Latest News

কোভিড নিয়ে সরকারকে দোষারোপ করা ঠিক নয়, আমেরিকাও সামলাতে পারত না: দেবী শেঠি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকারগুলি যে নাকানি চোবানি খাচ্ছে তা স্পষ্ট। তবে রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার। যে সমালোচনার ধাক্কায় ব্র্যান্ড মোদীও টলমল।

কিন্তু শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে ডক্টর দেবী শেঠি স্পষ্টতই বলেন, সরকারকে এ ভাবে দোষ দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। তাঁর কথায়, “আমি জানি যে বহু লোক সরকারের সমালোচনা করছে। কিন্তু যে সংখ্যায় গোটা দেশে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, তাতে অন্য কোনও দেশের কথা ছেড়ে দিন আমেরিকাও সামলাতে পারত না। কারণ, সংখ্যাটা বিপুল—অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল।” বিশিষ্ট এই হার্ট সার্জন আরও বলেন, “এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে মানুষকে ভুগতে হয়েছে। তবে এও ঠিক সরকার অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য স্বর্গ মর্ত এক করে দিয়েছে। এতো বিপুল সংখ্যায় মানুষ আক্রান্ত হলে যে কোনও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য।”

ভারতে কোভিডের সংক্রমণের শুরু হতেই গোটা দেশের মানুষকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন ডক্টর শেঠি। এ দেশে চিকিৎসা পরিষেবায় তাঁর সুনাম শুধু রয়েছে তা নয়, বহু লোকে তাঁর বক্তব্যকে গুরুত্ব দেন। ফলে এদিন তাঁর মতামত শুনে কেন্দ্রে শাসক দল স্বাভাবিক ভাবেই আপ্লুত। তা এই কারণেই যে খোলাখুলি কেউ একজন সরকারের উদ্যোগকেও স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

সাক্ষাৎকারে ডক্টর শেঠি আরও বলেছেন, কোভিডের এই ঢেউও ভারত সামলে নেবে। শুধু টিকাকরণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠু হওয়া উচিত। কেন্দ্র রাজ্য যৌথ ভাবে একটি কমিটি গঠন করা উচিত। যে কমিটি ভ্যাকসিন কিনবে ও সরবরাহ করবে। তাঁর কথায়, ভারত কোভিড মোকাবিলা শুরু করেছিল পিপিই কিট ছাড়া। গোটা দেশে তখন মাত্র ২০ হাজার ভেন্টিলেটর ছিল, তাও অর্ধেক অকেজো। সেই অবস্থা থেকে ভারত এখন ভেন্টলেটর রফতানিও করছে। সুতরাং এই ঝড় ভারত সামলাতে সক্ষম। শুধু দরকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।

তাঁর কথায়, টিকাকরণ প্রক্রিয়া শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় হবে না। বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। কারণ, বেসরকারি হাসপাতালগুলি চব্বিশ ঘণ্টা অপারেট করে। তারা চাইলে রাত দুটোতেও অ্যাপয়ন্টমেন্ট দিয়ে ভ্যাকসিন দিতে পারে। একটি বড় বেসরকারি হাসপাতালের ক্যাম্পাস থেকে দিনে ২৬ হাজার মানুষকে ভ্যাকসিন দেওয়াও কঠিন কাজ নয়।

ডক্টর শেঠি আর যা বলেছেন—

দেবী শেঠির মতে, কোভিডের তৃতীয় ঢেউ আদৌ যদি আসে, তা হলে সবথেকে বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে শিশুদের। যাদের বয়স ২ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তাঁর উদ্বেগের কারণ সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

কোভিড কতদিন?

তাঁর কথায়, প্রথমেই বলে রাখি আমি এপিডেমোলজিস্ট নই বা ভাইরোলজিস্ট নই। অতি মহামারীর চরিত্র সম্পর্কে যেটুকু জ্ঞান রয়েছে তার ভিত্তিতেই বলছি যে কোভিডের সংক্রমণ আপাতত চলবে। আগামী বছর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তা কমবেশি ভোগাবে। সুতরাং সে ব্যাপারে এখন থেকেই মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে।

তৃতীয় ঢেউ ও শিশুদের নিয়ে আশঙ্কা

ডাক্তার শেঠি বলেন, তৃতীয় ঢেউ আসবেই কিনা সে ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত নন। মহামারীর চরিত্র অনুযায়ী দ্বিতীয় ঢেউ সবসময়েই ভয়াবহ হয়। তৃতীয় ঢেউয়ের তীব্রতা কম থাকে। তবে তৃতীয় ঢেউ যদি আসে তা হলে সব থেকে আশঙ্কা ছোটদের নিয়ে। কারণ, ততদিনে বয়স্কদের টিকাকরণ হয়ে যাবে। অধিকাংশেরই ইমিউনিটি থাকবে। কিন্তু শিশুদের টিকাকরণ তখনও হবে না। ফলে তাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে বেশি। তাই এখন থেকেই জোর দিতে হবে ইয়ং পেরেন্টস তথা কমবয়সী বাবা মায়ের টিকাকরণে।

