Latest News

কলকাতার ঘরে ঘরে প্রতিভা, সেটাই শহরের আসল পুঁজি, কাজে লাগাতে জানতে হবে

নমিত বাজোরিয়া

আমার জন্ম কলকাতায়। আমার বাবাও কলকাতাতেই জন্মেছেন। আমার ঠাকুরদা কর্মসূত্রে রাজস্থান থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। আমরা থাকতাম উত্তর কলকাতার বিকে পাল অ্যাভেনিউয়ে। তখন পাড়ার সবাই মিলেমিশে থাকত। সকাল থেকে রকে আড্ডা বসত।

রকের আবার টাইম ডিভিশন ছিল। একেবারে সকালে বাজার ফেরত বাড়ির কর্তারা বসতেন গল্প করতে। আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে তাঁরা বাড়িতে ঢুকে যেতেন, কারণ তখন দু’বেলা রান্না করতেন মা কাকিমারা। সাধারণ মানুষের বাড়িতে গ্যাস ওভেন, ফ্রিজ এসব থাকত না। উনুনে রান্না হত।

এরপর ন’টায় সাইরেন বাজত। সাইরেন মানেই কাজের জন্য দৌড় শুরু। অফিসযাত্রীরা বেরিয়ে পড়তেন ট্রাম বাস ধরার জন্য। ব্যবসায়ীরাও পৌঁছতেন কাজের জায়গায়। এরপর স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বেরনোর পালা। বেলার দিক থেকে রকে দেখা যেত বেকার যুবকদের। মাঝদুপুর অবধি তাদেরই দৌরাত্ম্য চলত। বিকেলে বসতেন দাদুস্থানীয় বয়স্করা। আর সন্ধেবেলা আবার রকের দখল নিতেন বাবা কাকারা। কাজ থেকে ফিরে চা জলখাবার খেয়ে চলে যেতেন আড্ডা দিতে। অদ্ভুত একটা ছন্দে চলত জীবন।

এখন সেই তালটা কেটে গেছে। সবাই একলা দৌড়চ্ছে। হাইরাইজ, মাল্টিপ্লেক্স কেড়ে নিয়েছে কলকাতার পাড়ার বন্ধন। বেশিরভাগ পাড়ায় পুরনো বাড়িগুলো ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। বদলে গেছে পরিবারের মানুষজন। বলতে চাইছি, কলকাতার মানচিত্র বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে মন। পরস্পরের ফেলো ফিলিংস উধাও আজ।

আমরা যখন স্কুল কলেজে পড়ছি তখন খুব পাওয়ার কাট হত। লোডশেডিং। লণ্ঠন জ্বালিয়ে লেখাপড়া করতাম। আর গরমকালে রাতে লোডশেডিং হলে সবাই মিলে বালিশ নিয়ে ছাদে শুতে যেতাম। ছাদে ছাদে গল্পগাছাও চলত। এখন এই পাওয়ার কাটের সমস্যাটা প্রায় নেই। এটা একটা ভালো দিক।
কলকাতা এখন মেট্রো সিটি। তাই আগের থেকে অনেক বেশি ঝলমলে, ঝকঝকে। অনেক আলো লাগানো হয়েছে শহর জুড়ে। সৌন্দর্যায়নের জন্য অনেক স্কাল্পচার বসানো হয়েছে। তবে আমার মনে হয় শহরে গাছ লাগানো অনেক বেশি দরকার। এতে শহরের পলিউশন অনেক কমবে, সবুজের সৌন্দর্যে আরও লাবণ্যময় হবে কলকাতা।

কলকাতার অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি একটা জিনিস। কী বলুন তো? রাজনীতি নিয়ে উন্মাদনা। যে পার্টিই প্রশাসনে থাকুক আর যে দলই থাকুক বিরোধী পক্ষে, সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি ভোটপ্রচার নিয়ে একটা হইহই কাণ্ড, মিটিং-মিছিল চলতেই থাকে। কলকাতার মানুষও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা, তর্কবিতর্ক করতেই থাকেন। অন্য অনেক মেট্রো সিটিতে ভোটের সময় গিয়েও দেখেছি চুপচাপ। উত্তেজনা কম। আমার কাছে তাই কলকাতা আর রাজনীতি সমার্থক।

রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য প্রশাসন দেশ বিদেশ থেকে লগ্নিতে আগ্রহী সংস্থাদের নিয়ে বিজনেস মিট, ইন্ডাস্ট্রি আনার চেষ্টা করছে। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এই শহরের বেস হল ইন্টেলেক্ট। ঘরে ঘরে এবং রাজ্যেও ছেলেমেয়েদের প্রতিভা আছে তা ঈর্ষণীয়। সেটাকে কাজে লাগিয়ে যদি আইটি সেক্টরকে আরও ব্যাপ্ত ও উন্নত করা যায়, সবরকম সুযোগ সুবিধে দেওয়া যায়, তাহলে এ শহর বেঙ্গালুরুকে টেক্কা দেবে।  কর্মসংস্থান বাড়লে ছেলেমেয়েরাও অন্যত্র ছুটবে না।

আর একটা দিকে প্রশাসন নজর দিতে পারে, সেটা হল এখানকার মানুষের ক্রিয়েটিভিটির দিক। এখানে প্রত্যেক বাড়িতে একজন না একজন আছেন যিনি গান জানেন বা নাচ জানেন, বা আবৃত্তি করেন, কবিতা লেখেন, সাহিত্যচর্চা করেন বা অভিনয় করতে পারেন। এটাকে ফোকাস করে কলকাতাকে ডেভলপ করা যেতে পারে। ক্রিয়েটিভিটি দিয়েও একটা অন্যরকম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা সম্ভব।

বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এখন ধুঁকছে। অথচ মরাঠি, পঞ্জাবি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ফ্লারিশ করছে। খোঁজ করলে দেখতে পাবেন ওই ইন্ডাস্ট্রির অর্ধেক লোক বাঙালি, কলকাতার মানুষ। একটা সময় ছিল যখন বাংলা ছবিকে অনুসরণ করত বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। আজও প্রচুর ট্যালেন্টেড মানুষ আছেন বাংলা ফিল্ম ও এন্টারটেনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে। তাই এই সেক্টরকে মজবুত করলেও অর্থনৈতিক উন্নতি হবে। আর যে দিকটায় সরকার নজর দিতে পারে তা হল ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি, যার হেড-অফিস হবে কলকাতা।
কলকাতা আমার প্রাণের শহর, ভালবাসার শহর। তাই আগামীতে কলকাতাকে আরও সমৃদ্ধ, আরও উন্নত রূপে পেতে  চাই।

 

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সরকারি হাসপাতালগুলো আরও পরিচ্ছন্ন হোক, বিকশিত হোক শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা

You might also like