Latest News

আমার ভাই, আমাদের পুকি! ও সেরে উঠবে তো? ওকে যে বড় ডাক্তার হতেই হবে!

সঞ্জিত চট্টোপাধ্যায়
(পরিবহর দাদা, ডোমজুড়ের বাসিন্দা, পেশায় চিকিৎসক)

পরিবহকে একেবারে শিশু অবস্থা থেকেই জানি। ছোটখাটো সমস্যায় ওর মা-ই তো ওকে নিয়ে ছুটে আসতেন আমার চেম্বারে। আসলে ডোমজুড়ের ফোকর দোকান পেরিয়ে, ষষ্ঠীতলায় ওদের যেখানে বাড়ি, সে পাড়াতেই আমারও বেড়ে ওঠা। আর পরিবহর বাড়ির বাবা-কাকাদের অভিভাবকত্বেই আমাদের বেড়ে ওঠা বলা যায়। শুধু তা-ই নয়, লতায়-পাতায় আত্মীয়তাও রয়েছে। যার দরুণ পরিবহ আমার দূর-সম্পর্কের ভাইও বটে।

আসলে, ওদের বাড়িটা যেন পাড়ার সকলের সঙ্গেই একটা একান্নবর্তী পরিবারের মতো রয়েছে। এবং সেই পরিবারে, পরিবহর বাবা, অর্থাৎ আমাদের খোকন কাকাই সম্ভবত অর্থনৈতিক ভাবে সব চেয়ে দুর্বল। কিন্তু উনি ওঁর ছেলে-মেয়েকে অর্থাৎ পরিবহ এবং পরিবহের দিদিকে সাধ্যের বাইরে গিয়েও মানুষ করে তুলতে চেষ্টা করেছেন। এই চেষ্টার সাক্ষী আমাদের এলাকার সকলেই। মফস্বলে তো এখনও অতটা বিচ্ছিন্ন হয়নি মানুষ, তাই পরস্পরের সুখ-দুঃখের খবর রাখি আমরা।

নিত্য দিনের অভাবের মধ্যেই ছেলে মেয়েকে এই অঞ্চলের সব চেয়ে ভাল প্রাইভেট টিউটর রেখে পড়িয়েছেন খোকন কাকা। দু’জনের মধ্যে ছেলেটাকে আবার একটু বেশিই প্রাধান্য দিয়েছিলেন কাকা। কারণ ছোটবেলা থেকেই পরিবহ, মানে সকলের আদরের পুকি, আর পাঁচ জন ছেলেমেয়ের থেকে একটু বেশিই এগিয়ে ছিল। সকলেই ওর মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন। খোকন কাকা আর কাকিমা তো নিশ্চয় দেখেছিলেন। তাই কোনও খামতি রাখেননি ওর লেখাপড়ায়।

ছেলেটা যখন একটু বড় হল, ক্লাস নাইন-টেনে পড়ে, তখন থেকেই কেমন যেন একটু আনমনা, একটু চিন্তাশীল, একটু আত্মস্থ প্রকৃতির হয়ে উঠল। পাড়ার আর পাঁচটা বাচ্চার সঙ্গে খেলতে খেলতে মাঝে মাঝেই কেমন যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলত। বড্ড মায়া ছিল ওর, সকলের জন্য। প্রকৃতির জন্যও। এমনকী, পশুপাখিদের জন্যও।

আর এমনি করেই ধীরে ধীরে পুকি আরও বড় হয়ে উঠল। এখানে, এই গ্রামে থেকেই।

ওর বাড়ির সামনেই একটা কালী মন্দির আছে। আর তার একটু পাশেই পাড়ার ক্লাব। এখানে আমাদের সকাল হয়, পাশের গ্রাম থেকে আজানের আওয়াজ শুনে। কখনও বেশ সুরেলা, আবার কখনও যে তা সাতসকালে বিরক্তিকর নয়, তা বলব না। যেমন আমাদের গ্রামের অষ্টম প্রহর হরিনামেও মাঝেমাঝেই, বিশেষ করে পরীক্ষার সময়গুলোয় কম বিরক্তির উদ্রেক ঘটত না।

আমাদের এলাকার স্কুলেও সব ধরনের ছেলেমেয়ে একসঙ্গেই বড় হয়েছি। জাত-পাত, গরিব-বড়লোক, সাদা-কালোর ভেদ ছিল বলে মনে পড়ে না। এ ভাবেই, আমাদের মতোই, পরিবহও বড় হয়ে উঠেছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে। তাই, আমরা যারা পরিবহর এত কাছের লোক, তারা এই এনআরএস-এর ঘটনায় যে সব কথা নিজেরা ভাবিওনি, বাইরের লোকেরা তাতেই বিষ ঢেলেছে। সে বিষ তো আমাদের কেউ কেউ খেয়েও ফেলল! ভাবলেই কষ্ট হয়। এমনটা কাঙ্ক্ষিত ছিল না মোটেই!

