Latest News

কংগ্রেসের তরুণ গগৈয়ের পর সিপিএমের বুদ্ধদেবকে রাষ্ট্রীয় সম্মান, মোদী-অমিত শাহর আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ

অমল সরকার

গত ১৪ বছর জুলাই রাজ্য বিজেপির মিডিয়া গ্রুপে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপিং আপলোড করা হয়েছিল। তাতে দেখা গেল, সদ্য কেন্দ্রে মন্ত্রী হওয়া শান্তনু ঠাকুর প্রথমবার তাঁর দফতরের চেয়ারে বসার আগে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের ছবি অফিসের দেওয়ালে টাঙাচ্ছেন। এরপরই শান্তনু একটি টুইট করেন। তাতে লেখেন, আমার খুবই দুঃখ যে আজ প্রধানমন্ত্রী আমাকে ভারতের সংসদে মন্ত্রী হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেলেন না। বিরোধীদের হট্টগোলের জন্য সব ভেস্তে গেল। আসলে নরেন্দ্র মোদী তফশিলি জাতি, উপজাতি, ওসিবি এবং মহিলাদের মন্ত্রিসভায় যেভাবে সম্মানজনক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করেছেন, বিরোধীরা তা মেনে নিতে পারছেন না।

শান্তনুর ওই টুইট বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতা-মন্ত্রী-সমর্থক রি-টুইট করেন সেদিন। মঙ্গলবার মোদী সরকার বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সিপিএমের প্রবীণ নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পদ্মভূষণ সম্মান জ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর অধুনা বঙ্গ রাজনীতিতে আলোচিত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনুর ওই টুইটের কথা মনে পড়ে গেল। এই দুয়ের সম্পর্কটি বুঝতে হলে মোদী জমানায় সরকার ও বিজেপির কিছু সিদ্ধান্তে চোখ বুলিয়ে নেওয়া জরুরি।

মোদীর সেদিনের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল সন্দেহ নেই। দিল্লিতে ভারত সরকারের মন্ত্রীর অফিস চেম্বারে হরিচাঁদ, গুরুচাঁদ ঠাকুরের ছবি স্থান পাওয়াটা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বছর কয়েক আগেও মতুয়া সম্প্রদায় এবং তাদের পথ-প্রদর্শক হরিচাঁদ, গুরুচাঁদ সম্পর্কে এই বাংলাতেই বা ক’জন জানতেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাম জমানায় শেষ প্রান্তে ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে দারুন সম্পর্ক তৈরি করে ফেললেন এবং সেখান থেকেই বঙ্গ রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করল। তা আরও বাঁক নেয় বিজেপি মতুয়াদের সম্পর্কে সমান আগ্রহী হয়ে ওঠায়। মতুয়া ভোটের তাগিদে তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের মতো নরেন্দ্র মোদীও বড়মা বীণাপানি দেবীর পা ছুঁয়ে প্রণাম ঠুকে এসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত শান্তনু ২০১৯-এ বিজেপির টিকিটে এমপি এবং দু’বছরের মাথায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেন। যদিও ঠাকুরবাড়ির বউমাকে তৃণমূল নেত্রীই প্রথম ভারতের সংসদে পাঠিয়েছিলেন।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে মন্ত্রিসভায় এবার আরও যে তিনজন স্থান পেয়েছেন, তাঁদেরও জাতিগত পরিচয়টি রাজনীতিতে অনালোচিত থাকতে পারে না। কোচবিহারের নিশীথ প্রামাণিকের নাগরিকত্ব বিরাট প্রশ্নের মুখে। তিনি জাতিতে রাজবংশী। এই প্রথম একজন রাজবংশী ভারত সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদীর সৌজন্যে। একইভাবে আলিপুরদুয়ারের জন বার্লা, যিনি বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পরপরই উত্তরবঙ্গকে পৃথক রাজ্য করার ডাক দিয়ে শোরগোল ফেলে দিলেন, দল তাঁর বক্তব্য খারিজ করে দিলেও তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সুভাষ সরকার মন্ত্রী হয়েছেন পিছিয়ে থাকা জেলা বাঁকুড়া থেকে। মোদীর লক্ষ্য ২০২৪-এর আগে বাংলার আদিবাসী সমাজকে বার্তা দেওয়া।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, কেন্দ্রের সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব খতিয়ে দেখলে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহদের ভাবনার একটি সূত্র লক্ষ্য করা যায়, যা আসলে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর তাঁদের নতুন স্লোগানের বাস্তবায়ন। ‘সবকা সাথ-সবকা বিকাশ’ স্লোগানের সঙ্গে সেবার যোগ করেন ‘সবকা বিশওয়াস’। অর্থাৎ সকলের আস্থা অর্জন। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এবারের মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণে দেখা গিয়েছে নানা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।

