Latest News

Kerala: আজ কেরলে শুরু সিপিএমের পার্টি কংগ্রেস, সঙ্গী বিতর্কিত কে-রেল, কী সেটা?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটি রেল প্রকল্প নিয়ে কেরলে (Kerala) বাংলার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের ছায়া ক্রমশ দীর্ঘায়িত হচ্ছে বেশ কিছুদিন হল। কেরলের সিপিএম সরকার (Pinarai Vijayan) ওই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করতেই পথে নেমেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং নাগরিক সমাজের বিশিষ্টরা। আজ বুধবার সেই কেরলেরই কান্নুরে শুরু হচ্ছে সিপিএমের (CPM) পাঁচ দিনের পার্টি কংগ্রেস। আজ পার্টি কংগ্রেসের উদ্বোধন করবেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি (Sitaram Yechury)। মঙ্গলবার দুপুরে কান্নুরে পৌঁছেছেন সীতারাম।

এই সন্ধিক্ষণে তাঁর হাতে পৌঁছেছে একটি চিঠি। যার বিষয় অত্যন্ত অস্বস্তিকর, তাই-ই শুধু নয়, পার্টি কংগ্রেসের মুখে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলেছে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এবং কেরল পার্টিকে।

k rail

চিঠির বিষয় সিলভার লাইন রেল প্রকল্প এবং প্রেরক কেরলের বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস নেতা ভিডি শথীসন। প্রকল্পটি কে-রেল নামেও পরিচিত। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদককে লেখা চিঠিতে কংগ্রেস নেতা বলেছেন, যে রেল প্রকল্প নিয়ে কেরলের বাম সরকার মাতামাতি করছে, তা রাজ্য সিপিএমের জন্য ওয়াটার লু হতে চলেছে। বাংলার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ টেনে তিনি লিখেছেন, ওই একই কায়দায় কেরলে রেল প্রকল্পের জন্য জমি নেওয়া হচ্ছে জোর করে। প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে।

kerala

এখানেই থামেননি কেরলের কংগ্রেস নেতা তথা বিরোধী দলনেতা। রাজ্যের পিনারাই বিজয়ন সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের তুলনা টেনে সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেছেন, সিপিএম এই রেল প্রকল্প নিয়ে অতি ডানপন্থী দলের মতো আচরণ করছে। জনমতকে কোনও গুরুত্ব দিচ্ছে না। নরেন্দ্র মোদীর সরকারের মতো উন্নয়ন চাপিয়ে দিচ্ছে। সীতারামকে তাঁর প্রশ্ন, আপনার পার্টি মহারাষ্ট্রে মুম্বই-পুনে হাই স্পিড রেল প্রকল্পের বিরোধিতা করছে, অথচ, তিরুবনন্তপুরম-কাসারগড় রেল প্রকল্প নিয়ে জেদ ধরেছে। এটা কোন ধরনের নীতি। কংগ্রেসের দাবি, ওই রেল প্রকল্পের টাকা জোগাতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে কেরল। কারণ, এমনিতেই সরকার ঋণভারে জর্জরিত।

মাস কয়েক আগে তিরুবনন্তপুরমে মেধা পাটেকরের নেতৃত্বে পরিবেশ এবং নাগরিক আন্দোলনের বিশিষ্টরা পদযাত্রা করেন কেরলের বাম সরকারের বহু চর্চিত ও বিতর্কিত রেল প্রকল্পটি নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের উদ্দেশে খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

পিনারাই বলে দিয়েছেন, কোনও অবস্থাতেই ওই রেল প্রকল্প থেকে সরে আসার প্রশ্ন নেই। রাজ্যের স্বার্থে ওই প্রকল্প হাতে নিয়েছেন তিনি। বিরোধীদের সর্বদলীয় বৈঠকের প্রস্তাবও খারিজ করে দিয়েছেন। মাস কয়েক আগে কয়েকজন বিশিষ্টজনকে ডেকে কথা বলেন পিনারাই। কংগ্রেসের অভিযোগ, তাঁরা সব মার্কামারা সিপিএম বুদ্ধিজীবী।

kerala

মুখ্যমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের জবাবে কংগ্রেস ঘোষণা করেছে সরকার পিছু না হঠলে জমি অধিগ্রহণের জন্য পোঁতা পিলার তারা উপড়ে ফেলার ডাক দেবেন। সরকার ও বিরোধীদের এই সংঘাত ঘিরে কেরলের ওই প্রকল্পে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলনের ছায়াই ক্রমশ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই যেন বাংলায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং সিঙ্গুরে টাটার ন্যানো কারখানা, নন্দীগ্রামে সালিমদের কেমিক্যালস হাব নিয়ে ধরেছিলেন বুদ্ধদেব। শিল্পায়নের হাত ধরে নতুন বাংলা গড়ার স্বপ্নপূরণে বুদ্ধদেববাবুর জেদি অবস্থানের সঙ্গে হুবহু মিল পাওয়া যাচ্ছে কেরলের সিপিএম মুখ্যমন্ত্রীর কথাবার্তায়।

