Latest News

ভর সন্ধ্যায় সব্যসাচীর বাড়িতে মুকুল, মেনুতে ভোট ও লুচি আলুরদম

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুরলীধর সেন লেনে বিজেপি-র রাজ্য দফতরে বসে বিকেলে হেঁয়ালি করছিলেন। যাঁরা দীর্ঘদিন তৃণমূলের রাজনীতি করেছেন, তাঁরা জানেন সেটা কী রকম হতে পারে! দোতলার ছোট ঘরে সাংবাদিক, চিত্র সাংবাদিক নেতা, কর্মী মায় গিজ গিজে ভিড়। মুকুলবাবু বললেন, “এই তো সন্ধ্যেবেলা একটু সল্টলেকে যাবো। এক বন্ধুর বাড়ি..লুচি খাওয়াবে।” পাশ থেকে কেউ এক জন প্রশ্ন করলেন, দাদা লুচি মাংস? চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে একদা তৃণমূলের সেকেন্ডম্যানের জবাব, “নাহ! আলুরদম। ওঁর স্ত্রী আলুরদমটা খুব ভাল রান্না করেন।”

এরই মাঝে ফ্যাশন ডিজাইনার অগ্নিমিত্রা পলের ফোন এসেছিল। ওঁকে বললেন, সন্ধ্যেয় বিধাননগরের ঠিকানায় পৌঁছে যেতে।

কাট টু সল্টলেক। বিধাননগরের মেয়র তথা তৃণমূল নেতা সব্যসাচী দত্তর বাড়ি। দেখা গেল দীর্ঘ আড্ডা দিয়ে রাতে সেখান থেকে বেরোচ্ছেন মুকুলবাবু। ততক্ষণে ইতি উতি খবর চলে গিয়েছে। জল্পনা, কল্পনা এবং রাজনৈতিক সমীকরণের নানান তত্ত্ব নিয়ে রাজ্য রাজনীতির অন্দরে স্রোত বইতে শুরু করেছে। বাইরে ক্যামেরা নিয়ে অপেক্ষায় সাংবাদিকরা।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠল, আপনি হঠাৎ এখানে? জবাবে মুকুলবাবুর কাছ থেকে যেমন জবাব প্রত্যাশিত ছিল, হুবহু তেমনই। কৌতূহল জিইয়ে রেখে যাবতীয় ইঙ্গিত দিতে যা যা বলা যায় আর কী! বললেন, “এ বাড়িতে আমি দশ দিন আগে একবার এসেছি। দু’মাস আগেও এসেছি। ওঁর সঙ্গে আমার এরকমই দাদা ভাইয়ের সম্পর্ক। ওঁর বউয়ের সঙ্গেও আমার সে রকম সম্পর্ক। খিদে পেলেই চলে আসি এখানে।”


তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি সব্যসাচীকে বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন? জবাবে এই পোড় খাওয়া রাজনীতিক বলেন, “না না ওঁর বাড়িতে খেতে আসার মানেই কি ওঁর বিজেপি-তে চলে আসা। লুচি খেলাম, তরকারি খেলাম, মিষ্টি খেলাম।” সেই সঙ্গে বলেন, “ওঁরা কেমন সুখে আছেন জিজ্ঞেস করলাম।”

ওদিকে সব্যসাচীকেও এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। তবে তিনিও তথৈ বচঃ। যেন চিত্রনাট্য আগেই সাজানো ছিল। বিধাননগরের মেয়র বলেন, “দেখুন আমার বাড়িতে কেউ আসতে চাইলে আমি না করি না। আপনিও আসতে পারেন, সবার জন্য দরজা খোলা।”
সব্যসাচীর কথায়, মুকুল দা হঠাৎ ফোন করল, জিজ্ঞেস করল তুমি কোথায়? বললাম বিধাননগরের বাড়িতে ফিরব। শুনে বললেন, আমি আসছি। সব্যসাচীও জানান, সুখ দুঃখের অনেক কথাই হয়েছে। বলেন, “সে সব ইতিহাসের কথা। রাজনীতিতে আমাদের দাদা ভাইয়ের কত পুরানো গল্প রয়েছে! কী ভাবে আমরা চমকাইতলা, নানুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় রাত কাটিয়েছি, একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি, থেকেছি, সেই নিয়ে গল্প হচ্ছিল।” বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্নের জবাবে এই তৃণমূল নেতা বলেন, “ও বিষয়ে আমিও কিছু বলিনি, মুকুল দাও না।”

বাংলার রাজনীতিতে মুকুল-সব্যসাচী জুটির কথা সুবিদিত। তৃণমূলে থেকেও যখন কোণঠাসা মুকুল, এক প্রকার নির্বাসনে রয়েছেন, তখনও তাঁর পাশে ছিলেন সব্যসাচী। মুকুলবাবু বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পরেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাঁধুনি আলগা হয়নি। মুকুলবাবুর ছেলে তথা বীজপুরের বিধায়ক শুভ্রাংশু রায় অসুস্থ হয়ে কয়েক মাস আগে যখন কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তখনও সেখানে ঠায় বসে থেকেছেন সব্যসাচী। দল তথা তৃণমূল কী ভাবল পরোয়া করেননি।

তবে ভোটের আগে এ দিনের ঘটনা যে তৃণমূলকে যারপরনাই অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে সন্দেহ নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দলীয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাম না করে মুকুলের সমালোচনা করছেন, তখন তাঁরই পার্টির নেতা তাঁকে বাড়িতে ডেকে লুচি আলুরদম খাওয়াচ্ছেন,- এমন অসীম সাহস তৃণমূলে দুর্লভ বললেও কম বলা হয়।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এক হতে পারে লোকসভা ভোটের আগে শোভন চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী দত্তদের সঙ্গে দহরম মহরম দেখিয়ে তৃণমূলের অন্দরমহলে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করতে চাইছেন মুকুলবাবু। সে জন্য প্রকাশ্যে এও বলছেন, তৃণমূলের কত নেতা, কত সাংসদ, কত বিধায়ক, কত মন্ত্রী আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কী বলব! দ্বিতীয়ত, লোকসভা ভোটে তৃণমূল ছেড়ে সব্যসাচীর বিজেপি-র প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো বারাসতে কাকলি ঘোষদস্তিদারের বিরুদ্ধেই তাঁকে প্রার্থী করে দেবে বিজেপি। তাঁদের মতে, আগামী কয়েক দিনে এরকম নাটকীয় ঘটনা হয়তো ঘন ঘন হতে পারে।

You might also like