আসলে মোদী-অমিত শাহদের মিশন ২০২৪ নিয়ে এখন থেকেই ভাবতে হচ্ছে। গেরুয়া শিবির বেশ বুঝতে পারছে, হিন্দুত্বের তাস দিয়ে ভারত বিজয় আর সম্ভব নয়। তাছাড়া, বিজেপি তার জন্মের পর বিগত ৪২ বছর যে ইস্যুগুলিকে হাতিয়ার করে এতদূর এসেছে সেগুলির বেশিরভাগই চূড়ান্ত প্রয়োগ হয়ে গিয়েছে। যেমন ‘জয় শ্রীরাম’, ‘জয় শ্রীরাম’ বলে হিন্দুত্ববাদীরা যতই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উত্যক্ত করার চেষ্টা করুক না কেন, রাম মন্দিরের শিলান্যাস এবং নির্বিঘ্নে মন্দির নির্মাণের কাজ চলায় এবং মুসলিম সমাজ প্রায় মুখে কুলুট এঁটে থাকায় মন্দির-মসজিদ রাজনীতি অদূর ভবিষ্যতে খুব একটা কাজে আসবে না।

কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করার মধ্য দিয়ে বিজেপির আর একটি ইস্যু খরচ হয়ে গিয়েছে। রইল বাকি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর। সেটা কতটা কঠিন গেরুয়া শিবির তা জানে। তার থেকেও কঠিন বিষয়টি মানুষকে গেলানো। তাছাড়া তালাক বিরোধী আইন কার্যকর করাতেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের দাবিটি খানিক খানিক পূরণ করেছে তারা। যেমন, তারা ধর্ম নির্বিশেষে বিয়ের বয়স অভিন্ন করে দিতে আইন করছে।

অতএব বিজেপিকে নতুন ইস্যুর সন্ধান করতে হচ্ছে। যেমন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, লাভ জিহাদ, গো-মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে তারা সামনের সারিতে আনতে চাইছে।

কিন্তু ২০২৪-এর আগে ভোট আরও নানা কৌশলে সুসংগত করা তাদের কাছে অত্যন্ত জরুরি। কারণ, সবাই জানে সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। টানা রাম রাম করার পরিনতি কী, সবাই জানে। তাই বিজেপির এমন ইস্যু আনা দরকার যা মানুষকে দৈনন্দিন জীবন যন্ত্রণা ভুলিয়ে রাখবে।

রাজ্যে রাজ্যে দুর্বল হতে হতেও ১৮টি রাজ্যে কংগ্রেসের সাংসদ আছে। হতে পারে তাঁরা সম্মিলিতভাবে সংখ্যায় মাত্র ৫৪। কিন্তু বিজেপির এখন পয়লা নম্বর টার্গেট আঞ্চলিক দলগুলি, যাদের জন্ম ও বিকাশ স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা পূরণের সংকল্প রক্ষার শপথের মধ্য দিয়ে। সেই পথে তারা এখন বিপুল ভোট ব্যাঙ্কের মালিক, সেখানে বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র, দুই জনগোষ্ঠীরই প্রতিনিধিত্ব আছে। জাতপাতের রাজনীতির চেনা মডেল না হলেও তৃণমূলের ভোট ব্যাঙ্কের মূল আমানত কিন্তু বাংলার পিছিয়ে পড়া বর্গ। বিহার, উত্তরপ্রদেশে লালুপ্রসাদ, নীতীশকুমার, মুলায়ম সিং যাদব, মায়াবতী, অখিলেশ প্রমুখের রাজনীতির ভিতও সকলের জানা। ওড়িশায় নবীন পট্টনায়েক আবার উৎকল জাতীয়তাকেই হাতিয়ার করেছেন। দক্ষিণের আঞ্চলিক দলগুলিও তাই।

বিজেপির টার্গেট এই ভোট ব্যাঙ্কে ভাঙন ধরানো। এই ভোট ব্যাংকের সিংহভাগ একটা সময় পর্যন্ত ছিল কংগ্রেসের দখলে। এবার আর একটি সর্বভারতীয় দলের ছাতার তলায় সেই ভোটকে ফেরানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। মাথার উপর ছাতাটির শুধু রং আলাদা।

