Latest News

ধুয়ে নিলেই নতুন! করোনাকালেও শহরে দেদার বিকোচ্ছে ‘মরা সাহেবের’ কোট

সুকমল শীল

পার্কা, ক্যানম, ওয়াই ডব্লিউ সি-র মতো নামি বিদেশি ব্র্যান্ডের জ্যাকেট, কোট মাত্র দেড়শো টাকা! গড়িয়াহাটের ফুটপাথজুড়ে দেদার বিকোচ্ছে সেসব। বিভিন্ন ব্লেজার, টপ, সোয়েটার, এমনকি আসল ফারের জ্যাকেটও রয়েছে। দাম দেড়শো থেকে পাঁচশো। এত কমদাম কেন? অনেক প্যাঁচ-পয়জারের পর দোকানি হেসে বললেন, ‘এগুলো এম এস-এর মাল।’ সেটা আবার কী! একটু কাছ ঘেঁষে দোকানি বললেন, ‘মরা সাহেব’।

চালু ধারণা হল , কোনও সাহেব মারা যাওয়ার পর তার ব্যবহৃত পোশাক যখন বিক্রি করা হয়, তখন সেটা হয় ‘সাহেব মরা’ পোশাক। অন্য একটি ধারণাও আছে। সেটা হল, কোনও সাহেব মারা যাওয়ার বছর কয়েক পর মাটি খুঁড়ে সিঁধেল চোর ঢোকে কফিনের ভিতর৷ তারপর কঙ্কালের গা থেকে সাহেবের কোট বের করে নিয়ে আসে৷ এ রকম বেশ কয়েকখানা কোট বাগিয়ে নেওয়ার পর রাস্তায় দোকান সাজিয়ে বেচতে বসে পড়ে চোর ! এই প্রচলিত ধারণা হেসে উড়িয়ে দিলেন গড়িয়াহাটের ফুটপাথের পুরোনো কোট বিক্রেতা চন্দন দাস। বললেন, ‘কুড়ি বছর ধরে ব্যবসা করছি। কীভাবে ওইরকম নামকরণ হল বলতে পারব না। তবে সাহেবদের ব্যবহার করা জিনিস, তাই হয়ত ওরকম নাম।’

বেশিরভাগ পোশাকই আসে আমেরিকা, চীন, দুই কোরিয়া আর ব্যাংকক থেকে। সব পোশাক প্রথমে ঢোকে গুজরাতে। সেখানে ধোলাই হয়। তারপর বস্তাবন্দি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কলকাতার খিদিরপুর, মল্লিকবাজার, হাওড়া থেকে মাল তোলেন রাহুল, চন্দনরা। কিনতে হয় কেজি হিসেবে। ৪৫ থেকে ৮০ কেজির বস্তা হয়। পোশাকের ধরণ অনুযায়ী দাম হয়। ২৪ থেকে ৮০ হাজার টাকা দাম পরে। কোট বিক্রেতা রাহুল রায় বললেন, ‘সবসময় যে লাভ হয় তা নয়। অনেক বস্তায় ছেড়া-ফাটা পোশাকও থাকে। সবটাই ভাগ্যের ব্যাপার।’

একবার-দু’বার ব্যবহার করা এইসব দামি পোশাক কীভাবে পান তাঁরা? রাহুল জানালেন, ইউরোপের বহু খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী ধনী মানুষ আছেন , যাঁরা বাবা -কাকা মারা যাওয়ার পর তাঁদের ব্যবহৃত জামা -কাপড় আর গায়ে দেন না৷ দান করেন গরিব মানুষের জন্য৷ তার পরিমাণ বিপুল৷ আবার , বন্যা , যুদ্ধ, ভূমিকম্প এমন নানা পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবী থেকে ত্রাণসামগ্রী জড়ো হতে থাকে৷ তার অনেকটাই জাহাজপথে চলে আসে৷ এছাড়াও পুরনো কাটিংয়ের এবং ধুলো পড়া , ইঁদুরে কাটা কোটও অনেক ফ্যাক্টরি থেকে , শো-রুম থেকে জলের দরে মিলে যায়৷ সেগুলোই জায়গা পায় মরা সাহেবের কোটের দোকানে।