কম বয়সী বাবা মায়ের টিকাকরণ কেন জরুরি

ডাক্তার শেঠির মতে, বয়স্ক মানুষ কোভিড আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে সমস্যা কম। কেউ যদি অক্সিজেন বেড বা আইসিইউ বেডে থাকেন তা হলে চব্বিশ ঘণ্টা অ্যাটেন্ডেন্ট লাগে না। কিন্তু কোনও কোভিড আক্রান্ত শিশু অক্সিজেন বেডে বা আইসিইউ-তে থাকলে সে সব সময়ে তাঁর বাবা বা মাকে পাশে চাইবে। তাঁর কথায়, আমার সারাটা জীবন আমি পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বানাতে লাগিয়ে দিয়েছি। হার্ট সার্জারির পর শিশুদের দেখভালের জন্য তা জরুরি। তাই শিশুরা কোভিড আক্রান্ত হয়ে অক্সিজেন বেড বা আইসিইউ বেডে থাকলে কী বায়না করতে পারে আমার থেকে ভাল কেউ জানে না। তাই ততদিনে তার বাবা বা মায়ের টিকাকরণ হয়ে যাওয়া উচিত। যাতে আইসিইউ-তে তাঁরা সন্তানের পাশে থাকতে পারেন।

তৃতীয় ঢেউ সামলাতে আরও কয়েক লক্ষ ডাক্তার, নার্স চাই

সাক্ষাৎকারে ডাক্তার শেঠি বলেছেন, তৃতীয় ঢেউ এলে আরও কয়েক লক্ষ ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিক চাই। তাঁর কথায়, এটা বিষয় বুঝতে হবে—গত এক বছর ধরে কোভিড সামলাতে সামলাতে ডাক্তার-নার্সদের একটা বড় অংশ ক্লান্ত। আবারও বলছি বয়স্ক রোগীদের সামলাতে তাঁদের অতটা বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু তৃতীয় ঢেউ যদি আসে তা হলে শিশুরা আক্রান্ত হবে। তখন এই ক্লান্ত ওয়ার্কফোর্স দিয়ে তাদের সামলানো যাবে না।

কোভিড হাসপাতালে আরও ডাক্তার-নার্সের জোগান কীভাবে সম্ভব?

ডক্টর দেবী শেঠি বলেন, এর একটা বড় উপায় হল ডাক্তারির ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইনসেনটিভ ঘোষণা করা। তাঁর কথায়, একটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে, কোনও ডাক্তার শুধু টাকার জন্য কোভিড আইসিইউতে কাজ করতে চাইবেন না। কিন্তু এমবিবিএস পাশ ডাক্তারদের যদি বলা যায় যে এক বছর কোভিড আইসিইউতে কাজ করলে পিজিতে পড়তে দেওয়া হবে, অনেকেই রাজি হয়ে যাবে। কারণ, পিজিতে আসন কম। ডাক্তাররা পড়ার সুযোগ পান না। সে জন্য খাটতে হয়। আমাকে কেউ যদি বলত যে পিজি এন্ট্রান্সের জন্য আপনার ডান হাত কেটে দিতে হবে—আমি রাজি হয়ে যেতাম। সুতরাং ডাক্তারদের যেমন সেই সুযোগ বা বেতন দিতে হবে, তেমনই নার্সরা কোভিড আইসিইউ-তে কাজ করলে তাঁদের পাশ সার্টিফিকেট দিতে হবে। তবেই ওয়ার্কফোর্স বাড়ানো সম্ভব। এবং এই তরুণ ডাক্তার নার্সরাই শিশুদের সামলাতে পারবেন। বড়রা নয়।

তবে সামগ্রিক ভাবে কোভিডের সংক্রমণ মোকাবিলার জন্য টিকাকরণের উপরেই জোর দিয়েছেন ডাক্তার শেঠি। তিনি বলেছেন, ভ্যাকসিনের আর ট্রায়াল দরকার নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভ্যাকসিন নিয়ে ফেলেছেন। শুধু দরকার উৎপাদন বাড়ানো। এ জন্য দেশ বিদেশের সমস্ত ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থার সঙ্গে এখনই কথা বলতে হবে। টাকা আগাম পেলে সবাই ভ্যাকসিন বানাতে রাজি হবে। আশা করি সমস্যা হবে না।

You might also like