সেই লক্ষ্যে বিজেপি একদিকে যেমন দল ও সরকারে প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব বাড়াচ্ছে অন্যদিকে, রাজ্যে রাজ্যে জীবিত ও প্রয়াত বিশিষ্ট মানুষদের সমাদর করে আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের নয়া মডেল তৈরির কাজে লেগে পড়েছে। এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে মোদী-অমিত শাহ থেকে দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিনহারা যেমন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বুকে ব্যথার খবরে বলতে গেলে হাসপাতালে রাত জাগার কথা ঘোষণা করতে যাচ্ছিলেন, কেউ আবার ছুটছিলেন বুম্মাদা অর্থাৎ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, বামপন্থী নাট্য ব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তীদের বাড়িতে। তেমনই ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে স্মরণ করেছেন উনিশ শতকের কবি, নাট্যকার ও সাংবাদিক মনোমোহন বসুকে। অমিত শাহ একই সফরে গিয়েছেন শান্তিনিকেতন, ক্ষুদিরাম, অরবিন্দর বাড়ি।

বিশিষ্ট বাঙালি বলতে গেরুয়া শিবিরের বরাবর শ্রদ্ধা ভক্তি পেয়ে এসেছেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র এবং বিজেপির গর্ব হিন্দু মহাসভা ও জনসংঘের নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেই তালিকাটি এখন এতটাই লম্বা যে তাতে রাজ্যের দ্বিতীয় কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের নামও জ্বলজ্বল করছে, যাঁকে বাংলার রূপকার বলা হয়। মঙ্গলবার তারা তালিকায় যুক্ত করল আর এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম।

বিধানবাবুকে এত শ্রদ্ধাভক্তি করার আর একটি কারণ হল, কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হলেও দেশভাগের সময় বাংলাভাগ করে হিন্দু বাঙালির জন্য পৃথক রাজ্যের দাবিতে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে বিধানবাবুও গলা মিলিয়ে ছিলেন। গেরুয়া শিবির শ্যামাপ্রসাদকে পারলে হিন্দু বাঙালির পিতা বলে দাবি করে।

কিন্তু অসমের প্রয়াত তরুণ গগৈ? ওই রাজ্যের তিন বারের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী গগৈয়ের হাত থেকেই পাঁচ বছর আগে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু টানা পনেরো বছর সে জন্য লড়াই চালাতে হয়েছে তাঁর সঙ্গে। তাঁর পুত্র তরুণ গগৈ এখন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য। সেই তরুণ গগৈকে পদ্মভূষণ ঘোষণা করে মরণোত্তর সম্মানে ভূষিত করেছেন নরেন্দ্র মোদী। গগৈ ছিলেন ত্রিপুরার মানিক সরকারের মতো উত্তর-পূর্বের কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। পনেরো বছর টানা মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে থাকলেও কলঙ্কের কালি লাগতে দেননি। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দাম্ভিক, জেদি মানুষ। কিন্তু সততা নিয়ে সংশয় নেই ভগ্নাংশ শতাংশও। মো। মমতা বন্দ্যোপধ্যায়ও তাঁর বিরুদ্ধে টাকা পয়সা নিয়ে অসততা বা সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তোলেননি কখনও। তথ্য প্রমাণসহ তেমন অভিযোগ নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যাযয়ের বিরুদ্ধেও।

বাংলার ভোটের প্রচারে এসে একটি টিভি চ্যালেনের কনক্লেভে অমিত শাহ বলে যান কীভাবে বঙ্গ-বিজয়ের পর ওড়িশা এবং দক্ষিণের রাজ্যগুলির দখল নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা এগোচ্ছেন। বাংলায় বিধানচন্দ্র রায়ের মতোই ওড়িশায় প্রয়াত বিজু পট্টনায়েক দল নির্বিশেষে শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। জন্ম শতবর্ষে উৎকল বিজেপি তাঁকে মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করেছে। একই কৌতুক এবং কৌতুহলোদ্দীপক ঘটনা হল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কর্নাটকে বিজেপির সভা-সমাবেশে এখন এনটি রামারাও, এমজি রামচন্দ্রন, এবং কে কামরাজের কাটআউট থাকছে। প্রথম দু’জন নিজের নিজের রাজ্যে সেই যে কংগ্রেসের শিকড় উপড়ে ফেলেছেন আর তা গজায়নি। তৃতীয়জন ছিলেন প্রবল ইন্দিরা-বিরোধী এবং সংগঠন কংগ্রেস বা (কংগ্রেস-ও)-এর প্রতিষ্ঠাতা। এঁরা প্রত্যেকেই স্থানীয় মানুষের অন্তরে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বিরাজ করছেন।

