Latest News

মশা দিবসে কলকাতা ভুলে থাকল রোনাল্ড রসকে, মহানগরের সঙ্গে কী তাঁর সম্পর্ক

আকাশ ঘোষ

ম্যালেরিয়া রোগ যে মশা বাহিত হয়েই মানুষের শরীরে ঢুকছে তা তখন একপ্রকার নিশ্চিত ব্রিটিশ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী স্যর রোনাল্ড রস। কিন্তু কিছুতেই হাতেকলমে প্রমাণ মিলছে না। গবেষণায় বার বার ব্যর্থতা তাঁকে হতাশ করছে। নিজের কর্মস্থল সেকেন্দ্রাবাদের গবেষণাগারে বসে একের পর এক পরীক্ষা বিফল হচ্ছে। এর মাঝেই নানা স্থানে বদলি হন স্যর রোনাল্ড। পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে নিজেও ম্যালেরিয়া বাঁধিয়ে বসেন। হতাশার অন্ধকারে ডুবতে ডুবতে আলোর খোঁজ পান একদিন। নতুন উদ্যোমে শুরু হয় গবেষণা। স্যর রোনাল্ড তখন কলকাতার পিজি হাসপাতালে।

১৮৯৭ সাল। নিজের চেষ্টাতেই পিজি-তে বানিয়েছেন একটি ছোট ল্যাবরেটরি। সেখানে বসেই জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটা করে ফেলেন ব্রিটিশ চিকিৎসক। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার পাকস্থলীর দেওয়ালে খুঁজে পান ম্যালেরিয়ার পরজীবীদের। মশাই যে ম্যালেরিয়ার কারণ তা সদর্পে ঘোষণা করেন স্যর রোনাল্ড রস। সে দিনটা ছিল ২০ অগস্ট। তাঁর ইচ্ছাতেই প্রতি বছর এই ২০ অগস্ট দিনটি বিশ্ব মশা দিবস নামে পরিচিতি লাভ করে।

পিজি-তে স্যর রোনাল্ড রসের তৈরি ল্যাবরেটরিটি আজও আছে। এখন সেটি ম্যালেরিয়া ক্লিনিক হিসেবে নাম করেছে। ম্যালেরিয়া রোগ সম্পর্কিত যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা হয় সেখানে। সকাল ৮টা থেকে খুলে যায়। সারাদিন কাজ চলে। পিজি-র যে বিল্ডিংয়ে ল্যাবরেটরিটি রয়েছে সেখানে একসময় রোনাল্ড রস নিজে থাকতেন। ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজ করতেন। সেখানে এখনও তাঁর স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন সে কথা। এমনকী হাসপাতালের লোকজনও। শুক্রবার সেখানে হয়নি স্মরণ অনুষ্ঠানও।

২০০৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ওই বিল্ডিংটি সংস্কারের কাজ হয়।
ম্যালেরিয়ার পরজীবীদের খোঁজ পাওয়ার এই জার্নিটা বড় লম্বা ছিল। ইতিহাস অনেক ঘটনার সাক্ষ্মী দেয়। আগে মানুষ মনে করত ম্যালেরিয়া বুঝি খারাপ আবহাওয়ার কারণে ছড়ায়। ১৮৮০ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী আলফোনস ল্যাভেরানের আবিষ্কার করেন ম্যালেরিয়ার কারণ একধরনের প্যারাসাইট বা পরজীবী, তিনি একে ‘ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট’ নামে উল্লেখ করেন। কিন্তু এই পরজীবী কীভাবে মানুষের শরীরে ঢুকছে সে নিয়ে কোনও তথ্য দিতে পারেননি ফরাসি বিজ্ঞানী। বিশেষত, ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ানোর জন্য যে মশা দায়ী, সেটা প্রথম স্যর রোনাল্ড রসই বুঝতে পেরেছিলেন। পরজীবী মশার থেকে মানুষের শরীরে সংক্রামিত হচ্ছে, সেটা প্রমাণ করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল।

সেকেন্দ্রাবাদের বেগমপেট হাসপাতালে দু’বছর ধরে লাগাতার চেষ্টা করেও মশার শরীরে ম্যালেরিয়ার পরজীবীর হদিশ পাননি স্যর রোনাল্ড রস। নানা রকম মশা নিয়ে তাদের ব্যবচ্ছেদ করে মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে চলছিল গবেষণা। দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্ম একদিনও ছুটি নেই বিজ্ঞানীরা। এমনও শোনা যায়, ভ্যাপসা গরমের দিনে পাখা বন্ধ করে কাজ করতেন তিনি। কারণ পাখার হাওয়ায় মশা উড়ে যাবে, তাই দরদর করে ঘামতে ঘামতেই গবেষণায় মগ্ন থাকতেন স্যর রোনাল্ড। খেতে-ঘুমোতেও ভুলে যেতেন প্রায়ই। এইভাবেই চলছিল, কিন্তু সাফল্য আসছিল না কিছুতেই। কোথাও যেন একটা খামতি থেকে যাচ্ছিল। বিজ্ঞানী বুঝতে পারছিলেন, তিনি যে প্রজাতির মশাদের নিয়ে কাজ করছেন, তারা কেউই ম্যালেরিয়ার বাহক নয়। তাই ভুলটা হচ্ছে বারে বারেই।