পরিবহকে আকাশে কোচিং নিতে সাহায্য করেছে ওর দিদি-জামাইবাবু। নিজের বিবাহিত জীবনে নানা টালমাটালের মধ্যেও দিদি জামাইবাবু সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছে, ভাইকে সাপোর্ট জোগানোর। কখনও অন্য কারও দাক্ষিণ্য চায়নি ওরা। নিজেরাই অনেক স্বপ্নে তাদের আদরের ছোট ভাইকে বড় করে তুলতে চেয়েছে। আজ সেই বাবা, মা, দিদি, জামাইবাবু, এমনকী আমরাও– সবাই যেন কোনও এক অভাবনীয় আঘাতে স্বপ্ন ভঙ্গের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছি।

ওর চিকিৎসকেরা বলেছেন, এখন ওকে বেশ কিছু দিন, হয়তো বা সারা জীবন কিছু অ্যান্টি-এপিলেপ্টিক ড্রাগ খেতে হতে পারে। তা হলেই ওর খিঁচুনি বা মৃগীর সম্ভাবনা কম থাকবে। কিন্তু আমরা ভাবছি, সে ক্ষেত্রে ওর স্মৃতিশক্তি আগের মতো থাকবে তো! আর শরীরের কথা ছেড়ে দিলাম, এই মানসিক ধাক্কা ও কী করে, কতটা সামলে উঠতে পারবে, জানি না!

আমরা সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি, খবরের কাগজ– এসবের ধারেকাছে ঘেঁষতে দিচ্ছি না এখন পরিবহকে। যে ক’জন খুব কাছের মানুষ দেখা করছি, তারাও খুব সাবধানে থাকছি, কথা বলছি। ও ওর আঘাতটুকু জানে। ওই দিনের ঘটনা জানে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ জানে না। এখন জানানো ঠিকও নয়। ওর যন্ত্রণা সওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, এটা আমাদেরও একটা লড়াই।

কার অভিশাপে, কোন অদৃষ্টের জোরে আমাদের পরিবহকে এই যন্ত্রণা পেতে হলো, জানি না। জানি না আমাদেরই বা কেন এত কষ্ট পেতে হল ছেলেটার জন্য। ও তো কারও ক্ষতি করেনি! ওর মাথায় যে আঘাতটা এসে পড়েছিল, সেটা তো রাম বা রহিম যে কোনও মানুষেরই হতে পারত। হতে পারত কোনও রোগীর বা অন্য কোনও ডাক্তারের। সে যন্ত্রণাও তখন অন্য কোনও বাবা-মা-পরিবারকে এ ভাবেই অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ছুঁড়ে দিত হয়তো।

ঘটনার পরেই ওর দিদির বলা কথাগুলো আমায় বড় হন্ট করছিল প্রতি মুহূর্তে। গভীর দুঃশ্চিন্তা থেকে ও বলছিল, “দাদা, অনেক কষ্টে, অনেক লড়াই করে অসুস্থ বাবা-মাকে নিয়ে পুকির বড় হওয়ার স্বপ্নে প্রতিটা দিন গুনছিলাম আমরা। স্বপ্ন পূরণ হয়েই এসেছিল। ডাক্তার তো হয়েই গেছিল প্রায় আমার ভাইটা। মাঝখানে কোথা থেকে কী যে ঘটে গেল! আমায় আবার নতুন করে লড়াই শুরু করতে হলো। দাদা, আমার ভাইটা, আমার পুকি, ও আবার আগের মতোই স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে তো? ওকে ছাড়া আমাদের, আমার বাবা-মা, আমার সন্তান, স্বামীর জীবনে যে অন্ধকার নেমে আসবে! তা তো আমি সইতে পারব না!” কান্নায় ভেঙে পড়েছিল ওর দিদি।

বারবার বলছিল, যে করেই হোক ভাইকে বড় ডাক্তার হতেই হবে। ভাই বেঁচে উঠে প্রমাণ করবে, চিকিৎসকেরা সত্যিই ভগবান। আর ভগবানের পায়ে পৃথিবীর সব মানুষ সমান, সব মায়ের বুকের প্রতিটা রক্তবিন্দু জুড়ে থাকে তাঁর সন্তান। তাই ওর দিদির কথা ধার করেই বলি, “ভগবান ও ডাক্তারের কাছে সব মানুষের অধিকারই সমান। সকলের জন্য আনন্দ ও নীরোগ জীবন ছাড়া আর কী-ইবা চাওয়ার আছে ওঁদের কাছে!”

You might also like