Latest News

অখিলেশের মণ্ডল রাজনীতির ধাক্কা সামলাতে সেই রামই সম্বল বিজেপির, যোগী ফের মঠমুখী

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একের পর এক মন্ত্রী, বিধায়ক দল ছাড়ছেন। তার উপর আজকালের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ভোটের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে বিজেপি। তখন দলত্যাগের ধাক্কা আরও বেড়ে যাবে। এমন জরুরি পরিস্থিতির মধ্যেও মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তিনদিনের জন্য গোরখপুরে যাওয়ায় রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। এই তিনটি দিনের জন্য রাজনীতি ত্যাগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী, বলছে তাঁর শিবির।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার বিমানে গোরখপুরে নেমে যোগী সোজা চলে গিয়েছেন গোরখনাথ মন্দিরে। সেখানেই তাঁর পুরনো আখড়ায় থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথা মেনে শুক্রবার বেলার দিকে বাবা গোরখনাথের চরণে খিচুড়ি পরিবেশন করে পুজো দিয়েছেন। ভোর ভোর উঠে নিজেই খিচুড়ি রেঁধেছেন যোগী। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে এই মন্দিরের পীঠাধীশ ছিলেন উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী। এই তিনদিন তিনি পুরোমাত্রায় ফিরে যাবেন মঠের জীবনে।

যোগীর এই সিদ্ধান্তের মধ্যে যদিও ভক্তির চেয়েও ভোটের গন্ধই বেশি পাচ্ছে রাজনৈতিক মহল। যেমন তাঁর অ়যোধ্যা থেকে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনেও রয়েছে উত্তরপ্রদেশে ক্রমে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা মণ্ডল রাজনীতির মোকাবিলা। বিজেপির দলিত এবং ওবিসি মন্ত্রী, বিধায়কদের দলত্যাগ এবং অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে গো-বলয়ের সবচেয়ে বড় রাজ্যটিতে নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে মণ্ডল সমীকরণ। আর সেই কারণেই তিন দশক আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপিও। তাহল, জাগ্রত হিন্দুত্ব।

গত শতকের নয়ের দশকের শেষ লগ্নে এসে বিজেপি বিপাকে পড়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংয়ের মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকরের সিদ্ধান্তে। বিজেপি তাঁর সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে আঁচ করে বিশ্বনাথপ্রতাপ এক দশক আগে জমা পড়া মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ মেনে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি, শিক্ষায় অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণির জন্য ২৭ শতাংশ পদ, আসন সংরক্ষণের কথা ঘোষণা করেন।

বিশ্বনাথের চাল বুঝতে দেরি হয়নি বিজেপির। গেরুয়া শিবির বুঝতে পারে বিশ্বনাথপ্রতাপ আসলে হিন্দু বর্ণ ব্যবস্থাকেন্দ্রিক চলমান সংঘাতের সুযোগ নিয়ে বিভাজন উস্কে দিতে চাইছেন। লক্ষ্য বিজেপির হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক ভেঙে চুরমার করে দেওয়া। কালক্ষেপ না করে গুজরাতের সোমনাথ মন্দির থেকে অযোধ্যা অভিমুখে রামরথ ছোটান লালকৃষ্ণ আডবাণী। বিশ্বনাথ সঙ্গী বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব রথ থামিয়ে আডবাণীকে গ্রেফতার করলে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নেয় বিজেপি।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তখন মুলায়ম সিং যাদব। আডবাণীকে গ্রেফতারের দিন কয়েক পর খবরের শিরোনামে চলে আসেন তিনিও। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে করসেবকদের উপর পুলিশকে গুলি চালনার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। আডবাণীকে গ্রেফতার আর করসেবকদের উপর গুলি চালনার ঘটনাকে হাতিয়ার করে পরের বছরই উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় চলে আসে বিজেপি। তার পরের বছর সেই সরকারের সহযোগিতায় বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয় হিন্দুত্ববাদীরা।

সেই থেকে টানা কয়েক দশক মন্দির-মসজিদের রাজনীতিতে বিভোর বিজেপি মোদী জমানায় ক্ষমতায় থাকা রাজ্যগুলিতে ভোটে উন্নয়ন এবং সুশাসনকেই পয়লা নম্বর হাতিয়ার করে আসছে। এমনকী নরেন্দ্র মোদী প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হয়ে হিন্দুত্বকে পাশে ঠেলে উন্নয়নের কথাই সামনের সারিতে রেখে সফল হন।

