Latest News

ভারতে ৭৪ বছর পরে ফিরছে চিতা, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে এগিয়ে গেল দেশ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতে শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে। তিনটি চিতাকে গুলি করে মারা হয়েছিল। তাও সে তিনটি ছিল এশিয়াটিক চিতা। আফ্রিকান চিতা বিলুপ্ত হয়েছে তারও আগে। ১৯৭০ সালে ভারত সরকার ফের একবার উদ্যোগ নিয়েছিল আফ্রিকান চিতাকে দেশে ফিরিয়ে আনার, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। নতুন করে তোড়তোড় শুরু হয় ২০১৩ সালে। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ দফতর ও ন্যাশনাল টাইগার রিজার্ভেশন অথরিটির (NTCA) আবেদন সেই সময় ফিরিয়ে দিয়েছিল দেশের শীর্ষ আদালত। কিন্ত আর না। বিশ্বের দ্রুততম প্রাণীটির অস্তিত্ব যেভাবে মুছে যেতে চলেছে তাতে নড়েচড়ে বসেছে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ দফতর। করোনা সংক্রমণের গতি যদি কমতে থাকে দেশে তাহলে এ বছরেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আটটি পূর্ণবয়স্ক চিতা নিয়ে আসা হবে দেশে।

ওয়াইল্ড লাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার প্রধান যাদবেন্দ্র ঝালা বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ৮,৪০৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ভারতে উড়িয়ে আনা হবে আটটি আফ্রিকান চিতাকে। এর মধ্যে পাঁচটি পুরুষ ও তিনটি স্ত্রী চিতা। মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যান ও রাজস্থানের মুকুন্দ্র হিলের সংরক্ষণ কেন্দ্রে এই চিতাদের ঠাঁই হতে পারে। ডক্টর ঝালা বলেছেন, দেশের অন্য যেসমস্ত জাতীয় অরণ্য বা সংরক্ষণ কেন্দ্রের পরিবেশ আফ্রিকান চিতাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত, সেখানেই এই প্রজাতিকে সংরক্ষণ করতে হবে।

দুর্ধর্ষ শিকারি আফ্রিকান চিতারা এখন বিলুপ্তপ্রায়

গাঢ় হলুদের ওপর কালো বুটি ছাপ। শুধু দেহটাই এক মিটারের উপর লম্বা। লেজটা আরও ৬০ থেকে ৮০ সেমি। যেমন দ্রুত গতি, তেমনি কৌশলী শিকারি–আফ্রিকান চিতা এক বিস্ময়। Acinonyx jubatus এই  প্রজাতির দেখা সবচেয়ে বেশি মেলে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকায়। নির্বিচারে চিতা-নিধন, চোরাশিকার, বেআইনিভাবে চিতাদের পোষ্য বানানোর প্রক্রিয়ায় আফ্রিকান চিতারা বিলুপ্ত হতে বসেছিল পৃথিবী থেকেই। আইইউসিএন (IUCN) একটা সময় এই চিতাদের লাল তালিকাভুক্ত করেছিল। ২০১৬ সালের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, গোটা বিশ্বে আফ্রিকান চিতার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭,১০০। বিশ্বের অন্যান্য দেশ তো বটেই, আফ্রিকাও উঠেপড়ে লাগে চিতা সংরক্ষণে। ২০১০ সালে এনটিসিএ আফ্রিকান চিতা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়।

Now Scientists Can Accurately Guess The Speed Of Any Animal

প্রাণীবিদরা বলেন এশিয়াটিক চিতা এসেছে আফ্রিকান প্রজাতি থেকেই। এই এশিয়াটিক চিতা এখন ইরান ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যদিও ইরানেও এই চিতার সংখ্যা কম। ‘ইরানিয়ান চিতা সোসাইটি’র হিসেব অনুযায়ী বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীটির সংখ্যা এখন ৪০-এর কিছু বেশি।

The Best Places To See Cheetahs In Africa | AFKTravel

ভারতে সবচেয়ে বেশি চিতা নিধন হয়েছে মুঘল আমলে

চিতা আর চিতাবাঘ কিন্তু এক নয়। চিতার হলদেটে শরীর জুড়ে ছোট ছোট কালো বুটি আছে, মাথাটা ছোট ও চোখের দুপাশ দিয়ে কালো দাগ নেমেছে যাকে ‘টিয়ার স্ট্রাইপ’ বলে। আর চিতাবাঘ বা লেপার্ডের সারা শরীরে গাঢ় হলুদ রঙের ওপরে চক্রাকারে কালো ছোপ আছে। চিতা ক্ষীণ কটি, সামনের পা দুটো অনেক বড়, গতিও বেশি। চিতাবাঘ তুলনায় ভারী, যদিও এদের গতিও কম কিছু নয়। চিতা সাধারণত ঘাসজমিতে থাকতে পছন্দ করে। এদের গতি ঘণ্টায় ৭০ মাইল বা ১২০ কিলোমিটার, কখনও তারও বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার নামিবিয়া ও বতসোয়ানা সবচেয়ে বেশি চিতার দেখা মেলে।

Akbar lifting captured cheetahs. From the Akbarnama (Book of Akbar)

ভারতে ১৯৪৭ সালের পরে ১৯৬৭-৬৮ সালে চিতার দেখা মিলেছিল। ইতিহাস বলে,  মুঘল সম্রাট আকবরের কাছে নাকি ১০ হাজারের বেশি পুষ্যি চিতা ছিল। যার মধ্যে তাঁর সভাঘরেই থাকত হাজারের বেশি চিতা। আগেকার দিনে রাজা-মহারাজারা শিকার ধরতে নিয়ে যেতেন এদের। নির্বিচারে চিতা নিধনও হত। এনটিসিএ-র রিপোর্ট বলে, ভারতে সবচেয়ে বেশি চিতা-নিধন হয়েছে মুঘল যুগে। রাজপুত, মারাঠা সাম্রাজ্যে নির্বিচারে এই প্রজাতির চিতা শিকার করতেন রাজারা। ব্রিটিশ আমলেও চিতা শিকার বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। যার কারণ সবংশে আফ্রিকান চিতাদের অবলুপ্তি। ১৯৪৭ সালে মহারাজা রামানুজ প্রতাপ সিং দেও শেষ তিনটি আফ্রিকান চিতাকে গুলি করে মারেন।

These stories about Akbar and his Asiatic cheetahs will fill you with  wonder - The Mughals of India

The Call of the Cheetah

১৭৯৯ থেকে ১৯৬৮ সাল অবধি চিতার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৩০টিতে। তারপর ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ২০১৩ সালে এনটিসিএ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে শীর্ষ আদালত বলে আফ্রিকান চিতা যেহেতু বিদেশি প্রজাতি, তাই দেশে তাদের সংরক্ষণে সমস্যা হতে পারে। এই প্রজাতির চিতা সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা আছে মধ্যপ্রদেশের নওরাদেহি সংরক্ষণ কেন্দ্রে। পরবর্তীকালে এনটিসিএ-র রিপোর্টকে শিলমোহর দেয় আইইউসিএন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রদেশের অভয়ারণ্যগুলির পরিবেশ, জলবায়ু আফ্রিকান চিতাদের বসবাসের উপযোগী। কাজেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে যে চিতা নিয়ে আসা হবে তার সংরক্ষণে কোনও সমস্যাই হবে না।

আফ্রিকান চিতাদের সংখ্যা বাড়লে সেটা দেশের জন্য সম্মানের। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় আরও একধাপ এগিয়ে যাবে ভারত। পাশাপাশি, পর্যটকদের ভিড়ও বাড়বে।

You might also like