Latest News

Modi-Shah: হিন্দির বড়াই নেই মোদীর ভাষণে, অমিতের সঙ্গে ফারাক কি কৌশল, নাকি বিরোধ

অমল সরকার

হিন্দি নিয়ে দু’জনের বক্তব্যের ফারাক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মাঝেমধ্যেই বলছেন, সর্বভারতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া উচিত হিন্দির। তাঁর আরও বক্তব্য, শুধু সরকারি স্বীকৃতি বা ঘোষণা নয়, সমস্ত ভারতবাসীর হিন্দি জানা উচিত। যাতে এক প্রদেশের মানুষ আর এক প্রদেশের মানুষের সঙ্গে ইংরেজির পরিবর্তে হিন্দিতে কথা বলতে পারেন। (Modi-Shah)

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সুযোগ পেলেই ভাষার প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। কিন্তু বলছেন খানিক অমিতের উল্টো কথা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ভাষণে হিন্দি নিয়ে বড়াই করছেন না। বরং তিনি তুলে ধরছেন আঞ্চলিক ভাষার ঐতিহ্য, গভীরতা, মর্যাদার কথা। এবং বলেছেন সব আঞ্চলিক ভাষাই আসলে জাতীয় ভাষা। (Modi-Shah)

হিন্দি ও আঞ্চলিক ভাষার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ফারাক নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। দুজনে যে এক কথা বলছেন না তা সহজেই বোধগম্য। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী যেন তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে খানিক শুধরে দিতেই একপ্রকার প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক ভাষার প্রশ্ন টেনে আনছেন।

‘আমি সুইসাইড করব, তোমার জামাইকে ফাঁসাব!’ কাল কেন মাকে এ কথা বলেছিলেন মঞ্জুষা

যেমন গতকাল তামিলনাড়ুতে গিয়ে তিনি ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনের উপস্থিতিতে খোলা স্টেডিয়ামের সভায় তামিল ভাষার গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষার মধ্যে লুকিয়ে আছে সংস্কৃতি এবং তামিল ভাষা হল চিরন্তন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সূত্র ধরেই তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে বলেন তামিলকে আইন-আদালত এবং ওই রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের অফিসকাছারিতে এবার সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিন। প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিশ্রুতি না দিলেও সদ্য দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলনে তিনি আঞ্চলিক ভাষায় আদালতের কাজকর্ম করার পক্ষে সওয়াল করেন

শুধু সরকারি অনুষ্ঠান কর্মসূচিতেই নয়, গত ২০ মে প্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে বিজেপির সর্বভারতীয় পদাধিকারীদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানেও তিনি হঠাৎ করেই ভাষার প্রসঙ্গ টেনে এনে শুধু আঞ্চলিক ভাষার গুরুত্বই ব্যাখ্যা করেননি, এই ব্যাপারে দলকে সতর্ক হতে পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষা অত্যন্ত সম্পদশালী, গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদার দাবি করে। সব ভাষায় সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষী কাছে পূজনীয়। বিজেপি নেতা কর্মীদের এই কথাটি মাথায় রেখেই কাজ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী সেদিন আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি লক্ষ্য করছি, ভাষা নিয়ে দেশে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে বিজেপি নেতা কর্মীরা যেন এই ফাঁদে পা না দেন।

অন্যদিকে, কী বলেছিলেন অমিত শাহ। অমিতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে রয়েছে সরকারি ভাষা বিভাগ। হিন্দি সহ সরকারি তালিকাভুক্ত বিভিন্ন ভাষার বিকাশ তাঁর মন্ত্রকের কাজ। মাস দুই আগে ওই মন্ত্রকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অমিত শাহ হিন্দি নিয়ে জোর গলাবাজি করেন। তিনি বলেন, এক প্রদেশের মানুষের আর এক প্রদেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যম ভাষা হওয়া উচিত হিন্দি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুজন ভারতবাসী কেন ইংরেজিতে কথা বলবেন? সেই সঙ্গে তিনি জানান উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে হিন্দিকে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সেখানকার জন্য কয়েক হাজার হিন্দি শিক্ষক নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার

হিন্দি নিয়ে অমিত শাহের এই বক্তব্য নতুন নয়। এর আগে দু’বার জাতীয় হিন্দি ভাষা দিবসের ভাষণে তিনি বলেন, হিন্দি তাঁর কাছে অন্তরের ভাষা। এমনকি মাতৃভাষা গুজরাতির থেকেও তিনি হিন্দিকে বেশি ভালবাসেন। এই অনুষ্ঠানগুলিতেও অমিত শাহ পরামর্শ দিয়েছিলেন, সব ভারতবাসীর হিন্দি শেখা দরকার। যাতে এক প্রদেশের মানুষ আর এক প্রদেশের সঙ্গে হিন্দিতে কথা করতে পারেন।

