Latest News

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব সাফল্য, কী উপায়ে কাজ হাসিল করল ‘মুম্বই মডেল’

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৭ এপ্রিল, মধ্যরাত। কমিশনার ইকবাল সিং চাহালের কাছে মুম্বইয়ের ছ’টি হাসপাতাল থেকে ঘন ঘন এসওএস আসতে থাকে। ১৬৮ জন করোনা রোগী ভর্তি। এদিকে অক্সিজেনের ঘাটতি। কোনও উপায় বের করতেই হবে। নইলে একজনকেও বাঁচানো যাবে না।

খবর পেয়ে তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তিনি। ইকবালের নির্দেশেই সমস্ত রোগীকে একে একে আরেকটি অস্থায়ী কোভিড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম ঢেউ আছড়ে পড়ার সময় হাতের পাঁচ ভেবে এর বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন তিনি। এরপর সংক্রমণ নেমেছে। মৃত্যুর হার কমেছে। কিন্তু সেই ‘সেট আপ’-টিকে ভেঙে ফেলেননি ইকবাল। জানতেন, দ্বিতীয় ঢেউ আজ না হোক কাল আসবেই। তখন এর প্রয়োজন আরও বড় হয়ে দেখা দেবে৷ কার্যত, সেটাই হয়। ইকবালের অঙ্কে কোনও ভুল ছিল না। যে কারণে ইতিমধ্যে কোভিড সংক্রমণে রাশ টেনে ‘মুম্বই মডেল’ সারা দেশের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে।

খাতায় কলমে চলতি বছরের ১ মার্চ গোটা দেশে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ আছড়ে পড়ে। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত মুম্বইয়ে ২ হাজার ৭৮৪ জন নাগরিক কোভিডে প্রাণ হারিয়েছেন। পরিসংখ্যানের বিচারে যা দিল্লির মৃত্যুহারের এক চতুর্থাংশ। বাণিজ্য নগরীর এই সাফল্যকে ঠারেঠোরে কুর্নিশ জানিয়েছে খোদ দেশের শীর্ষ আদালত। রাজধানী দিল্লিকেও সেই মডেল অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

সাফল্যের আসল মন্ত্রটি কী? ইকবালের জবাব, প্রথম টোটকাই হচ্ছে সিস্টেমের বিকেন্দ্রীকরণ। কোনও একটা জায়গায় বসে বোতাম হাতে কোভিডের হালহকিকত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ তাঁর ঘোরতর নাপসন্দ। বিভিন্ন ছোট বড় পাড়া, মহল্লায় পরিকাঠামোকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন ইকবাল। এমনকী অক্সিজেন কিংবা অন্যান্য মেডিক্যাল সরঞ্জামের ভাণ্ডারকেও শহরের বিভিন্ন অংশে মজুত রেখেছেন। সবই সরকারি উদ্যোগে। এমমকী অস্থায়ী হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার না রেখে প্রতিটি রোগীর বেডের কাছে পাইপ মারফত শ্বাসবায়ু পৌঁছনোর ব্যবস্থা হয়েছে।

শুনতে সহজ লাগলেও কাজটা বেশ কঠিন ছিল। মেনে নিয়েছেন এই পোড়খাওয়া কমিশনার। এমনিতে মুম্বইয়ের জনঘনত্ব সাংঘাতিক। রাষ্ট্রসংঘের হিসেবে গোটা পৃথিবীর মধ্যে উপরের সারিতে রয়েছে ভারতের এই শহর। একদিকে সুউচ্চ ইমারত আর তার পাশেই ঝুপড়ি বস্তির জঙ্গল। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে এখানে নাকি ৩২ হাজার মানুষ ঠাসাঠাসি করে বেঁচে থাকেন। তাই ইকবালের সাফ স্বীকারোক্তি, ‘শুরু থেকেই জানতাম, কোনও একজন মানুষের পক্ষে এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। এর জন্য জরুরি পরিচ্ছন্ন সিস্টেম।’

ধারাভি বস্তির পুনির্বিন্যাস হোক কিংবা সেচ ব্যবস্থার পুনর্গঠন। এর আগে একাধিক গুরুদায়িত্ব ঠান্ডা মাথায় সামলেছেন এই আধিকারিক। কিন্তু এবারকার যুদ্ধটা ধারেভারে আলাদা। জনঘনত্বের বোঝা সামলে অতিমারী ঠেকানো চাট্টিখানি কথা নয়। যে কারণে শত্রুর আক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে তিনি প্রতিআক্রমণের পথ বেছে নেন। ইকবালের ভাষায় যার নাম ‘চেজ দ্য ভাইরাস’। এর অর্থ—  ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, বিশেষ করে বস্তি এলাকায় গিয়ে আক্রান্তদের চিহ্নিত করা। তারপর তাঁদের আইসোলেট করে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা। ধারাভির প্রায় ১৫ হাজার বস্তিবাসীকে তিনি এভাবে সরিয়ে এনে দ্রুত সংক্রমণ ঠেকান।

ইকবাল জানেন, লড়াই এখনও শেষ হয়নি। ভ্যাকসিন নিতে প্রতিদিন গাদাগাদি করে লোকে ভিড় জমাচ্ছে। ফলে আগামী দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্তের পারদ চড়বে। তা ছাড়া তৃতীয় ওয়েভ এল বলে। তাতে নাকি শিশুদের সংক্রামিত হওয়ার ভয় বেশি। তাই আগেভাগেই পেডিয়াট্রিক হাসপাতালের জোগাড়যন্ত্র সেরে ফেলছেন ইকবাল।

‘চেজ দ্য ভাইরাসের’ জন্মদাতা এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পছন্দ করেন যে!

You might also like