Latest News

ভারতে সাহেবদের উদ্ভিদচর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতাই

একই ভাবে নমুনা সংগ্রহ হয়ে চলেছে আজও

সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়

সিঙ্কোনার কথা কে না জানে। জানেন কি সিঙ্কোনা এদেশের গাছই নয়! ভারতের মানুষকে ‘ম্যালেরিয়া জ্বর’ নামে মহামারির হাত থেকে বাঁচাতে সাহেবরা এই গাছ আনিয়েছিলেন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। তখন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে জীবন্ত একটি গাছ আনা মোটেই সহজ ছিল না। এমন আরও উদাহরণ আছে।

ধরুণ কাঁচালঙ্কার কথা, সরু-লম্বা যে কাঁচালঙ্কা মুড়ির সঙ্গে খাই বা তরকারিতে দিই, স্যালাডের উপরে চিরে দিয়ে গার্নিস করি – সেটি পেরুর দান। এদেশে তা এসেছে সাহেবদের হাত ধরে। সে সাহেব ইংরেজ নাও হতে পারেন।

ভালো না মন্দ – ঔপনিবেশিক শাসন নিয়ে এই বিতর্ক থামার নয়। সেই বিতর্ক অনেকটাই রাজনৈতিক। রাজনীতির বাইরেও ঔপনিবেশিক শাসনের আরও বেশ কয়েকটি দিক ছিল। তার একটি দিক হল উদ্ভিদবিদ্যা বা বট্যানি। আয়ুর্বেদকে এতটুকু ছোট না করে, চরককে প্রাপ্য শ্রদ্ধা জানিয়েও বলা যায় যে এব্যাপারে সাহেবদেব অবদান কম নয়, সেই সাহেব ডাচ হোন বা ব্রিটিশ। তাছাড়া উদ্ভিদবিদ্যা মানে তো শুধু ওষুধ নয়, তার আরও অনেক ব্যবহারিক দিক আছে। খাবারদাবার, জামাকাপড়, জুতোর ফিতে, বইয়ের পাতা, খবরের কাগজ – এসবই কোনও না কোনও ভাবে গাছ থেকে পাওয়া।

এক সময় ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রধান শহর ও পরে রাজধানী কলকাতাই ছিল উদ্ভিদবিদ্যা চর্চার প্রাণকেন্দ্র। এই প্রাণকেন্দ্রের জনক  বলা যায় জর্জ ওয়াটকে। কলকাতায় তিনিই উদ্ভিদ নিয়ে অন্য ধরনের চর্চা শুরু করেন।

স্যার জর্জ ওয়াটের মূর্তি

তখন ফোটোগ্রাফি ছিল বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। বনবাদাড়ে গজিয়ে থাকা গাছের ছবি তোলা ছিল কষ্টকল্পনা। তাছাড়া সাদাকালো ব্রোমাইড প্রিন্ট হাতে রং করার কৌশলও তখন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই সাহেবরা দুটি উপায় বার করেন সেই সব নথিভুক্ত করার। একটি হল ছবি আঁকানো, আর একটি হল নমুনা সংরক্ষণ করা। প্রাণীদের মতো ফর্মালিন দ্রবণে রাখার দরকার হয় না গাছের নমুনা। সেগুলিকে শুকনো করে নির্দিষ্ট ‘ফোল্ডার’-এ রাখা হয়। এদেশে এসে বয়ন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গাছ ও ডাইয়ের নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ শুরু করেন স্যার জর্জ ওয়াট। খুলে যায় এদেশে উদ্ভিদবিদ্যা চর্চার নতুন দিগন্ত।

এভাবে রাখা হয় নমুনা, এটি ১৮৮৯ সালের

এদেশে এসে বহু গাছগাছড়া দেখে অবাক হতেন সাহেবরা কারণ তাঁদের দেশে সেসব পাওয়া যেত না। সেই সব গাছের নমুনা তাঁরা সংগ্রহের উপরে জোর দেন। সেগুলির বৈজ্ঞানিক নাম দিতে শুরু করেন। উনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকে এই কাজ ব্যাপক ভাবে শুরু হয়।

তার অনেক আগে থেকেই কোম্পানি আমলে গাছগাছালির ছবি আঁকানো শুরু হয় দেশীয় শিল্পীদের দিয়ে কারণ গাছ শুকিয়ে গেলে, ফুল শুকিয়ে গেলে তার রং বোঝা যায় না। রং বোঝার জন্যই এই ছবি আঁকানো।

শিল্পীদের আঁকা নমুনা

এব্যাপারে আর এক অগ্রণী হলেন জোসেফ ডালটন হুকার। তিনি দার্জিলিং ও সিকিম থেকে বহু নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। সিকিমের রাজা তাঁকে বন্দি করে জেলেও পুরেছিলেন। ১৮৪৭ সাল থেকে ১৮৫১ – এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি আঁকিয়েছিলেন অসংখ্য ছবি।

