Latest News

কুড়ি বছরে কলকাতা যতটা বদলেছে অন্য কোনও শহরে তা হয়েছে কি?  

অপরাজিতা আঢ্য

তখন ক্লাস এইটে পড়ি। বাবা ভর্তি করে দিলেন তনুশ্রীশঙ্করের নাচের ক্লাসে। সেই আমার কলকাতায় নিয়মিত যাতায়াত শুরু। আমি হাওড়ার মেয়ে। মা পড়াতেন হাওড়ার একটা স্কুলে। সেখানেই পড়েছি টুয়েলভ পর্যন্ত। নাচের ক্লাসে ভর্তি হওয়ার পর থেকে প্রতি রবিবার কলকাতায় আসতাম বাবা মা’র সঙ্গে।

তখন হাওড়া থেকে কলকাতা আসা মানে তিন ঘণ্টার ধাক্কা। সেকেন্ড হুগলি ব্রিজ তো হয়নি তখনও। খুব জ্যাম হত। সেই সময় থেকেই আমার নাটক-সিনেমা দেখাও শুরু। বাবা মা দুজনেই খুব নাটক সিনেমা দেখতে ভালোবাসতেন। শুধু ভালোবাসতেন বললে ভুল হবে, অত্যন্ত রিলিজিয়াসলি দেখতেন, আলোচনা করতেন।

বালিগঞ্জে নাচের ক্লাস শেষ হওয়ার পর আমরা আকাদেমিতে নাটক দেখতে যেতাম। কখনও কখনও মেট্রো, গ্লোব বা নিউ অ্যাম্পায়ারে সিনেমা দেখতে নিয়ে যেত বাবা। ইংরেজি-হিন্দি সিনেমা দেখার শুরু কলকাতাতেই। বেশ মনে আছে মেট্রোতে ‘রোজা’ এসেছিল। বাবা আমাকে আর মাকে টিকিট কেটে দিয়েছিল। তখন আমি ক্লাস টেন।যাই হোক এইভাবেই আমার কলকাতার সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয় ইলেভেন থেকে। তখন বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় আসার অনুমতি মিলেছে। আকাদেমি নন্দন চত্বরে ঘণ্টার পর ঘন্টা আড্ডা, পেছনের ক্যান্টিন থেকে চপ, ফ্রাই, চা। আর রাত আটটা বাজলেই সরকারি বাস ধরে হাওড়ার পথে।

তখন রবীন্দ্রসদনে প্রায়ই আমাদের নাচের অনুষ্ঠান থাকত। সেই সময় আমার একজন অবাঙালি বয়ফ্রেন্ড ছিল। সে গ্রুপ থিয়েটারের ভক্ত ছিল। তাই নাটক দেখতাম প্রচুর। এইভাবে কলকাতাই শিখিয়েছিল অভিনয়কে ভালোবাসতে।

হঠাৎ একদিন শুনলাম বন্ধ হয়ে গেছে গ্লোব। খুব কষ্ট হল। নিউ অ্যাম্পায়ার, লাইটহাউজ, জ্যোতি, মেট্রো একে একে সব বন্ধ হয়ে গেল। খুব খারাপ লাগত। এখন কলকাতার প্রায় সব সিঙ্গল স্ক্রিন বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো আছে, ধুঁকছে। এগুলো কি কোনওভাবে রিভাইভ করা যায় না?

মেট্রোর মতো ঐতিহ্য আমাদের সংরক্ষণ করা উচিত ছিল, তাই না? তবে প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায় যখন কলকাতা পুরসভার মেয়র ছিলেন তখন স্টার থিয়েটারকে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন। স্টার থিয়েটার বাঙালির অভিনয়ের পীঠস্থান যে।

ফার্স্ট ইয়ারে পড়তে পড়তেই অতনুর সঙ্গে বিয়ে হল আমার। শ্বশুরবাড়ি বেহালা। সেই থেকে গত চব্বিশ বছর আমি বেহালাবাসী। চব্বিশ বছর আগে যখন বেহালায় এসেছিলাম, জায়গাটা ছিল গ্রাম্য, প্রায় জঙ্গলের মতো। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, টিমটিমে আলো, সমাজবিরোধীদের তাণ্ডব, দিনে এত জ্যাম যে কোনও ট্যাক্সি আসতে চাইত না বেহালায়।