একই সূত্র মেনে কেরলে বিধানসভা ভোটে বিজেপি দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ৯০ বছর বয়সি মেট্রো ম্যান হিসাবে খ্যাত ই শ্রীধরনকে দলের মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী করেছিল। দিল্লির পাশাপাশি দেশের বড় শহরগুলিতে মেট্রো রেলের প্রসারে এই মালওয়ালির অবদান অনস্বীকার্য। ফলে এপিজে আবদুল কালামের মতো শ্রীধরনকে আগামী বছর বিজেপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা অসম্ভব নয়। এভাবেই রাজ্যে রাজ্যে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ বিস্তার করে নিজেদের জমি শক্ত করতে চাইছেন মোদী-অমিত শাহরা।

যে কোনও দলই জানে একটি বা দুটি রাজ্যে কোনও মডেল ব্যর্থ হওয়া মানেই সেটা বাতিল বিবেচিত হতে পারে না। বাংলা, কেরল, তামিলনাড়ুতে বিধানসভার ভোটে তাদের নয়া কৌশল কাজে না এলেও উত্তরপ্রদেশে সেই একই ফরমুলা প্রয়োগ করতে চলেছে বিজেপি। সবাই জানে দেশের বৃহত্তম রাজ্যটির বিধানসভার ভোটে শুধু যোগী আদিত্যনাথের ভাগ্য নির্ধারিত হবে না, আগামী লোকসভা ভোটের সেমিফাইনাল হিসেবে মোদী, অমিত শাহদেরও অগ্নিপরীক্ষা উত্তরপ্রদেশে। মাস কয়েক আগে সেখানে মোদীর একটি সিদ্ধান্ত বিরোধীদের তো বটেই, তাঁর দলকেও চমকে দেয়। দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে মোদী একটি টুরিস্ট সার্কিটের অনুষ্ঠানে মহারাজ সোহেলদেবের নামে মিউজিয়ামের উদ্বোধন করেন। একই সঙ্গে তাঁর নামে একটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের কথা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। পূর্ব উত্তরপ্রদেশের বারানসী, বালিয়া এলাকায় রাজভর নামে একটি পশ্চাৎপদ সম্প্রদায় মহারাজা সোহেলদেবকে তাঁদের নেতা মানেন। ওমপ্রকাশ রাজভর নামে ওই সম্প্রদায়ের একজন সোহেলদেব রাজভর পার্টি নামে একটি দল চালান। ওমপ্রকাশ রাজভর কয়েকমাস আগেও যোগীর মন্ত্রিসভায় ছিলেন। বিজেপি তাঁর দলকে গিলে ফেলছে বুঝতে পেরে তিনি মন্ত্রিসভা ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। বিজেপি তাঁর ভোট ব্যাঙ্ককেও টার্গেট করে এগোচ্ছে। রাজভররা উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার মাত্র তিন শতাংশ হলেও গোটা কুড়ি বিধানসভা আসনে তাঁরা প্রায় ১৮ শতাংশ। স্বভাবতই যোগীর পরামর্শে মোদী এই দলিত সম্প্রদায়কে বুকে টেনে নিতে একাদশ শতকে শ্রাবস্তীর রাজা সোহেলদেবের গৌরবগাঁথাকে আশ্রয় করেছেন।

অসমে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেও মুখ্যমন্ত্রী বদল করেছে। ওই রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার প্রধান কাণ্ডারী সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল ছাত্রজীবনে ছিলেন অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (আসু) সভাপতি এবং একবার বিধায়ক এবং দু’বার লোকসভায় যান অসম গণপরিষদের (অগপ) টিকিটে। আসু এবং অগপ-র ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে আছে এদেশে ভাষার ভিত্তিতে আঞ্চলিক প্রত্যাশার সবচেয়ে বড় দাবিটি, পৃথক অসম রাষ্ট্র। ২০১১-তে বিজেপিতে যোগ দিয়ে ২০১৬-তে সেই দলের মুখ্যমন্ত্রী হন সোনওয়াল।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে কাজ করেননি। কিন্তু বাজপেয়ি, আদবানিদের সরকারের সময় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। জাতীয় স্বার্থ এবং নিরাপত্তা ও মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে তাঁর সরকারের ভুয়সী প্রশংসা করতেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি। মোদী তখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী। হতে পারে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের জন্য বেছে নেওয়ার পিছনে সেই অতীত অভিজ্ঞতাও কাজ করেছে।

You might also like