Latest News

ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া রুখবে নতুন গবেষণা, খুঁচিয়ে মারবে পরজীবীদের, বিশ্বজুড়ে কমবে মৃত্যু হার

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মারণ ম্যালেরিয়ার আতঙ্ককে এ বার বুঝি সত্যি সত্যি জয় করা গেল। আশার আলো দেখাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। আক্রান্ত হওয়ার দিনকয়েকের মধ্যেই রক্তে থেকে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছেঁকে বার করে দেবে এই বিশেষ ড্রাগ। আঁচ পড়বে না মানব শরীরের অন্যান্য অঙ্গে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনাও নেই। ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে নিত্য নতুন গবেষণা চলছে। তবে এই আবিষ্কার যুগান্তকারী হতে চলেছে বলেই মত গবেষকদের।

মশা কামড়ালে তার লালার সঙ্গে শরীরে ঢোকে ম্যালেরিয়ার বাহক এককোষী জীব বা প্রোটোজোয়া প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম (Plasmodium falciparum)। তার প্রথম নিশানা হয় শরীরের বিভিন্ন কোষ। আশ্চর্য উপায় কোষের মধ্যে সেঁধিয়ে যায় এই প্রোটোজোয়া। তারপরই শুরু হয় তার শিকার পর্ব। গোটা শরীরই ধীরে ধীরে চলে আসে তার কব্জায়। ফলে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, খিঁচুনি, বমি-মাথা-ব্যথা আবার কখনও উপযুক্ত টিকা বা ওষুধের অভাবে মৃত্যু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর রিপোর্ট বলছে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় ম্যালেরিয়ার মারণ থাবায়। এর উপযোগী কোনও টিকা এখনও সে ভাবে বাজারে আসেনি। কোনও ওষুধও বেশি দিন তার সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি, কারণ, কিছু দিন সেই ওষুধ ব্যবহারের পর, পরজীবীরা তার কার্যকরী ক্ষমতাকে প্রতিরোধ করতে শিখে গেছে। ফলে ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধকের খোঁজে তোলপাড় করে গবেষণা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ড্রাগের খোঁজ করতে করতেই বিজ্ঞানীদের হাতে এসেছে এই বিশেষ কম্পাউন্ড  TCMDC-135051। ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা ‘গ্ল্যাক্সো স্মিথ ক্লাইন’ এই কম্পাউন্ড নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এই গবেষণায় যোগ দিয়েছে ব্রাজিলের সাও পাওলো রিসার্চ ফাউন্ডেশন (FAPESP)

প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম

কী ভাবে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হই আমরা?

ম্যালেরিয়া একটি পরজীবী বাহিত রোগ। যা এক জন মানুষ থেকে অন্য জন মানুষে ছড়ায় স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে। এদের তিনটে জীবন চক্রের একটা হয় মশার শরীরে। বাকি দু’টো আমাদের শরীরে। মানুষের দেহে একবার ঢুকে পড়লে এরা লিভার ও লোহিত কণিকায় এদের বাকি দু’টো জীবনচক্র সেরে ফেলে।

এ বার দেখতে হবে এই পরজীবীরা কী ভাবে শিকারপর্ব চালায় আমাদের শরীরে। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা কামড়ালে তার লালার সঙ্গেই আমাদের শরীরে ঢোকে এই পরজীবীরা। ম্যালেরিয়ার বাহক পরজীবী চার রকম— প্লাসমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স, প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম, প্লাসমোডিয়াম ওভিলি এবং প্লাসমোডিয়াম ম্যালেরি। তাদের মধ্যে প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের আক্রমণেই হয় ভয়ঙ্কর ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া।

শরীরে তো ঢুকে পড়ল পরজীবী, এ বার রক্তস্রোতে ভেসে সে সোজা গিয়ে পৌঁছয় লিভারে। সেখানে বংশবৃদ্ধি করে মেরোজয়েট দশায় এই পরজীবীরা পৌঁছয় লোহিত রক্তকণিকার (RCB) দরজায়। সেখানে তাদের আরও একটি জীবন চক্র শুরু হয়। দ্রুত বংশবৃদ্ধিও হয়। ফলে অতিরিক্ত চাপে লোহিত রক্তকণিকার দেওয়াল ফেটে যায়। পরজীবীরা তখন ফের উদ্বাস্তু হয়ে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং দূষিত কণা মিশিয়ে দেয় রক্তে। ফলে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, যাকেই আমরা ম্যালেরিয়ার লক্ষণ বলি।

TCMDC-135051 কী ভাবে রুখবে এই পরজীবীদের?

ব্রাজিলের ইউনিভার্সিটি অব ক্যাম্পিনাসের অধ্যাপক এবং এই গবেষণার অন্যতম মুখ্য গবেষক পাওলো গোডোই জানিয়েছেন, প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের দেহের বাইরের দেওয়ালে থাকা তিনটি প্রোটিন মানুষের শরীরে বিষ ছড়ায়। এই প্রোটিনগুলো হল— আরএইচ-৫, সিওয়াই-আরপিএ এবং আরআইপিআর। পরজীবীর শরীরে আরও একরকম সাইক্লিন জনিত কাইনেজ প্রোটিন আছে যার নাম PfCLK3। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই প্রোটিনই পরজীবীর প্রাণভোমরা। এর কাজ মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধক প্রোটিনগুলির ক্ষমতা ও কার্যকারিতাকে কমিয়ে দেওয়া। যাতে পরজীবীরা বেশিদিন বেঁচে তাদের বংশবৃদ্ধি করতে পারে। TCMDC-135051 কম্পাউন্ডের কাজ হল এই কাইনেজ প্রোটিনকে সমূলে বিনষ্ট করা। PfCLK3-র ক্ষমতা কমে গেলে পরজীবীদের শক্তি ও বেঁচে থাকার চাবিকাঠিও নষ্ট হয়ে যাবে।

TCMDC-135051 কম্পাউন্ড পরজীবীর যম কিন্তু মানব-প্রোটিনের পরম বন্ধু। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কাইনেজ প্রোটিন PfCLK3-এর মতো মানুষের শরীরেও একই রকম প্রোটিন তৈরি হয় যার নাম PRPF4B। এই কম্পাউন্ড কিন্তু সেই প্রোটিনের কোনও ক্ষতি করে না। খুঁজে খুঁজে শুধুমাত্র পরজীবীর প্রোটিনের উপরই হামলা চালায়। ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো-র বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু টবিন জানিয়েছেন, নানা ভাবে মানব প্রোটিন PRPF4B-এর সঙ্গে TCMDC-135051-কে মুখোমুখি ফেলা হয়েছে। দেখা গেছে এরা একে অপরের কোনও ক্ষতি করেনি।

পরজীবীদের বংশবৃদ্ধি রুখবে TCMDC-135051

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর রিপোর্ট বলছে, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ভারত ও আফ্রিকাতে।

আফ্রিকার দেশগুলিতে ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া বেশি হয়। ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়া বেশি হয় এশিয়ার দেশগুলিতে। জাতীয় পতঙ্গবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে আমাদের দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা তিন লক্ষ ৯৯ হাজার ১৩৪। দিন দিন ম্যালেরিয়ার হানায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এই নতুন গবেষণা সার্বিক হারে সাফল্য পেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন মাইলস্টোন তৈরি হবে।

পড়ুন, দ্য ওয়ালের পুজোসংখ্যার বিশেষ লেখা…

https://www.four.suk.1wp.in/pujomagazine2019/%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%aa-%e0%a6%ad/

You might also like