Latest News

পুজোয় চাই নতুন পোশাক, ব্যস্ত মেটিয়াবুরুজের ওস্তাগরেরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাপড়ের ওপর নিজের তৈরি ডিজাইন আঁকছেন দিলবার হোসেন। তার পাশেই থরেথরে সাজানো কাপড়ের বান্ডিল। অন্যদিকে সেই কাপড়ের বান্ডিল খুলে মেশিনে ডিজাইন কাটতে ব্যস্ত মেহবুব-বিশ্বজিৎ। তিনতলা বিল্ডিং-এ আর এক তলায় আবার সারসার মেশিনে সেলাই চলছে। চারিদিকে শুধুই ব্যস্ততা।হাতে যে প্রচুর কাজ। সকাল ১১টা থেকে কাজ শুরু হয়, তারপর আর ফুরসৎ নেই। ছাড় শুধু টিফিনের সময়টুকু। নিখুঁতভাবে প্রতিটি পোশাক সুন্দর করার প্রতিযোগিতা চলছে যেন। চারদিকে নানা রঙের পোশাকের সম্ভার। আবার সেই পোশাক বাক্সে করে প্যাকিং চলছে। থরেথরে সাজানো বাক্স লরি বা ট্রাকে পাড়ি দিচ্ছে বিভিন্ন প্রান্তে।

করোনার ধাক্কা সামলে আবার ব্যস্ততা ফিরেছে মেটিয়াবুরুজের ওস্তাগারে (Metiaburuj)। মেশিনের আওয়াজ, কারিগরদের কোলাহল সব মিলিয়ে মেটিয়াবুরুজের ওস্তাগারে যেন যুদ্ধ চলছে। পুজোর মরশুমে প্রতিবছরই এই ব্যস্ততা থাকে। তবে করোনার জন্য সেই চিত্র পট কিছুটা ম্লান হলেও আবার কাজের গতিতে শান দিয়েছেন ওস্তাগরের কারিগররা।

দুর্গা পুজোর মতো উৎসবে প্রায় প্রতিটি বাঙালিই নতুন পোশাক কেনেন। শুধু বাঙালি নয়, এই উৎসবে মেতে ওঠেন বাংলার প্রতিটি মানুষই। নতুন পোশাক পড়ে ঠাকুর দেখার ঢল নামে রাস্তায়। সেই পোশাকের অনেকটাই তৈরি হয় এই ওস্তাগারে।স্বভাবতই পুজোর (Durgapuja) মরশুমে ব্যস্ততার চেহারা নেয় এক অন্য মাত্রা। হাতে সময় কম। সময়ের মধ্যে অর্ডারের পোশাক শেষ করার ব্যস্ততা চিত্র মেটিয়াবুরুজের ওস্তাগরদের প্রতিটি কারখানাতেই। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় হাজার দশেকের ওপর কারখানায় কাজ চলছে (cloth factory)।

হাতে পেন দিয়ে এক মনে ডিজাইন তৈরি করতে করতে দিলবার হোসেন বলেন, আগের বছরের তুলনায় এবার কাজের চাপ ভালই। তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে হাতের কাজ, তাই টিফিনের সময় হয়ে গেলেও খেতে যাননি তিনি। তার মধ্যেই হাসিমুখে নিজের তৈরি ছোটদের পোশাকও দেখিয়ে দিলেন দিলবার হোসেন।ডিজাইন মতো কাপড় কাটতে ব্যস্ত মেহবুব-বিশ্বজিৎরা। মেহবুব কাটছে আর সেই কাটা কাপড় সাজিয়ে রাখছেন বিশ্বজিৎ। আবার হাত বদল করেও কাজ চলছে। সময় যে তাদেরও হাতে নেই। যেখানে মিনিটে ৩০০ এর বেশি ডিজাইন কাটা হয়, সেখানে এক মিনিটও খুব দামি এই ওস্তাগরের কারিগরদের কাছে।