বুদ্ধদেববাবুর মতো পিনারাইও দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। কেরলের সিপিএমের একাংশের মতে, মালয়ালি মুখ্যমন্ত্রী কেরলের নব রূপকার হিসাবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন। তাঁর পার্টিও নব-কেরল তৈরির কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দলের রাজ্য সম্পাদক কোডিয়ারী বালাকৃষ্ণনের দাবি, ওই রেল প্রকল্পের হাত ধরে বদলে যাবে কেরলের অর্থনীতি।

প্রকল্পের সমর্থনে কেরল সরকারের দাবি, তিরুবনন্তপুরম থেকে কাসারগড় যেতে এখন দশ ঘণ্টা সময় লাগে। নতুন লাইন রেল চালু হলে চার ঘণ্টায় পৌঁছনো যাবে।

তবে বিরুদ্ধ বক্তব্য আছে দলেও। সিপিএমের বেশ কয়েকটি জেলার সম্মেলনে কমরেডরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গ টেনে রেল প্রকল্পটি বাতিলের দাবি তুলেছেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ভুল নিয়ে পার্টি দলিলের কপি কমরেডদের হোয়াটসঅ্যাপে ঘুরেছে। পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষে প্রায় ৮০০ প্রতিনিধি আজ থেকে কেরলে থাকছেন। সেখানে রাজ্যের এলডিএফ সরকারের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই কে-রেল নিয়ে ব্যাখ্যা দেবেন, মনে করা হচ্ছে।

কেরলের ওই রেল প্রকল্পটির নাম সিলভার লাইন। ৫২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি তৈরি হওয়ার কথা তিরুবমন্তপুরম থেকে কাসারগড় জেলা পর্যন্ত। আধুনিক এই রেল চলবে ঘণ্টায় দুশো কিলোমিটার গতিতে। প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। যদিও ২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরে প্রকল্প শেষের সময় খরচ প্রায় এক লাখ কোটি দাঁড়াবে বলে মনে করছে নীতি আয়োগ। এই রেল প্রকল্পের সঙ্গে ভারতীয় রেলের কোনও সম্পর্ক নেই। নীতি আয়োগ প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করেছে মাত্র। কেরল সরকার ভারতীয় রেলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ‘কে-রেল’ নামে একটি কোম্পানি গড়ে তুলেছে। সেই কোম্পানিকে সিলভার লাইন নামের রেল প্রকল্পটির বরাত দেওয়া হলেও খরচের সিংহভাগই বহন করবে জাপানি সংস্থা জাইকা।

প্রকল্পটি নিয়ে আপত্তির কারণ কী (Kerala)?

মূলত দুটি কারণ। এক, কেরলের আর্থিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। করোনাকালে আরও খারাপ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বহু মানুষ কাজ হারিয়ে রাজ্যে ফেরৎ আসায়। এই অবস্থায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা চড়া সুদে ধার নিয়ে এই প্রকল্পে ঢাললে কল্যাণ প্রকল্পগুলিতে অর্থের টানাটানি হবে।

দুই, বিপন্ন হবে পরিবেশ। অন্যান্য রেলের তুলনায় এই প্রকল্পে জমি বেশি লাগবে। কারণ, রেল পথের দু-পাশে থাকবে উঁচু ফেন্সিং। যাতে কেউ রেলপথে ঢুকে পড়তে না পারে। তাছাড়া প্রায় অর্ধেক রেলপথ হবে এলিভেটেড করিডোর। সেই কারণেও বাড়তি জমি দরকার। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমি নেওয়া হবে।

সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ রাজ্য হওয়ার কারণে কেরলে ফাঁকা জমি কম। সেখানে একটি প্রকল্পের জন্য এত বিপুল পরিমাণ জমি নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনেকেই বিস্মিত। কারণ, প্রস্তাবিত রেল পথের মধ্যে চাষের জমি, বনাঞ্চল, জলাজমি, জনবসতি, হাট-বাজার এমনকী বড় বাজার-হাটও পড়েছে। বিস্তীর্ণ রেল পথ বসবে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পাদদেশে। ফলে পরিবেশের বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তিন, কয়েক হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হবে। নীতি আয়োগের হিসাব অনুযায়ী, জমির জন্য খরচ হবে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্যে এত পরিবারের পুনর্বাসনের জায়গা মিলবে কীভাবে?

You might also like