‘৯৯-এ আমি ‘টাকা না সোনা’ করতাম। প্যাক আপ হত বেশ দেরিতে। অনেক গয়না থাকত সঙ্গে, তাই সবাই বেহালার মুচিবাজার দিয়ে ফিরতে বারণ করত।

মোটামুটিভাবে দু’হাজার সাল থেকেই বেহালার হাল ফিরতে শুরু হয়েছিল। আমাদের বাড়ির পাশে একটা ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবের ছেলেদের অভব্য আচরণ সহ্য করতে হত আমাদের পাড়ার সবাইকে। পাড়ায় দুর্গাপুজো শুরু হওয়ার পর থেকে অবস্থার বদল হল। আমি অভিনয় জগতে একটা জায়গা করে নেওয়ার পর ক্লাবের ছেলেদের অত্যাচার অনেকটা কমল। নতুন সরকার আসার পর আরও উন্নতি হয়েছে। এখন রাস্তায় আলো, সিসিটিভি ইত্যাদি থাকায় বেহালায় অরাজক পরিস্থিতি নেই বললেই চলে।

রাস্তা? আমি গত চব্বিশ বছর ধরে দেখছি বেহালায় উন্নয়নের কাজ চলছে। আজ এই রাস্তা ভাঙা, তো কাল ওই রাস্তায় পাইপ বসছে। পাইপ উল্টো বসল, আবার সোজা হল, মেট্রোর কাজ চলছে তো চলছেই, ব্রিজ ভেঙে পড়ল, নতুন ব্রিজ হল- কত  বলব! কাজও শেষ হয় না, সমস্যাও শেষ হয় না।
আর জল জমার সমস্যা তো বেহালার ক্রনিক অসুখ। আগের সরকারের আমলে যেমন নিকাশির জন্য বেশ কিছু কাজ হয়েছিল, এই সরকারের সময়েও কাজ হচ্ছে। কুড়ি বছর আগে যেমন একটু বৃষ্টি হলেই জল জমে ঘরবাড়ি ডুবে যেত, এখন ঠিক ততটা হয় না। কিন্তু বেহালার বেশ কিছু এলাকায় বৃষ্টির জমা জল দু’তিন দিন থাকে। আমার মায়ের ফ্ল্যাট পর্ণশ্রীতে। ওখানে তো এবার এত জল জমেছিল যে আমি ফেসবুকে ছবিও পোস্ট করেছিলাম।  আশা রাখি আগামীতে আরও উন্নততর নিকাশি ব্যবস্থা বেহালাকে জলমুক্ত করবে।

এবার আসি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য নিয়ে যতটা ব্যবসা হয় সেরকম কোথাও হয় না।বেসরকারি সুপার স্পেশালিটি হসপিটালে হয়তো খুব উন্নতমানের চিকিৎসা হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে তো সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। কোভিডের সময় দেখলাম আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলো খুব দায়িত্ব নিয়ে ভালো চিকিৎসা করছে।

ডাক্তারবাবুরা দিনরাত এক করে, নিজেদের জীবন বাজি রেখে চিকিৎসা করে গেছেন। বহু মরণাপন্ন মানুষ বেঁচে ফিরেছেন সরকারি হসপিটাল থেকে। প্রশাসন স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতিতে অনেকরকম প্রকল্প চালু করেছে। এটা ভালো পদক্ষেপ।
সব শেষে বলব, মানুষকেও সচেতন হতে হবে। শুধু প্রশাসনের পক্ষে কলকাতার উন্নতি করা সম্ভব নয়। আজকেই গঙ্গার ধারে একটা শ্যুটিং করছিলাম। দেখলাম একজন ভদ্রলোক আর তাঁর স্ত্রী কিছু একটা গঙ্গায় ভাসাতে এসেছেন। ভাসানোর পর প্লাস্টিকের প্যাকেটটা গঙ্গায় ফেলার জন্য কী চেষ্টা যে করছেন কী বলব! গার্ডের চোখ এড়িয়ে ফেলতে পারলেন না শেষ পর্যন্ত। এই যদি মানসিকতা হয় আমাদের, তাহলে কলকাতা কীকরে তিলোত্তমা হবে? তবে যে বদলটা হয়েছে গত কুড়ি বছরে, আর কোনও শহর এতটা বদলেছে কী!

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

You might also like