আরও পড়ুন: দেগঙ্গায় নিরীহ চাষিদের গ্রেফতার করল পুলিশ

অন্যদিকে, পোশাকের চাহিদা মতো কোনওটায় বোতাম লাগাতে হয়, আবার কোনওটায় হুক বসে। সেই কাজ ঘিরেও ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। এক মনে বোতাম লাগিয়ে যাচ্ছেন খুকুমনি বিশ্বাস। কাছের পাহাড়পুর গ্রাম থেকে টিফিন নিয়ে কারখানায় চলে আসেন তিনি। দু’বছর এই ওস্তাগারেই দিনের অধিকাংশ সময় কাটান তিনি। তবে লকডাউনের পর আবার কাজ শুরু হওয়ায় খুশি তিনি। তার কাজ শেষ হলেই সেটা প্যাকিং হবে, তাই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চান না।করোনার প্রথম দিকে ব্যবসার অবস্থা যেভাবে পড়ে গিয়েছিল সেদিক থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে, বলে জানাচ্ছেন বাংলা রেডিমেড গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স ওয়েলফেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সংগঠনের সম্পাদক আলমগির ফকির। তিনি আরও বলেন যে, করোনার কারণে গত বছর ব্যবসা কিছুটা কমেছিল। তবে এই বছরে কাজের বরাত আসছে। এই ওস্তাগারে সিকি মাইল দূরেই বসে বিশাল হাট। প্রায় দেড় কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে প্রতি শনি-রবিবার চলে কেনা বেচা। রাস্তার দু’ধারে সারে সারে সাজানো কংক্রিটের ঘর। ৩০-৩৫ হাজার দোকান ঘিরে ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। রাস্তায় শুধু লোকের মেলা। পাড়ার দোকান থেকে বিভিন্ন মার্কেটে দোকানদার ব্যস্ত পছন্দের পোশাক (new dress) কিনতে। নতুন ডিজাইনের খোঁজ প্রায় সকলের মধ্যেই।

ওস্তাগারে তৈরি পোশাকের বাহার শোভা পাচ্ছে এই হাটে। পুজোর জন্য নতুন পোশাকের চাহিদাও খদ্দেরদের মধ্যে। ভোর বেলা থেকে এই হাটে চলে কেনা-বেচা। বেলা গড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়ের পরিমাণ। আর লোকের এই জ্যাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পুলিশ। ভ্যান, বাইক বোঝাই করে মাল নিয়ে চলেছে ছোট-বড় কাপড়ের ব্যবসায়ীরা।শনি-রবিবার এই অঞ্চল সাধারণত মারান না এলাকার মানুষ। সপ্তাহের এই দুইদিন ব্যবসায়ীদের ভিড়ে এলাকা হয়ে ওঠে কুম্ভ মেলা। সময় নেই কারোর হাতেই। রাস্তার মাঝে একটু দাঁড়িয়ে পড়লেই পেছন থেকে আসে ধাক্কা। সারা বছরই ভিড় থাকে, তবে সামনে পুজো তাই ভিড় বাড়ছে এত। “আরও কিছুদিন পর এই ভিড় দ্বিগুণ হবে”, জানালেন বাইকে যেতে যেতে হাটে আসা এক ব্যবসায়ী।এই ওস্তাগার ও হাট মিলিয়ে জমজমাট মেটিয়াবুরুজ। এখানে এসে পড়লেই বোঝা যায় ব্যস্ততার চিত্র। ওস্তাগারের অধিকাংশই কারিগর মুসলিম। কাজের ফাঁকে নামাজও পড়ে নিচ্ছেন তারা। প্রার্থনা সেরে নিচ্ছেন আল্লাহর কাছে। পুজোর মুখে ব্যবসা বাড়ায় হাসি ফুটেছে মালিক থেকে কর্মচারী সকলের মুখেই।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like