Latest News

ঝুলন আপনি শুধু ক্রিকেটার নন, আপনি একজন জাতি, সমগ্র দেশের প্রেরণার নাম

অনিন্দিতা সর্বাধিকারী

লর্ডসে (Lords) ঝুলন গোস্বামীর (Jhulan Goswami Story) অবসর এক মাইলস্টোন, একটা ইতিহাস। এমন স্বপ্নে হয়, গল্পের বইয়ে হয়। বাস্তবে এমন চিত্রনাট্য লিখতে গেলে কলজে লাগে। নদীয়ার চাকদহের (Chakdaha Express) এক গ্রাম থেকে উঠে এসে একজন ক্রিকেটার মহিলা ক্রিকেটকে (Women Cricket) তুলে ধরলেন। নিজের দেশকে এক অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, এগুলি ভাবলেই এক রোমাঞ্চ বোধ হয়, ভাল লাগা শুরু হয়।

শেষ ম্যাচে ব্যাটে হয়তো শূন্য করলেন, কিন্তু দিনের শেষে হাতে দুই উইকেট। বিপক্ষ দলের ক্রিকেটারদের কাছে ‘গার্ড অব অনার’ পাওয়া, নিজের দলের সতীর্থদের কাঁধে চেপে ভালবাসার স্রোতে গা ভাসানো, সব দেখে মনে হয় ঝুলন আমাদের কাছে হিরো নন, সুপার হিরো।

লন্ডনে ভারতীয় দলের হোটেল থেকে চুরি তারকা ক্রিকেটারের টাকা, ঘড়ি, কার্ড, গয়নাও

অনেকেই দেখছি, মহিলা ক্রিকেট বলেই ঝুলনের কৃতিত্বকে ছোট করে দেখার প্রয়াস নিচ্ছেন। এমনটি হওয়া উচিত নয়, এই সমস্যা আমাদের সমাজের। আমরাই মেয়েদের ভয়কে এগিয়ে দিতে সাহায্য করেছি, তাদের পিছনে টেনে আনার চেষ্টায় থাকি। পুরুষদের সঙ্গে তুলনা, কিংবা সামাজিক নানা রোগ হীনমন্যতায় ভুগতে বাধ্য করে মেয়েদের।

আরতি সাহার ইংলিশ চ্যানেল পেরনো কিংবা ঝুলনের এই অসামান্য কীর্তিমালা সম্পর্কযুক্ত করার চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক, আমাদের সমাজ বদল। আমাদের দেখার চোখ বদল। সমাজের বিবর্তনের পথ ধরেই মহিলাদেরও দৃষ্টিভঙ্গী বদলেছে। কেউ আর ঘরে বসে থাকতে চায় না, কেউ কিছু না কিছু করে নিজের পায়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চাইছে।

সমাজ মানেই শালগ্রাম শিলা, এটা তো নয়। নারায়ণ পুজোর আগে সিংহাসনে শালগ্রাম শিলা বসিয়ে দিলাম, এমন কোনও বিষয় নয়। সমাজ এগিয়েছে বলেই, উদার হয়েছে বলেই আমি একটা স্পার্ম কিনে সন্তান ধারণ করতে পেরেছি। সেইসময় এই সমাজই আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি যেমন ভালবাসা পেয়েছি, তেমনি আমার সন্তানকেও ভালবাসার পরশে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাই ইতিবাচক মানসিকতা সবর্দা জরুরী আমাদের কাছে, আর সেটাই আমাদের কাম্য।

আমাদের বাঙালি মানসিকতা অনেকটাই উন্নত। সেখানে উত্তর ভারতের কিছু রাজ্যে তো মেয়েদের ভ্রনেই হত্যা করা হচ্ছে। তাকে জন্মানোর অধিকারই দেওয়া হচ্ছে না। তা হলে আমাদের সমাজে নারীদের অবস্থায় কোথায়! জন্মানোর পরে তো, সে ঝুলন হবে না, আরতি সাহা হবে, সেটি তো পরের বিষয়।