উত্তরপ্রদেশেও যোগী আদিত্যনাথকে বিজেপি বছরখানেক ধরে কর্মযোগী বলে তুলে ধরেছে। যোগী নিজে কথায় কথায় উন্নয়নের ফিরিস্তি দেন। অযোধ্যায় রামমন্দির প্রসঙ্গ কদাচিৎ এনেছেন। কিন্তু একের পর এক দলিত ও ওবিসি নেতার দল ও মন্ত্রিসভা ত্যাগের ঘটনায় বিচলিত বিজেপি হিন্দুভোট ব্যাঙ্ক অটুট রাখতে জাগ্রত হিন্দুত্বের লাইন নিচ্ছে। যোগীর প্রার্থী হওয়া এবং প্রথমবার বিধানসভায় লড়াইয়ের জন্য অযোধ্যাকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই কারণেই।

বিজেপির এক প্রবীণ নেতার কথায়, যোগীর জমানায় ব্রাহ্মণ ও দলিতদের অসন্তোষের কথা দলের অজানা ছিল না। সেই কারণে ওই দুই সম্প্রদায়কে কাছে টানতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয় বিগত এক বছর যাবৎ। কিন্তু ঠাকুর সম্প্রদায়ভুক্ত যোগীর জমানায় অন্য জাতের লোকেরা যোগ্য মর্যাদা পায়নি বলে অভিযোগ। ফলে জাতের অঙ্কে দলে বিদ্রোহের সম্ভাবনা জানাই ছিল। সেই কারণে জাগ্রত হিন্দুত্বের লাইন ফেরানোর লক্ষ্যে যোগী বারে বারে অযোধ্যা গিয়েছেন। নয় নয় করে পাঁচ বছরে অন্তত তিরিশবার। কারণ অযোধ্যাই হল বিজেপির হিন্দুত্বের গর্ভগৃহ এবং রামমন্দির পুননির্মাণ তিন দশক ব্যাপী আন্দোলনের ফসল।

জাতপাতের অঙ্কে যোগীর সংসারে অসন্তোষের খবর অজানা ছিল না অখিলেশেরও। তিনি দলিত এবং ওবিসিভুক্ত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর দলগুলিকে কাছে টানার চেষ্টা শুরু করেন মণ্ডল রাজনীতি চাগিয়ে দিতে। যেমন, সুহেল দেব ভারতীয় সমাজ পার্টি। এই জনগোষ্ঠীর আরাধ্য পুরুষ হলেন রাজা সুহেলদেব। এরা উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার এক শতাংশও নয়। কিন্তু গোটা তিরিশ আসনে এই সমাজ নির্ধারক শক্তি। সেই অঙ্ক মাথায় রেখে নরেন্দ্র মোদী সোহেলদেবের নামে একটি মেডিক্যাল কলেজের শিলান্যাস করেন গত বছর। রাজা সোহেলদেবের সাম্রাজ্য এলাকাকে পর্যটন সার্কিটের অংশ করা হয়। কিন্তু যোগীর সঙ্গে মিল হয়নি সুহেল দেব ভারতীয় সমাজ পার্টির।

দলিত এবং ওবিসিদের নিয়ে রাজনীতি করা বিজেপির সঙ্গে থাকা এই দলটিও অখিলেশের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে জাঠদের মধ্যে বিপুল প্রভাব প্রয়াত অজিত সিংয়ের পার্টি রাষ্ট্রীয় লোকদলের। কৃষি বিল বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই আরএলডি প্রধান জয়ন্ত চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন অখিলেশ। তাঁদের জোট হয়েছে।

কাকা শিবপালের সঙ্গেও বিরোধ মিটিয়ে নিয়েছেন মুলায়ম পুত্র। শিবপালের প্রগতিশীল সমাজবাদী পার্টি অখিলেশের সাইকেল প্রতীকেই ভোট লড়বে। গত সপ্তাহে লখনউতে দু’জনের বৈঠকের পর শিবপাল প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছেন, ভাইপো অখিলেশই আমার নেতা। লক্ষ্যনীয়, কাকা-ভাইপোর বৈঠকের দিন সন্ধ্যায় লখনউয়ের দলীয় দফতরে হাত নাড়তে নাড়তে হাজির হন মুলায়মও।

You might also like