Latest News

করোনার বাড়াবাড়ির সময় অনেক হিন্দু মহিলাও হিজাব কিনেছেন, জানাচ্ছেন বিক্রেতারা

সুকমল শীল

হিজাব নিয়ে তোলপাড় দেশ। একাধিক রাজ্য সরগরম। ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা, নাকি পোশাকের স্বাধীনতা? দেশজুড়ে হিজাব বিতর্কের মধ্যে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। কিন্তু বিক্রিতে এর কোনও আঁচ পড়েনি কলকাতার নিউমার্কেট, জাকারিয়া স্ট্রিট, বড়বাজার, মিসরি গলি, নাখোদা মসজিদ সংলগ্ন এলাকার দোকানগুলিতে। সেখানে রোজকার মতোই রকমারি হিজাবের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।

দোকানিরা জানাচ্ছেন, মুসলিম মহিলারা সাধারণত স্কার্ফ বা হিজাব পরেন মাথার চুল ঢেকে রাখার জন্যই। কিন্তু অনেকদিন ধরেই হিজাব তাঁদের ফ্যাশানের অনুষঙ্গও হয়ে উঠেছে৷ এই ঢিলাঢালা পোশাকে শরীর ঢেকে রাখার পাশাপাশি আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলার রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে। হিজাবকে বেশ আরামদায়ক পোশাক হিসেবে তুলে ধরছেন নির্মাতারা। তাই হিজাবকে নিছকই ধর্মীয় পোশাক বলতে একেবারেই রাজি নন বিক্রেতারাও।

দোকানগুলোতে নিকাহ, বা অন্য অনুষ্ঠানে পরার জন্য হিজাবে রয়েছে এমব্রয়ডারি, কাট ওয়ার্ক, থ্রিডি ফ্লোরাল ওয়ার্কের কাজ। রয়েছে মসলিনের ওপর জামদানীর কাজও। আছে কাস্টমাইজ ডিজাইন করে নেওয়ার সুবিধে।

শহরের মুসলিম মহিলাদের মধ্যে হিজাবের ব্যবহার কী কমেছে, নাকি বেড়েছে ?‌ মিসরি গলির হিজাব বিক্রেতা মহম্মদ সামিমের দাবি, ‘‌আগের থেকে ব্যবহার অনেক বেড়েছে। করোনার জন্যই বেড়েছে। হিন্দু মহিলারাও হিজাবের ওপর ওড়না পরে অফিসে–কর্মস্থলে যাচ্ছেন। ‌করোনা আসার পর বহু হিন্দু মহিলাও হিজাব কেনেন, পরেন। মুখ মাথা ঢেকে রাখা যায়। পুরো সেফটি।’ দাবি তাঁর। ‌

হিজাব কথাটা শুনলেই মনে ভেসে ওঠে মাথা থেকে বুক পর্যন্ত আবৃত একটা বিশেষ পোশাকের কথা। কলকাতায় সবথেকে বেশি হিজাব, নাকাব (‌বোরখা)‌ পাওয়া যায় জাকারিয়া স্ট্রিট, নাখোদা মসজিস সংলগ্ন এলাকায়। আর উচ্চবিত্তদের জন্য নিউমার্কেট আর সংলগ্ন মিসরি গলি এলাকায়। বড়বাজারে মেলে পাইকারি দরে।

মিসরি গলির বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, স্কুল–কলেজের জন্য হালকা ডিজাইন, রঙ। অফিসের জন্য ফর্মাল হিজাব রয়েছে। আর অনুষ্ঠানের জন্য জমকালো। দাম ২০০ থেকে ৬০০। ডিজাইনার হিজাবের দাম ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে মেয়েদের বেশি পছন্দ কালো রঙের হিজাব। খুব দামি হিজাব আসে মুম্বই, দুবাই, হাদরাবাদ থেকে। সেগুলির দাম ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা।

নিউমার্কেটের বৃদ্ধ হিজাব বিক্রেতা মহম্মদ তৈয়ব বললেন, ‘‌রাজস্থানের মহিলারাও ঘোমটা ব্যবহার করে। ওরা বলে ঘুঙ্ঘট। উত্তরপ্রদেশেও ওই রীতি রয়েছে। তেমনই আমাদের হিজাব। পাশাপাশি বহু মুসলিম মেয়ে আছে যারা হিজাব পরে না। যার যার ইচ্ছে। বহু ডিজাইন রয়েছে। গরমে একরকম, শীতের আলাদা।’‌

নিউমার্কেটের শাকিল আহমেদের কথায়, ‘‌আমার কাছে পাওয়া যায় আধুনিক ডিজাইন। কাজের জায়গায় ব্যবহারের জন্য আরামদায়ক কাপড়ে তৈরি সাধারণ হিজাব। শাড়ি, কামিজ, কুর্তা বা ওয়েস্টার্নের সঙ্গেও এখন মেয়েরা হিজাব পরছে। শুধু হিজাব নয়, হিজাবের সঙ্গে ক্লিপ বা ব্রোচেও এখন বৈচিত্র এসেছে। সব পাবেন এখানে।’‌

