Latest News

একটা কাজ হবে গো! হুগলি শিল্পাঞ্চলে হত্যে দিয়ে ঘুরছেন শয়ে শয়ে শ্রমিক

শোভন চক্রবর্তী 

একটা কাজ হবে? যা হোক একটা কাজ! ১৮০, ২০০, ২২০…. যে টাকা রোজই হোক, একটা কাজ হবে?

জুটমিল থেকে প্লাইউড কারখানা, বেকারি থেকে সিমেন্টের গোডাউন– হুগলি শিল্পাঞ্চলে হত্যে দিয়ে ঘুরছেন শয়ে শয়ে শ্রমিক। দিল্লি রোডের ধারের ডানকুনি থেকে গঙ্গাপাড়ের অ্যাঙ্গাস, চাঁপদানি— সর্বত্রই ছবিটা এক।

দিল্লি রোডের ধারে বেশ কিছু কারখানায় কাজ শুরু হয়েছে হুগলিতে। সেখানেই কাজ পেতে ছুটে আসছেন বহু মানুষ। দূরদূরান্ত থেকে। কারখানার বাইরে রাস্তার ধারের বহু দোকান এখনও বন্ধ। পারডানকুনির কাছে সেরকমই একটি দোকানের ছাউনির নীচে অপেক্ষা করছিলেন নির্মল পান। রবিবার তখন ঘড়িতে সকাল আটটা কুড়ি। পোলবা থেকে সাত সকালে সাইকেল চালিয়ে চলে এসেছেন। একটা কাজ যদি পাওয়া যায়!

নির্মলবাবু জানালেন, তিনি কলকাতার একটি কুরিয়ার সার্ভিস এজেন্সিতে চাকরি করতেন। ট্রেন বন্ধ। তাই কাজটা আর নেই। আরএন মুখার্জি রোডে অফিস ছিল তাঁর। কিন্তু খেয়ে-পরে তো বাঁচতে হবে। বাড়িতে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী আর ক্লাস থ্রিয়ে পড়া মেয়ে রয়েছে।

এই কারখানাগুলির অধিকাংশেই ঠিকাদারের অধীনে শ্রমিকরা কাজ করেন। সামাজিক দূরত্বের বিধি মেনে এখন প্রায় সব কারখানাতেই তিরিশ বা চল্লিশ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে উৎপাদন শুরু হয়েছে। কাজ কি মিলল? বছর ৪৫-এর নির্মলবাবু জানালেন, সকালে যখন তিনি এসে কারখানার গেটে এসে পৌঁছন তখন মর্নিং শিফট শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই কাজ মেলেনি। কিন্তু ম্যানেজার বলেছেন, দুটো-দশটা শিফটে আজ লোক কম আছে। তাই তিনি বন্ধ দোকানের ছাউনির নীচে বসে অপেক্ষা করছেন। সাইকেলে বাঁধা পোটলায় মুড়ি আর ছোলা সেদ্ধ। কিন্তু এই কাজ ক’দিনের? ২৬ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আসা কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ খোয়ানো নির্মল পান হেসে বললেন, “শুধু আজকের!”

রাত দশটায় কাজ শেষ হবে নির্মলবাবুর। পকেটে ২৩০ টাকা নিয়ে দিল্লি রোডের অন্ধকার চিরে বাড়ির উদ্দেশে সাইকেল চালাবেন ২৬ কিলোমিটার। তবে হতাশ নন তিনি। বললেন, “এরা ফোন নম্বর রেখে দেয়। লোক কম পড়লেই আবার ডাকবে!” এরকম শয়ে শয়ে নির্মল ঘুরেবেড়াচ্ছেন হুগলি শিল্পাঞ্চলে। তাঁদের কারও একদিনের কাজ মিলছে। আবার অনেকেই নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন বাড়ি। তাঁদের কারও বাড়ি হাওড়ার বলুহাটি কিংবা বালির নিশ্চিন্দা!

জুটমিলের বাইরেও একই অবস্থা। চটকলগুলির বাড়তি সুবিধা, বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অ্যাঙ্গাস জুটমিলের এক আধিকারিকের কথায়, শুধু এফসিআইয়ের যা অর্ডার রয়েছে, তাই দিয়েই কুলিয়ে উঠতে পারবে না রাজ্যের চটকলগুলি। বহু চটকল উৎপাদন বাড়াতে ঠিকাদার নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে ফেলেছে। মিলের ভিতর নতুন পরিকাঠামোও গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ফলে চটকলে নতুন কাজের সম্ভাবনা কিছু তৈরি হয়েছে। কিন্তু সবটাই ঠিকাদারের অধীনে।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েই চটকল শুরুর ব্যাপারে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রক চিঠি লিখেছিল নবান্নকে। তারপর নবান্নও চা-বাগানের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষে চটকল খোলার অনুমতি দেয়। শুধু এফসিআই নয়, কর্ণাটক, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু-সহ একাধিক রাজ্যও পাটের বস্তা চেয়েছে।

লকডাউনের ফলে চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েছে অর্থনীতি। দিন কয়েক আগে অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুও একটি ওয়েবমিনারে আশঙ্কাপ্রকাশ করে বলেছেন, ভারতে কয়েক কোটি মানুষ কাজ হারাবেন। হুগলি শিল্পাঞ্চলের ছবিটা দেখলেই ঠাওর করা যাচ্ছে, হাহাকার ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে! কাজ হারানো মানুষ বিকল্পের সন্ধানে ছুটছেন মাইলের পর মাইল।

You might also like