদ্দেশ্যেই বেছে নিয়েছেন দ্রৌপদীকে।

You might also like