যে সব নমুনা তাঁরা সংগ্রহ করেছিলেন তা এখনও রক্ষিত আছে কলকাতায় বট্যানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায়। বেশিরভাগ ছবি রয়েছে বোট্যানিক্যাল গার্ডেনের হার্বেরিয়ামে। এগুলি সাধারণ দর্শকের জন্য নয়। মূলত গবেষণার কাজে এগুলি ব্যবহার করা হয়। সময়ের সঙ্গে বনাঞ্চলে ও কোনও বিশেষ উদ্ভিদে কী পরিবর্তন হচ্ছে তা বোঝার জন্য এগুলি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়ের দলিল।

জোসেফ ডালটন হুকার

ব্রিটিশরা যে ভাবে নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছিলেন, এখনও একই ভাবে তা সংগ্রহ হয়ে চলেছে বোট্যানক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা ভারতীয় ভারতীয় বনস্পতি সর্বেক্ষণ। এটি কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের অধীন। দেশের প্রায় সব গাছের নমুনা এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এ সব নমুনা কী কাজে লাগে? উত্তর দিলেন কলকাতায় সংস্থার কার্যালয়ের প্রধান তথা সায়েন্টিস্ট ‘ই’ মানস ভৌমিক। তিনি বলেন, “নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছিল সওয়া একশো বছর আগে। এখন নতুন করে আবার সেই জায়গায় গিয়ে দেখা হয় আমাদের সংরক্ষিত নমুনার সঙ্গে সদ্য সংগ্রহ করা নমুনার পার্থক্য কী। এক সময় ওখানে যা গাছপালা ছিল এখনও তা আছে কিনা। তা থেকে বোঝা যায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনও একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের গাছপালার উপরে কী ভাবে পড়েছে।”

নমুনার ব্যবচ্ছেদের ছবি

ভারতীয় জাদুঘরের লাগোয়া এই ভবনটির একাংশ দেখতে পান জাদুঘরে আসা দর্শকরা। এটিকে ভারতীয় জাদুঘরের শিল্পবিভাগ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেকশন) বলা হয়। এখানে রয়েছে দেশলাই কাঠি তৈরির পদ্ধতি থেকে কলসপত্রী গাছের নমুনার মতো অনেক কিছু। শিল্পের কাজে যে সব গাছ দরকারি সেগুলিই এখানে রয়েছে। তারপরের অংশটি সাধারণত বন্ধ থাকে দর্শকদের জন্য। উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারলে খুলে যায় সেই দরজা। মূলত এই উদ্ভিদবিদ্যার ছাত্ররা গবেষণার কাজে এই ‘সম্পদ’ ব্যবহার করতে পারেন। গাছগাছড়া সংক্রান্ত প্রাচীন পুঁথিও রয়েছে এখানে।

পুঁথির অনুরূপ

এখানে ঔপনিবেশিক ভারতে উদ্ভিদবিদ্যা চর্চার ইতিহাস দেখা যায় একেবারে চোখের সামনে। একের পর এক গ্যালারি। একসময় যাঁরা ভারতের উদ্ভিদবিদ্যাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, ছবি সহ তাঁদের কাজের বিবরণ লেখা রয়েছে দেওয়ালে। যাঁরা নমুনা সংগ্রহ করেছেন, ছবি এঁকেছেন তাঁদের কাজের নমুনাও রাখা আছে কাচের শোকেসে।

১৮৬০-এর দশকে হাওড়া-কলকাতায় ভয়াবহ ঝড়ে বট্যানিক্যাল গার্ডেনে যে সব গাছ উপড়ে পড়েছিল সেই সব গাছের কাঠের নমুনা এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফল (জোড়া নারকেল যার বৈজ্ঞানিক নাম লোডোইসিয়া মালদিভিকা), বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিম-জাতীয় গাছের ফল (এন্টাডা হৃডি) প্রভৃতিও রয়েছে।

এখানে একটি বইয়ে পাতায় পাতায় সাঁটা রয়েছে টমাস ওয়ার্ডলেক সংগ্রহ করা নানা ধরনের প্রাকৃতিক রংয়ে রঞ্জিত কাপড়ের নমুনা –  নীল, হলুদ, সিঁদুর প্রভৃতি প্রকৃত রং ও এদের বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন রং। সেই সময় কম্পিউটার ছিল না তাই কম্পিউটারের কালার প্যালেট থাকারও প্রশ্ন নেই। এই ধরনের নমুনা দেখেই তখন রং স্থির করা হত। কী ভাবে নীলের বীজ থেকে সেযুগে নীল বার করা হত মডেল দিয়ে তা বোঝানো রয়েছে।

ফোর্বস ওয়াটসনের সংগ্রহ করা নানা ধরনের এমব্রয়ডারির নমুনাও রয়েছে এখানে।

You might also like