এর মধ্যেই স্যর রোনাল্ড নানা জায়গায় বদলি হন। পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন, ফের ফিরে আসেন সেকেন্দ্রাবাদে। একদিন স্যর রোনাল্ডের সহকর্মীরা বেশকিছু মশার লার্ভা ধরে আনেন। সেগুলি পূর্ণাঙ্গ হলে বিজ্ঞানী দেখতে পান এই মশাগুলির ডানায় বিন্দু বিন্দু ছোপ রয়েছে। পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে যে ধরনের মশার কামড় খেয়ে তিনি ম্যালেরিয়া বাঁধিয়েছিলেন, তার সঙ্গে এগুলির বিস্তর মিল। উল্লসিত হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানী। এই মশাগুলির ব্যবচ্ছেদ করে পরীক্ষা শুরু করে দেন। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত বিভিন্ন রোগীদের পয়সার বিনিময়ে মশার কামড় খাওয়াতে রাজিও করান স্যর রোনাল্ড।

এর মধ্যেই কলকাতায় বদলি হন তিনি। পিজি-তে নিজের উদ্যোগেই তৈরি করেন গবেষণাগার। সেখানে ফের চলতে থাকে পরীক্ষা। মহম্মদ বক্স নামে একজনকে কাজে বহাল করেন যিনি নানা জায়গা থেকে মশা ধরে এনে গবেষণার কাজে সাহায্য করতেন। এভাবেই গবেষণা করতে করতে আসে সেই ২০ অগস্ট। সকাল থেকেই ছোপ ছোপ ডানাওয়ালা মশার শরীরে ব্যবচ্ছেদ করে চিন্তামগ্ন ছিলেন বিজ্ঞানী। হঠাৎই তিনি আবিষ্কার করেন এই মশাগুলোর পাকস্থলীর জলকোষে এক ধরনের দানাদার কালচে রঞ্জক পদার্থ রয়েছে যার সঙ্গে ম্যালেরিয়ার পরজীবীদের মিল রয়েছে। অর্থাৎ তিনি বুঝতে পারেন এই ছোপযুক্ত ডানাওয়ালা মশা বা স্ত্রী অ্যানোফিলিসদের পাকস্থলীর দেওয়ালেই বাসা বাঁধে ম্যালেরিয়ার পরজীবী প্লাসমোডিয়াম। মশা কামড়ানোর সময় লালার মাধ্যমে পরজীবী ঢুকে পড়ে মানুষের শরীরে। এই আবিষ্কারের জন্য ১৯০২ সালে নোবেল পুরস্কার পান স্যর রোনাল্ড রস।

বিশ্ব মশা দিবসের সূচনা তো হল, কিন্তু মশাবাহিত রোগ নিয়ে আমরা এখনও সচেতন নই। ম্যালেরিয়ার পরজীবীদের জীবনচক্র পরে আবিষ্কার করা হয়। কীভাবে মশার শরীর থেকে পরজীবী মানুষের শরীরে ঢুকে সংক্রমণ ছড়ায় তারও অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে। মশা কামড়ালে তার লালার সঙ্গে শরীরে ঢোকে ম্যালেরিয়ার বাহক এককোষী জীব বা প্রোটোজোয়া প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম। তার প্রথম নিশানা হয় শরীরের বিভিন্ন কোষ। এদের তিনটে জীবন চক্রের একটা হয় মশার শরীরে। বাকি দু’টো আমাদের শরীরে। মানুষের দেহে একবার ঢুকে পড়লে এরা লিভার ও লোহিত কণিকায় এদের বাকি দু’টো জীবনচক্র সেরে ফেলে।

এ বছর বিশ্ব মশা দিবসের থিম ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গি তথা মশাবাহিত রোগ থেকে মুক্তি। স্যর রোনাল্ড রসও এটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু মশার থেকে অব্যাহতি মিলেছে কোথায়? তার জন্য মানুষের সচেতনতার অভাবই দায়ী। গত দুবছরে করোনার কারণে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ নিয়ে প্রচার-প্রসার সবই পিছনের সারিতে চলে গেছে।

You might also like