আমার কাছে সন্তান ধারণ যেমন একটা জয়, তেমনি ঝুলনের কাছে ২০০ উইকেট প্রাপ্তি একটা জয়, আবার অন্য মহিলার কাছে অন্য সাফল্য একটা জয়, এভাবেই সমাজের দেওয়ালগুলি ভাঙবে, চারিপাশের সমাজটা বদল হবে। আমরা কেন ভাবি না একটা গ্লাসের অর্ধেকটা খালি, এটাও তো ভাবতে পারি, গ্লাসের অর্ধেকটা তো ভর্তিও। নেতিবাচক মানসিকতা ঝেড়ে না ফেলতে পারলে প্রতিদিন জেতার বদলে হারতে থাকব।

একটা কথাই ভাবি চাকদহ থেকে গিয়ে ঝুলন যে স্বপ্নটা দেখালেন, তাতে হাজার হাজার ঝুলনের স্বপ্নটা জাগ্রত হল। তিনি একটা জাতি হয়ে প্রেরণা দিলেন সকলকে। গ্রামের একটা মেয়েও ভাববে আমিও পারব। এটাই তো মাঠের বাইরের জয়। হয়তো ঝুলনের মতো কষ্ট করে তাকে উঠতে হবে না, কিন্তু জেদটা তিনি উসকে দিয়েছেন।

আর ভারতের মহিলা ক্রিকেটাররাও খুব বেশি অবহেলিত। বিরাট কোহলি, রোহিতদের যেভাবে দেখা হয়, সেই আলো কখনই পড়ে না ঝুলন, মিতালিদের ক্ষেত্রে। এই তারতম্য তৈরি করছে আমাদের বোর্ড, কর্তারাও। সব সুযোগ সুবিধায় বঞ্চিত হন মহিলা ক্রিকেটাররা। এটা কেন হবে? আমরা সফল হওয়ার পরে হইচই করি, কিন্তু রাষ্ট্র কিংবা রাজ্য কী ভাবতে পারে না, নুন্যতম পরিকাঠামো তৈরি হোক খেলাধুলোর।

মহিলা ক্রিকেটে সেইভাবে বিনিয়োগ নেই, মহিলাদের ক্রিকেট অ্যাকাডেমি আদৌ রয়েছে কিনা আমার জানা নেই। তা হলে আমরা শুধু সাফল্যের জন্য বসি থাকি কেন? ঘরে ঘরে সবাই শচীন-সৌরভ হতে চায়, আমরা কেন পারি না ঘরে ঘরে তৈরি হোক ঝুলন কিংবা মিতালি, হরমনপ্রীতরা, আমরা সেইভাবে ভাবি না, ভাবাই না।

আমাদের দেশে সেই সিস্টেমটা নেই, প্রচারটা নেই। দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা কোনও মেয়ে ক্রিকেট খেলার সুযোগটাই পেল না, তা হলে আমরা কেন দ্বিতীয় ঝুলন হওয়ার স্বপ্ন দেখব। খেলা এগোয় অংশগ্রহণে, সুযোগ সুবিধায়।

ঝুলন এমন একটা শহর থেকে উঠে এসেছে, যেখানে প্রতিনিয়ত তাঁকে শুনতে হয়েছে তিনি মহিলা ক্রিকেটের সৌরভ। তিনি নিজের স্বকীয়তা প্রমাণের চেষ্টা করেও দাঁড়িপাল্লায় দাঁড়াতে হয়েছে, এটাও তো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সেটিও ঝুলন পেরিয়েছেন। তিনি কাঁধে কাঁধ রেখে লড়াই করেছেন।

একটা রাষ্ট্রের উচিত ভাল পরিকাঠামো দেওয়া। আমার বেশ মনে রয়েছে, আমার এক পরিচিত জাতীয় স্তরের দক্ষ মহিলা জিমনাস্ট ছিলেন, তিনি অলিম্পিক কিংবা এশিয়ান গেমসে গিয়ে পদক আনতেই পারতেন। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন দিনের আলোই দেখেনি, শুধুমাত্র পরিকাঠামোজনিত সমস্যার জন্য। তিনি শুধু কাস্টমসে চাকরি পেয়েছেন, এটাই তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ পাওয়া।

তাই আরও ঝুলন গড়ে তোলার জন্য স্কুল স্তরেও খেলার অংশগ্রহণ চাই, আর উৎসাহ চাই। না হলে আমাদের প্রাপ্তির ভাঁড়ার শূন্যই হতে থাকবে!

(লেখিকা নামী চিত্র পরিচালক ও নাট্যকর্মী)

You might also like