Latest News

গানে গানে সন্ধ্যার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করলেন চার মহিলা পুরোহিত, অনন্য নজির গীতশ্রীর পরিবারে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘বলে আয়রে ছুটে, আয়রে ত্বরা
হেথা নাইকো মৃত্যু, নাইকো জরা…
হেথা বাতাস গীতি-গন্ধভরা
চির- স্নিগ্ধ মধুমাসে
হেথা চির-শ্যামল বসুন্ধরা
চির-জ্যোৎস্না নীল আকাশে
ঐ মহাসিন্ধুর ওপার থেকে
কী সঙ্গীত ভেসে আসে।’

বারোয়ারি দুর্গাপুজো থেকে বিয়ে, সবেতেই আজকাল এগিয়ে এসেছেন নারী পুরোহিতেরা। পুরুষ আধিপত্যের এই ভাঙন বাঙালি মননে নবজাগরণ ঘটাচ্ছে। এবার মহিলা পুরোহিতরা শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করলেন খোদ গীতশ্রীর পরিবারে। গীতশ্রী সন্ধ‍্যা মুখোপাধ্যায়ের পারলৌকিক ক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে আজ সম্পন্ন করলেন চার মহিলা পুরোহিত। নন্দিনী ভৌমিক, রুমা রায়, সেমন্তী ব‍্যানার্জি এবং পৌলমী চক্রবর্তী করলেন সুরসাধিকার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। আদি প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তে অভিনব রীতিতে গানে গানে হল শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান।সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বলে গেছিলেন তাঁর নিপাট শান্ত জীবনের মতোই তাঁর পারলৌকিক কাজ যেন খুব নিরাভরণভাবেই হয়। কোনও ঘটা হোক তিনি চাননি।
তাই আজ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের লেক গার্ডেনসের বাড়িতে মহিলা পুরোহিতদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হল গানে গানে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান। সুরসাধিকার অন্তিম কাজ কি গান ছাড়া হতে পারে? তাই গানে গানেই সুরের দেবীকে জানানো হল শ্রদ্ধা।মায়ের পারলৌকিক কাজের সব দায়দায়িত্ব শেষ করে সন্ধ্যা-কন্যা সৌমি সেনগুপ্ত দিনের শেষে খানিকটা পরিশ্রান্ত। মায়ের কাজ কীভাবে সম্পন্ন হল সে কথাই ‘দ্য ওয়াল’কে জানালেন সৌমি, “মহিলা পুরোহিতরাই তাঁর শ্রাদ্ধ করুক তেমন কিছু নির্দেশ মায়ের ছিল না। তবে মা আর গান তো একে অন্যের পরিপূরক। আমাদের তাই ইচ্ছে ছিল মায়ের কাজ গানের মধ্যে দিয়ে, পাঠের মধ্যে দিয়ে হোক। চার মহিলা পুরোহিত যেভাবে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করলেন সেটা অনবদ্য। আমরা খুব শান্তি পেয়েছি। নন্দিনী দেবীরা যে সংস্কৃত স্তোত্রটা পাঠ করছেন তার বাংলা অনুবাদটাও আমাদের শুনিয়ে দিচ্ছেন। খুব সুন্দর করে হোম করলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে ওঁরা খুব সুন্দরভাবে মায়ের কাজ করলেন। এটা যেহেতু পারলৌকিক অনুষ্ঠান, তাই ওঁরা মায়ের কোনও গান গাননি। ওঁদের যা রীতি তাই করেছেন। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে বেদ, উপনিষদ আর গীতা থেকে স্তোত্রপাঠ করলেন মহিলা পুরোহিতরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দর লেখা থেকেও উদ্ধৃত ছিল কিছুটা। তিল জল অর্পনের ব্যবস্থাও এই রীতিতে বেশ অভিনব। মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র ওঁরা বারবার উচ্চারণ করছিলেন, সেইসময় যারা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা সবাই পুষ্পার্ঘ্য দিয়েছেন। খুবই সুন্দর হয়েছে।মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার মাকে দিদির মতো ভালোবাসতেন। নানা ব্যস্ততায় উনি আসতে পারেননি, কিন্তু পুষ্পস্তবক পাঠিয়েছেন আজ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় মেয়র ববি হাকিম, মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, মালা রায়, নির্বেদ রায় ও দেবাশীষ কুমার প্রমুখ। আর শিল্পীদের মধ্যে মাকে যারা ভালবাসতেন সবাই এসেছিলেন।”সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় চিরকাল অন্তরালে থাকাই পছন্দ করতেন। নির্জনে সঙ্গীত সাধনাতেই তিনি ব্রতী ছিলেন সারা জীবন। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জীবনীকার সুমন গুপ্তর কলমে উঠে এসেছে বারবার সেসব অকথিত কথা। সুমন গুপ্ত তাঁর সন্ধ্যাদিকে যেমন কাছ থেকে দেখেছেন তেমনই আজ উপস্থিত ছিলেন সন্ধ্যাদির পারলৌকিক কাজে।সুমন্ত গুপ্ত ‘দ্য ওয়াল’-কে জানালেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে আজকের বেশ কিছু মুহূর্ত “আজ সন্ধ্যাদির লেক গার্ডেন্সের বাড়িতেই ওঁর পারলৌকিক ক্রিয়া হয়েছে। সন্ধ্যাদি একবার ওঁর মেয়ে জামাইকে বলেছিলেন যে ওঁর পারলৌকিক ক্রিয়ায় কোনও বড় অনুষ্ঠানের দরকার নেই। গানে গানে পারলৌকিক কাজ হলেই ভালো। সন্ধ্যাদির দোতলা বাড়ির ছাদে ফুল দিয়ে ওঁর ছবি সাজানো হয়েছিল। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় যে ঘরে ঘুমোতেন, সেই শোবার বিছানায় ওঁরই আশি বছরের পুরনো তানপুরা রেখে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল। ঐ তানপুরা যেন সন্ধ্যার ছায়া। ঐ তানপুরাতেই লেগে আছে সুরসাধিকার স্পর্শ। আশি বছর ধরে ওই তানপুরাতে বহু উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উনি গেয়েছেন। বিভিন্ন কনফারেন্সে তানপুরাটি ব্যবহার করেছেন। সন্ধ্যাদির খুব প্রিয় তানপুরা। ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ, আমির খাঁর মতো বহু সঙ্গীত দেবতার হাত পড়েছিল এই তানপুরাতে। সন্ধ্যাদি ওঁদের শিষ্যা ছিলেন। সন্ধ্যাদির শোবার খাটে তানপুরা আর ওঁর ছবির সঙ্গে আজ রাখা হয়েছিল ওঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী রেডিও আর ক্যাসেট রেকর্ডারটিও। ফুল দিয়ে সাজানো হয় সবকিছু।সন্ধ্যাদির বাড়িতে ঢুকতেই একতলার ঘরটিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও ওঁর স্বামী প্রয়াত গীতিকার শ্যামল গুপ্তর ছবি রাখা হয়েছিল। মহিলা পুরোহিত অধ্যাপিকা নন্দিনী ভৌমিক ও তাঁর সম্প্রদায় সমগ্র শ্রাদ্ধানুষ্ঠান অভিনব রীতিতে সম্পন্ন করেন।
সারা বাড়িতে ধীর লয়ে বাজছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের পুরনো দিনের ভালো ভালো গান। ওই গানই সন্ধ্যাদির উপস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছিল যেন। রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীদের পাশাপাশি সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সৈকত মিত্র, অরুন্ধতী হোমচৌধুরী, শিবাজি চট্টোপাধ্যায়, মনোময় ভট্টাচার্য, অনুপম রায় প্রমুখ।”

আর সন্ধ্যা-কণ্ঠ বললেই বাঙালিদের যে নায়িকার মুখ মনে পড়ে তিনি হলেন সুচিত্রা সেন। সুচিত্রা সেনের পরিবারের কেউ কি উপস্থিত ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অন্তিম কাজে?

সুচিত্রা-কন্যা মুনমুন সেন মায়ের গলা খুঁজে পেতেন সন্ধ্যা-কণ্ঠেই। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে ‘সন্ধ্যামাসি’ বলে ডাকতেন মুনমুন। আজ কর্তব্যপরায়ণা মুনমুন সেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে আসেন।  সন্ধ্যা-অনুরাগী জনসাধারণের জন্য আজ খুলে দেওয়া হয়েছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের বসতবাড়ির দরজা।

You might also like