বলাই বাহুল্য, অমিত শাহের এই আপাত ভালোমানুষি কথা অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। বরং তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে দক্ষিণের এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি। দেশের দুই প্রান্তেই রীতিমত বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। অমিত শাহের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে একই দৃশ্য দেখা যায় কর্নাটক, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানায়। সর্বত্রই সেখানকার মানুষ অভিযোগ করতে থাকে যে এটি আসলে বিজেপি সরকারের হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল। এইভাবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মানা হবে না। শুধু তাই নয় হিন্দির উপযোগিতা নিয়ে বিতর্কে জড়ান রুপোলি পর্দার নায়ক-নায়িকারাও। অনেকেরই মত, এক প্রদেশের মানুষ অন্য প্রদেশে গেলে ভাষা নিয়ে সাময়িক সমস্যা হয়। অল্পদিনেই তা কেটে যায়।

লক্ষণীয় হল প্রধানমন্ত্রী অল্প দিনের ব্যবধানে দুটি অনুষ্ঠানে ভাষা নিয়ে তাঁর বক্তব্যে হিন্দির প্রসঙ্গ টানেননি। হিন্দির উপযোগিতা নিয়ে একটি শব্দ ব্যয় করেননি। স্বভাবতই জল্পনা শুরু হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী কী তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য খণ্ডন করে দেশবাসীকে ভিন্ন বার্তা দিতে চাইলেন?

এই সম্ভাবনা যেমন অনেকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না তেমনি কারও কারও মতে এটা আসলে মোদীর আর একটি রাজনৈতিক চাল। সামনেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই নির্বাচনে দক্ষিণের রাজ্যগুলি বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের লাগোয়া ওড়িশার বর্তমান শাসক দলের সমর্থন দরকার। ওড়িশার বিজু জনতা দল এবং অন্ধ্রের ওয়াইএসআর কংগ্রেস ২০১৭- তে বিজেপি তথা এনডিএ প্রার্থীকে সমর্থন করায় রামনাথ কোবিন্দ রাষ্ট্রপতি পদে হেলায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার পরিস্থিতি এখনও কিন্তু ততটা সহজ নয়। অর্থাৎ বিজেপিকে এবারও আঞ্চলিক দলের সমর্থন নিতে হবে। এবং তারা মনে করছে ওড়িশা এবং অন্ধপ্রদেশের শাসক দল তাদের এবারও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে। ওই দুই রাজ্যে হিন্দির প্রশ্নে তীব্র আপত্তি রয়েছে। ওড়িয়া ও তেলেগু ভাষাভাষি মানুষ কখনও হিন্দির দাপট মানেনি। যেমন মানেনি অখণ্ড অন্ধপ্রদেশও। বিজেপি শিবির তামিল নাগরিককে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করলে স্টালিনের পার্টি ডিএমকে – র সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেওয়াও অসম্ভব নয়।

ফলে অনেকেই মনে করছেন যে অমিতের হিন্দি নিয়ে বড়াইয়ে বিগড়ে যাওয়া আঞ্চলিক দলগুলির ক্ষোভের আগুনে জল ঢালতেই মোদী হিন্দির প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছেন। বড় মুখ করে আঞ্চলিক ভাষার গুণগান গাইছেন। শুধু তো রাষ্ট্রপতি ভোট নয়, বছর শেষে গুজরাত ও।হিমাচলপ্রদেশের বিধানসভা ভোট। আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে মোদীর সাম্প্রতিক বক্তব্য বিজেপির জন্য ইতিবাচক হতে পারে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

তবে এত সব অংক, কৌশলের সম্ভাবনা মেনে নিয়েও কেউ কেউ বলছেন, আট বছর সরকার চালানোর পর নানা প্রশ্নে অমিত শাহের সঙ্গে মোদীর দূরত্ব তৈরি হতে শুরু হয়েছে। অনেক ব্যাপারেই তাঁরা একমত হতে পারছেন না। এই দূরত্বের প্রশ্নটিই উড়িয়ে দিচ্ছে না ওয়াকিবহাল মহল। সেই মতপার্থক্যের প্রতিফলন ধরা পড়ছে মোদীর ভাষণে। প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদার কথা বলছেন। অমিতের উল্টো পথে হেঁটে এড়িয়ে যাচ্ছেন হিন্দির প্রসঙ্গ।

দলের সভায় মোদী এমনকী বারেবারে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতিতে কীভাবে আঞ্চলিক ভাষার বিকাশের কথা বলা হয়েছে। বস্তুত ওই শিক্ষানীতিতে ইংরেজি বর্জনের কথাই একপ্রকার বলা হয়েছে। কিন্তু হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার আভাস নেই। বরং বলা হয়েছে ভারতের মাতৃভাষাগুলির মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারে আগ্রহী বর্তমান সরকার।

অনেকেই মনে করছেন যে মোদি যেভাবে হিন্দির প্রসঙ্গ এড়িয়ে আঞ্চলিক ভাষার মান মর্যাদা রক্ষার কথা বলছেন তাতে আখেরে অমিত শাহকে প্রকাশ্যে খণ্ডন করা হচ্ছে। এখন দেখার যে যদি দুজনের মধ্যে এই প্রশ্নে ফাটল দেখা দিয়ে থাকে তাহলে সেটা জোড়া লাগে নাকি ছোঁড়া চওড়া হয়। নাকি এই ফাটল আসলে পরিকল্পিত। মোদীর আসল লক্ষ্য আঞ্চলিক দলগুলিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে খুশি রাখা।

You might also like