Latest News

Joy Bangla: ‘জয় বাংলা’ ওপারে জাতীয় স্লোগান হতেই সমালোচনার ঢেউ, এপারে তৃণমূলের মুখে মুখে

অমল সরকার

গত পরশু বৃহস্পতিবার বালিগঞ্জের উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয় সমর্থনে মল্লিকবাজারের জনসভায় দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষণ শেষ করেছেন ‘জয় বাংলা’ (Joy Bangla) বলে। একবার নয়, টানা বারো-তেরো বার ‘জয় বাংলা’ বলেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক। গত বছর বিধানসভা ভোটের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণে ‘খেলা হবে’ আর ‘জয় বাংলা’ শব্দ দুটির ব্যবহার নয়া মাত্রা দিয়েছিল। সেই থেকে এ রাজ্যে শব্দটি তাদের, একান্তে দাবি করে থাকেন অনেক তৃণমূল নেতাই।

রাজনীতিতে দুটি শব্দেরই ব্যবহার শুরু বাংলাদেশে। তারমধ্যে ‘জয় বাংলা’ শব্দটি রাজনীতিতে প্রথম শোনা গিয়েছিল স্বয়ং সে দেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রমমানের মুখে। কবি নজরুল ইসলামের কবিতা থেকে ধার নেওয়া ওই শব্দ দুটি তিনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘বন্দেমাতরম’ যেমন বহু তরুণ-যুবকে পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনে ব্রিটিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সেই ভূমিকাই ছিল ১৯২২ সালে নজরুলের লেখা ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় ব্যবহৃত ‘জয় বাংলা’ (জয় বাংলা পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ! জয় যুগে যুগে আসা সেনাপতি জয় প্রাণ আদি অন্তহীন!) ওই শব্দ দুটি। যা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালা বদলে সে দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৯৬৯ সালে মুজিবুর প্রথম ঢাকার পল্টন ময়দানের সভায় ‘জয় বাংলা’ বলে ভাষণ শেষ করেন।

সে দেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ এবং শেখ মুজিবুরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ‘জয় বাংলা’-কে জাতীয়  স্লোগান ঘোষণা করেছে। সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, সাংবিধানিক পদাধিকারী ব্যক্তি, রাষ্ট্রের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাষ্ট্রীয় বা সরকারি অনুষ্ঠান শেষে ‘জয় বাংলা’ বলবেন। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমায়েত, সভা-সমিতির ক্ষেত্রে এই স্লোগান বলতে হবে।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দিন কয়েক আগে বাংলাদেশ সংসদে মুজিব কন্যা তথা দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাশ করা হয়। সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় অংশ নিলেও বিরোধী দল বিএনপি সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি তথা সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সে দেশে সরকারিস্তরে জয় বাংলা স্লোগানের ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আনেন নতুন স্লোগান ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার বহু বছর পর তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শব্দ যুগলকে সরকারি নথিপত্রের অর্ন্তভুক্ত করেন।

বিএনপি বিরোধীদের অভিযোগ, জিয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। এর পিছনে পাকিস্তানের মদত ছিল। তাঁর লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধর ইতিহাসকে নস্যাৎ করা। যদিও জিয়া নিজেও মুক্তি যুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।

‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে সংসদের আলোচনায় মুজিব কন্যা বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জাতির পিতার হত্যার ষড়যন্ত্রে জিয়াউর রহমানও যুক্ত ছিলেন। এই মন্তব্যে সংসদ তোলপাড় হলে বিএনপি সাংসদ হারুনুর রশিদ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে জাতীয় স্লোগান করাতে আপত্তি তুলে বলেন, এ দেশের সব রাজনৈতিক দল, যারা স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল তাদের অনেকেই ‘জয় বাংলা’ বলে না। যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে, মেহনতি মানুষের লড়াইয়ে বিশ্বাস করে, তারা কখনই এই শব্দ মুখে আনে না। তাহলে কী করে ‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান হতে পারে! তাঁর আরও বক্তব্য, বাংলাদেশ সংসদেই বরং শেখ মুজিবুর রহমান একাধিকবার ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ কথাটি বলেছেন।

বিএনপি দলগতভাবে তাদের বক্তব্য স্পষ্ট না করলেও নেতারা বলছেন, সরকার চলতি সমস্যা থেকে মুখ ঘুরিয়ে দিতে ‘জয় বাংলা’ বড়ি গেলানোর চেষ্টা করছে। দেশের নাম বাংলাদেশ। তাই ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’-ই উপযুক্ত। শুধু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নয়, আরও অনেক শিবির সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত নয়। তবে আওয়ামি লিগের লোকজনের বক্তব্য, ‘জয় বাংলা’ ইতিহাসের অংশ। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত রবীন্দ্রনাথের গান। আমাদের জাতীয় স্লোগান নজরুলের কবিতার অংশ। এটাই বাংলাদেশ।

You might also like