Latest News

উদীয়মান শিল্পীর ছবির মতোই অন্তঃসার শূন্য শহরের নান্দনিকবোধ

পি সি সরকার জুনিয়র

অনেককালে আগে আমি একটু আধটু কবিতা টবিতা লিখতাম। কয়েকটা লাইন মনে আছে—’ইচ্ছে করে কলকাতাকে কলতলাতে টেনে এনে স্নান করাই, ধুলো বালি কেলেঙ্কারি… গামছা দিয়ে চুল শুকিয়ে ওকে নজর টিপ পরাই…ইচ্ছে করে কলকাতাকে কলতলাতে টেনে এনে স্নান করাই।’ বিভিন্ন সময়ে প্রায় ১১৭টা দেশে গিয়েছি। বিদেশ থেকে ফিরে একটা একটা লাইন লিখে ফেলতাম।

যদি আমাকে প্রশ্ন করা হয়, এই ১১৭টি দেশের মধ্যে কোন দেশকে বেশি ভাল লেগেছে? উত্তরে বলব, সব দেশই এক-একটি দিক থেকে ভাল লেগেছে। কোনও দেশই সামগ্রিকভাবে ভাল লাগা সম্ভব নয়। আমি যদি ডিসিপ্লিন শিখতে চাই, জার্মানি যাব, যদি রাজনীতি পছন্দ করি, ইংল্যান্ডে যাব। যদি ফ্যাশন পছন্দ করি, পোল্যান্ডে যাব। যদি হুজ্জুতি পছন্দ করি, আমেরিকায় যাব। যদি দেশাত্মবোধ পছন্দ করি, তবে জাপানে যাব। যদি মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করতে চাই তাহলে অবশ্যই রাশিয়াতে যাব। তবে আমি যদি প্রাণে বাঁচতে চাই তাহলে অবশ্যই ভারতে থাকব। এখানেই বাঁচার ঠিকানা। পরিবারের সকলের জন্য যে একাত্মতা আছে তা পৃথিবীর কোথাও নেই।

কিন্তু কলকাতা এক অদ্ভুত জায়গা। এখানে শেষ কথা হল রাজনীতি। ভোট পেলে দোষ নেই, ভোট দিলে দোষ। আমি যেকোনও দলকে ভোট দিতে পারি। কিন্তু আমি যদি কোনও দলকে সমর্থন করি তাহলেই আমার দোষ। চিহ্নিত হয়ে যাব সমাজ বিরোধী বলে। এখানে রাজনীতি এমনই যে আজ আমি যার পতাকার তলায় আছি, দেখব কদিন পর তিনিই অন্য পতাকার তলায়। এমন অবস্থা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। পৃথিবীর সব শহরে রাজনীতির কালচার আছে। কিন্তু কলকাতার মতো তা একপেশে নয়। এখানে রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা নেই। যুক্তি নেই।

উন্নয়নের কথায় আসি। বিগত কয়েক বছরে কলকাতাকে শুধু আলো দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। ত্রিফলা আলো। এখন সেগুলি সব ভেঙে পড়েছে। কিন্তু সামান্য কাজ করলেই এখানে বিজ্ঞাপন করা হয়। আর বিজ্ঞাপন সব আলোয় মোড়া। এই পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে পুজো এবং নির্বাচনের সময়। শহরের স্থাপত্য, ভাস্কর্য ফ্লেক্সে, হোর্ডিংয়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

অন্য কোনও দেশে বিজ্ঞাপনের এত বাড়াবাড়ি নেই। পৃথিবীর অনেক জায়গা আছে যা আলোর জন্যই বিখ্যাত। কিন্তু কলকাতার মতো এমন বাড়বাড়ন্ত দেখা নেই। যদি বলি আলোকসজ্জা, তার মানে তাতে সৌন্দর্য থাকতে হবে। এই শহরে আলোর বন্যা আছে, সৌন্দর্য নেই। কলকাতায় উন্নয়ন আছে দেখনদারিতে। অনেকটা সেন্ট্রাল এভিনিউর উপর রবীন্দ্র ভারতীর গেটটির মতো। সেটা যতটা সুন্দর কলকাতা এখন ততটাই সুন্দর। অমন কুৎসিত শিল্পকলা কোথাও দেখিনি। শুনতে পাই কোটি কোটি টাকা দিয়ে কারও আঁকা ছবি বিক্রি হচ্ছে। সেটাকে যদি কলকাতার শিল্পকলা বলে বেড়াই, তাহলে অন্তত আমি লুকিয়ে পড়ব। কিন্তু ওই ছবির মতোই নিম্নমানে গিয়ে ঠেকেছে এই শহরের নান্দনিকতাবোধ।

আর একটা বিষয়, কলকাতার বৃত্তটা এত ক্ষুদ্র হয়ে গেছে যে আমরা হাত ছেড়ে গাড়ি চালাতে পারি না। যেমন ধরা যাক এখানকার পাতালরেলের স্টেশনগুলো রাস্তার ওপর তৈরি হয়েছে। ফুটপাতের ওপর বানানো হয়েছে। কিন্তু কারও বুকের পাটা হল না যে রাস্তা থেকে একটু ভিতরে একটা-দুটো বাড়ি অধিগ্রহণ করে সেগুলি ভেঙে দিয়ে সে জায়গায় বানানোর।

আমার মনে হয়, শহরের বেশিরভাগ রাস্তাই ওয়ান ওয়ে করে দেওয়া উচিৎ। সেটা প্রগতি, উন্নতির লক্ষণ। হকারদের বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা দরকার। আমরা দেব রোড ট্যাক্স আর রাস্তার দখল নেবে অন্য কেউ, তা তো হয় না। তাহলে তা সরকারের ব্যর্থতা। শহরে ভাবনার জগতে এক দৈন্য দশা।

(মতামত ব্যক্তিগত)

You might also like