Latest News

বাসন্তীর কূলগাছে ভূতেদের কাছারি! তাকে ঘিরে মন্দির, মেলা, কুসংস্কারে মিশেছে বিশ্বাস

দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রখর রোদে পুড়ছে নির্জন দুপুর। চারিদিক শুনশান। পাশেই কুলকুল করে বয়ে চলেছে বিদ্যাধরী নদী। হঠাৎই চারদিকের নিস্তব্ধতা খানখান করে কাঁসর-ঘন্টার ধ্বনি। সঙ্গে সুর করে কারা বলছেন, ‘ত্রিলোচন ত্রিশুলধারীর চরণের সেবা লাগে…।’ আশপাশের জনবসতি থেকে দু’একজন ছোট বাচ্চা ছুটতে ছুটতে পৌঁছে যায় সে শব্দ অনুসরণ করে।

সেখানেই এক ব্যক্তি একটি কুলগাছের নীচে, একটি গর্তের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বসে আছেন। পাশে দু’জন কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়েই চলেছেন। প্রায় আধঘণ্টা পরে গর্তে হাত ঢুকিয়ে থাকা ব্যক্তি গর্ত থেকে তুলে আনলেন একটি গাছের শিকড়। শিকড়টি সযত্নে রেখে, সঙ্গে আনা বাতাসা, ফল তিনি ভাগ করে দিলেন ওই বাচ্চাদের। এবার ওই শিকড়টি ধারণ করে পূর্ণ হল ওই ব্যক্তির মনস্কামনা।

এই একই ঘটনা ঘটতে লাগল প্রায় প্রতি শনি ও মঙ্গলবার। একের পর এক মানুষ এসে এই কাণ্ড করতে লাগলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসা, ফল-মূল খাওয়ার লোভে গ্রামের বাচ্চাদের ভিড়ও বাড়তে লাগল। এভাবেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী থানার মসজিদবাটি অঞ্চলের দক্ষিণ মোকামবেড়িয়া গ্রামের শ্মশানকে কেন্দ্র করে লোকমুখে কথা ছড়াল, সেখানকার এক কুলগাছের নীচের গর্তে হাত ঢুকিয়ে বাবা মহাদেবের কাছে প্রার্থনা জানালে, মেলে শিকড়। তা মাদুলি করে ধারণ করলে রোগমুক্তি ঘটে, মনোস্কামনা পূর্ণ হয়।

এই ঘটনা আজকের নয়। ১৯৫৫ সালের। কিন্তু এই মানুষগুলি কারা? তাঁরা কোথা থেকে আসতেন কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে! গাঁয়ের লোকজন খোঁজখবর নিয়েও নাকি কিছু জানতে পারেননি।

স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রচলিত, শ্মশানের পাশে একটা কূলগাছ ছিল, তাতে এলাকার সব ভূত-পেত্নী-ডাকিনী-যোগিনীরা বাস করত। দিনের বেলাতেও ওই শ্মশানের পাশ দিয়ে চলাচল ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। মাসের এক বিশেষ রাতে নাকি ওই শ্মশানে বসত ভূতেদের কাছারি বা আদালত। এলাকার মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হত ওই কাছারিতেই!

সেই সময়েই এক মধ্যবয়স্ক মহিলা ওই কুলগাছের নীচের গর্তে হাত ঢুকিয়ে হত্যে দিয়ে বসে থেকে একটি মাদুলি পান। মাদুলির প্রভাবেই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে সেরে ওঠেন তিনি। পরে ওই মহিলার আর খোঁজ মেলেনি। তবে এই ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়ে লোকমুখে। তাই দূরদূরান্ত থেকে রোগক্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই শ্মশানে এসে, ওই গর্ত থেকে শিকড় বা মাদুলি সংগ্রহ করতেন। এইভাবেই শনি-মঙ্গলবারে ক্রমে ক্রমে শ্মশানে বাড়তে লাগল ভিড়।

এর পরেই ওই গাছ ও গর্তকে কেন্দ্র করে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়। প্রথমে তা ছিল টালির একচালা ছাউনি দেওয়া বেড়ার মন্দির। পরে মাটির মঞ্চ নির্মাণ করে শুরু হয় মহাদেবের নামে পুজো দেওয়া। চড়কের সময়ে শুরু হয় স্থানীয়দের আনাগোনা। পরিচর্যা ও দেখভালের অভাবে সে মন্দির পরে নষ্টও হয়ে যায়।

তবে মন্দির ভেঙে গেলেও দর্শনার্থীদের আগমন বন্ধ হয়নি। পরে আবার সে মন্দিরের পুনর্নির্মাণও হয়। মন্দির চত্বরে তৈরি করা হয় একটি নলকূপও। ২০০২ সালে মন্দিরের রঙ ও অন্যান্য কাজ সম্পূর্ণ হয় শেষমেশ। এখন মন্দিরটি বেশ বড়, ৩৩ ফুট লম্বা, ২৫ ফুট চওড়া। মন্দিরের ত্রিশুলও প্রায় ৩০ ফুট। এই মন্দির ফের ভেঙে আবারও নতুন মন্দির হয় ২০১৬ সালে। মন্দিরের চূড়ার উচ্চতাও বেড়ে হয়েছে ৫০ ফুট।

এখন মন্দিরের চারদিকে নেট সিমেন্ট বাঁধানো। পিছনেই টলটলে পুকুর ও তার স্নানের ঘাট। পাশেই আছে পাকা ছাদ দেওয়া যাত্রীনিবাস। সামনে বিশাল মাঠ। সেখানে প্রতি বছর মেলা বসে, লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। প্রথমদিকে এই মেলা ‘ভূতের কাছারি’ নামে পরিচিত ছিল। পরে নামটির ভাষাগত সংশোধন করে ‘বড় কাছারির মেলা’ হয়।

শুধু মেলা নয়, সারা বছরই যাত্রীদের আনাগোনা লেগে থাকে মনোস্কামনা পূরণের জন্য।বছরের যে কোনও শনি বা মঙ্গলবার এখানে এসে মন্দিরের চারপাশে যে কোনও জায়গায় নির্দিষ্ট মনোস্কামনার কথা কাগজে লিখে, ঢিল বেঁধে দিতে হয়। তার পরে সেই কূলগাছের নীচের গর্তে হাত ঢুকিয়ে মাদুলি বা শিকড় তুলে ধারণ করতে হয়। তাহলেই নাকি সব মনোস্কামনা পূরণ হয়। দিল্লি, আন্দামান, মুম্বই, বাংলাদেশ– এসব নানা জায়গা থেকে যাত্রীরা আসেন। 

You might also like