বিক্রেতারা জানালেন, সারাবছরের তুলনায় শীতকালে এই ব্যবসার রমরমা শুরু হয়। বাঙালির মধ্যে কোট পরার একটা বাসনা রয়েছে। ব্র্যান্ডেড বিলিতি কোট হলে তো কথাই নেই। পকেটে রেস্ত নেই, অথচ ব্রান্ডপ্রীতি ষোলআনা যাদের, মূলত তারাই ক্রেতা। মহিলা ক্রেতার সংখ্যা বেশি। তবে করোনার জন্য এখন বিক্রি কিছুটা কমেছে।

দীর্ঘদিনের ক্রেতা চন্দ্রিমা হালদার বললেন, ‘ওদের কাছে ভালো স্টক এলেই আমায় ফোন করে। আজকে একটা পশমের কোট আর একটা ট্রেঞ্চকোট কিনলাম। ড্রাইওয়াশের পর বোঝাই যাবে না যে ব্যবহার করা। এই জিনিসের নতুনের দাম প্রচুর।’

বস্তাভর্তি কোট কেনার পর বিক্রেতারা দেখেন কোন কোটে কেমন ত্রুটি৷ কোনওটায় বোতাম নেই , কোনওটার পকেট ফুটো, কোনওটায় হাতার কাছে সেলাই খুলে গিয়েছে। সেগুলো খিদিরপুরে ছোট টেলারিং মাস্টারদের কাছে চলে যায়৷ বোতাম লাগিয়ে , রিপু করে , সেলাই দিয়ে , একপ্রস্থ ওয়াশ করে সেইসব কোটকে ঝকঝকে চেহারা দেওয়া হয়। তারপর আসে ফুটপাথে৷ টাঙিয়ে রাখা হয় হ্যাঙ্গারে৷ এমনকী কোম্পানির নকল ট্যাগও ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ এতে সুবিধা কী ? এতদিন অনেকেই নোংরা , ধুলো, বোতাম ছেঁড়া কোট দেখে সেগুলোকে ‘মরা সাহেবের কোট ’ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারছিলেন না৷ এখন ‘ফ্যাক্টরি রিজেক্ট ’ ইত্যাদি বলে দিব্যি চালানো যাচ্ছে৷ আর দরও প্রাথমিকভাবে অনেকখানি বাড়িয়ে রাখা যাচ্ছে৷

নতুন কোনও সংস্থায় যোগদান করেছেন , মার্কেটিং , সেলসের ছোট কোম্পানিতে কাজ করেন , এমন কমবয়সী যুবক-যুবতীরাই মূলত এই কোটের বারোমাসের ক্রেতা৷ এছাড়াও বহু পথচলতি মানুষ কিনে নিয়ে যান৷

এই করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ অন্যের ব্যবহার করা কোট কিনতে ইতস্তত করেন না? উত্তরে রাকেশ শর্মা বললেন, ‘কোট গুজরাতে এনে কীটনাশক দিয়ে ধোয়া হয়।’ একটা কোট নাকের কাছে ধরে বললেন, ‘দেখুন একটা ওষুধের গন্ধ পাবেন। পাঁচবার ধোয়ার পর এই গন্ধ যায়। রোগ ছড়ানোর কোনও ভয় নেই।’

তিনিই জানালেন, আমেরিকার পোশাকের বস্তা কপালে জুটলে বিক্রি হতে চায়না। কারণ মাপের সমস্যা। সেজন্য তাঁরা কোরিয়া, চীনা বা ব্যাংককের পোশাক খোঁজেন। সেগুলো ভালো ফিটিংস হয় ভারতীয়দের গায়ে। কিন্তু সবসময় তা মেলে না।

এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পোশাক কিনতে এসেছিলেন রোশনি পাল। একটা ড্রেস আর জ্যাকেট কিনলেন। জানালেন, তিনি একটি বহুজাতিক সংস্থার সেলস বিভাগে কাজ করেন। বললেন, ‘একটা দামি ব্লেজার বা কোনও অনুষ্ঠানে একটা বিদেশি ড্রেস পেশাগত জীবনে আলাদা ‘ইমেজ’ তৈরি করে। ক্রেতা সামলাতে সুবিধে হয়। এরকম কোট বা পোশাক নতুন কিনতে গেলে পকেট ফাঁকা হয়ে যাবে। তাই এখান থেকে বেঁছে কিনে নিই। ড্রাইওয়াশের পর নতুন না পুরোনো, ধরতে পারবেন না।’

You might also like