Latest News

দুটি হাত নেই, পায়ে লিখেই ভবিষ্যৎ গড়েন বর্ধমানের শিক্ষক জগন্নাথ

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান:‌ দুটি হাতই নেই। সম্বল পা। আর তা দিয়েই অনুপ্রেরণার গল্প বলছেন জগন্নাথ। তাঁর লড়াইয়ে মুগ্ধ সকলে। পা দিয়েই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন স্বপ্ন, গড়েন ভবিষ্যত। বাস্তবের এই জগন্নাথকে নিয়ে মুগ্ধ পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম। যতই প্রতিবন্ধকতা থাকুক, দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় এবং আন্তরিক চেষ্টায় জগন্নাথবাবু (Jagannath Bauri) হয়ে উঠেছেন অপরাজেয়। শুধু শিক্ষকতা নয়, তিনি সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছেই দৃষ্টান্ত।

জয়কৃষ্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক জগন্নাথ বাউড়ি প্রমাণ করে দিয়েছেন, প্রতিবন্ধকতা শরীরে নয়, লুকিয়ে থাকে মনে ও সমাজে। তিনি দেখিয়েছেন, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে জয় করা যায় সব প্রতিবন্ধকতাকে। অত্যন্ত দরিদ্র, সমাজের এক প্রান্তিক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন তিনি। জীবনে চলার পথ, শুধু এটুকুতেই থেমে যায়। কিন্তু তারওপর জন্ম থেকেই জগন্নাথবাবুর দুটো হাত নেই। কিন্তু জগন্নাথবাবু হাল ছাড়েননি।

পূর্ব বর্ধমানের (Purba Burdwan) আউসগ্রাম ১ নম্বর ব্লকের বেরেণ্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের বেলুটি গ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথ বাড়ির বড় ছেলে। তাঁর ছোট ভাইয়ের নাম বলরাম। হাত না থাকার কারণেই এমন নামকরণ হয়েছে তাঁর, জানিয়েছেন জগন্নাথবাবু। বাবা লক্ষণচন্দ্র বাউরি ও মা সুমিত্রা বাউরিও মনে করতেন প্রভু জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদে একদিন তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াবেন।

স্কুলে ভর্তি করার জন্য জগন্নাথবাবুকে শৈশবে তাঁর বাবা নিয়ে যান বেলুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভূতনাথ পাল মহাশয় তাঁর বাবাকে বলেন , প্রভু জগন্নাথ দেবকে স্মরণ করে তোমার ছেলের নাম রাখো জগন্নাথ। প্রধান শিক্ষকের সেই কথা মেনে নেওয়া হয়। এরপর থেকে জগন্নাথ বাউরি নামেই তাঁর পরিচিতি হয়। ওই নামেই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু হয় তাঁর লেখাপড়া জীবন।

জগন্নাথ বাবু জানান, তাঁর পায়ে পেনসিল গুঁজে দিয়ে তাঁকে বাংলা ও ইংরেজি অক্ষর লেখা শিখিয়েছিলেন বেলুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভূতনাথ পাল। পায়ে করে লেখা শিখতে পারার পরেই তাঁর লেখাপড়া শেখার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। এরপর থেকে শত কষ্টের মধ্যেও তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। সাফল্যের সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ‘বেসিক ট্রেনিং’ কোর্সে ভর্তি হন।

ট্রেনিং সম্পূর্ণ হওয়ার পর তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পান। সেই থেকে ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে আউসগ্রামের জয়কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন জগন্নাথ বাউরি। তাঁর কথায়, ‘পায়ের আঙুলে চক পেনসিল গুঁজে নিয়ে তিনি বোর্ডে লিখে ছাত্রছাত্রীদের পড়া বোঝান। তা নিয়ে কোনও অভিভাবক বা পড়ুয়া কোনওদিন আপত্তি তোলেননি । বরং তাঁরা তাঁর পড়ানোটাকেই মান্যতা দিয়েছেন বরাবর। এখন তাঁর স্কুলের সব ছাত্র–ছাত্রীর জন্মদিন পালন করা হয়। শিশুদের সঙ্গে জগন্নাথবাবুর সম্পর্ক এক অন্য মাত্রার। বিদ্যালয়ের সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীরাও তাঁদের প্রিয় জগন্নাথ স্যারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

বিশেষভাবে সক্ষম এই অসাধারণ মানুষটিকে অক্ষমতার কোনও গ্লানি কোনওদিন ছুঁতে পারেনি। যেকারণে অবসরে গান গাওয়া শুরু করেন জগন্নাথবাবু। গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন, ওঁর জীবনের সংগ্রামটা অসাধারণ। ওঁর চাকরি পাওয়ার খবরে গোটা গ্রামের মানুষ খুশি হয়েছিলেন।

স্কুলের প্রত্যেক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী, জগন্নাথবাবুর সংগ্রামকে কুর্নিশ করেন। এবং সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখেন। জগন্নাথবাবু বলেন, ‘‘আমি ছেলেমেয়েদের এই শিক্ষাই দিই যে, সদিচ্ছা ও অধ্যাবসায় থাকলে অসাধ্য বলে কিছুই নেই।’’

বাল্যবিবাহ রুখতে নারী বেশে পথে নেমেছেন হুগলির মাস্টারমশাই ‘গোলাপসুন্দরী’

You might also like