‘‌সবথেকে চাহিদা বেশি সুতি, পশমী, নরম জর্জেট, সিল্কের হিজাবের। পার্টি ওয়্যার হিজাবের পাড়ে লাগানো থাকে জরি, পুঁতি, লেস বা কাপড়ের বুটি। বাইরের ধুলোবালি, ও সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে চুল ও ত্বককে বাঁচাতে মুসলিম মহিলাদের মধ্যে বাড়ছে হিজাবের চাহিদা। এবং তাঁর দোকানেই নাকি সবথেকে ফ্যান্সি হিজাব পাওয়া যায়’‌, বললেন আফতাব।

অনুষ্ঠানে পরার জন্য নিউমার্কেটে হিজাব কিনতে এসেছিলেন পেশায় ব্যাঙ্ককর্মী ফারহানা আখতার। তিনি বললেন, ‘‌মাথার চুল ঢেকে রাখতেই হিজাব পরি। এটা আমার ফ্যাশন। এক দিকে চুলও ঢাকা হলো, অন্যদিকে ধর্মীয় অনুশাসনও মানা হল। পরিবার আমার ওপর হিজাব চাপিয়ে দেয়নি। তবে আমি একজন মুসলিম নারী হিসেবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতেই হিজাব পরি। এর সুবিধা অনেক। হিজাব পরা থাকলে এলাকায় আলাদা সম্মান পাই।’‌

দোকানি মহম্মদ সাব্বির বললেন, ‘‌মালয়েশিয়া, দুবাই, ইন্দোনেশিয়া, করাচির হিজাব, নাকাব পাওয়া যায় তাঁর দোকান জোয়া–য়।’‌ তিনিই বোঝালেন বিভিন্ন হিজাবের প্রকারভেদ। বললেন, ‘‌হিজাব আবরি শব্দ। হিজাব যেকোনও পোশাকের ওপর পরে নেওয়া যায়। মাথায় গলিয়ে পিন করে নিলেই হল। আর নাকাব হল সম্পূর্ণ পর্দা। মুখের ওপর থেকে ঘোমটার মতন লম্বা স্বচ্ছ কাপড় ঝুলবে। মুখও দেখা যাবে না। তবে ওয়েস্টার্ন পোশাক, বা জিনসের সঙ্গেও অনেকে মাথা ঢেকে রাখে। সেটা হল স্টোল বা স্কার্ফ। হিজাবের মতোই। আমার কাছ থেকে অনেক হিন্দু মহিলাও কিনে নিয়ে যান।’

গরমে একটানা হিজাবে থাকলে বেশকিছু সমস্যাও হয় মহিলাদের। মল্লিকবাজারের আয়েশা খাতুন বললেন, ‌‘‌হিজাবের সবথেকে বড় সমস্যা চুল পড়া। গরমে মাথা ঘেমে যায়। তখন চুল পড়ার সমস্যাও বাড়ে। যেকারণে চুলের বাড়তি যত্ন নিতে হয়। আমি তাই হিজাব পরার আগে হেডক্যাপ ব্যবহার করি। আর ঘন ঘন শ্যাম্পু। মাসে একবার হেয়ার স্পা করাতে হয়।’‌

‘‌আমি নিজে ব্যবহার করিনা, তবে এটা অবশ্যই ধর্মীয় বিষয়। আমি যদিও এটাকে পোশাক হিসেবেই দেখি। কারও ইচ্ছে হলে পরবে। যেমন আমার অনেক হিন্দু বন্ধুও হিজাবের মতো করে স্কার্ফ পরে। দূষণের হাত থেকে চুল বাঁচাতে।’‌ বললেন হলদিয়া ল কলেজের পড়ুয়া রেশমা খাতুন।

একই মত স্কটিশ চার্চ কলেজের তোর্সা চট্টোপাধ্যায়ের। তাঁর কথায়, ‘‌মেয়েরা কী পড়বে সেটা তাঁরাই ঠিক করুক। আমি নিজে কোনওদিন হিজাব বা ওইরকম কোনও পোশাক ব্যবহার করিনি। তবে কেউ ব্যবহার করলে সমস্যা কোথায়।’‌

বিষয়টিতে শিক্ষাবিদ মিরাতুন নাহার বললেন, ‘‌কারও পোশাকে অন্যের ক্ষতি না হলে সমস্যা কোথায়। হিন্দু বাড়ির মহিলারাও বাইরে বেরোলে, বা বাড়িতে কেউ এলে শাড়ির আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে নেন। এটায় দোষ কোথায়। আমাদের দেশের বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি–সহ মূল দাবিগুলোকে পিছনে ফেলে বার বার হিন্দু–মুসলিম ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। এটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। খেটে খাওয়া মানুষের কথা কেউ ভাবছে না।’

তাঁর আরও সংযোজন, ‘খেয়াল করে দেখবেন, বাজারে যেসব মুসলিম মহিলা সবজি–মাছ বিক্রি করেন, বা ইটভাটায় কাজ করেন, তাঁরা কিন্তু হিজাব পরেন না। ধর্মীয় প্রথাকে মান্যতা দেওয়া হোক, বা নিজস্ব ইচ্ছা, যার যেটা ভালো লাগে সেটা সে করতেই পারে।’‌

You might also like