Latest News

Heritage: কাদম্বিনীর বাড়ি ভেঙে তৈরি হবে বহুতল, ছাড়পত্র দিয়েছে হেরিটেজ কমিশন

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতায় কাদম্বিনী যে বাড়িতে সপরিবারে থাকতেন, সেই বাড়িটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। সেখানে তৈরি হবে বহুতল। ‘‌ফার্স্ট গ্রাজুয়েট ইন ইন্ডিয়ান ওম্যান’,‌ লিখে গুগলে সার্চ করলেই দেখাবে তাঁর নাম। ‘‌ফার্স্ট ওম্যান ডক্টর ইন ইন্ডিয়া’‌ লিখলেও তিনি। যে সময়ে মেয়েদের পড়াশোনার কথা কেউ ভাবতেও পারত না, সেই সময়ে তিনি চুটিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেছেন। রাতবিরেতে ফিটনে চড়ে রোগী দেখতে গিয়েছেন। তিনি কাদম্বিনী বসু। বিয়ের পর গাঙ্গুলি। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম ছাত্রী। দেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা প্র‌্যাকটিসিং চিকিৎসক। প্রতিবছর জন্মদিনে গুগলও এই বাঙালি নারীকে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁদের ডুডল পাল্টে দেয়। কিন্তু দেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসকের বাড়িটি আর থাকছে না।

১৩ এ বিধান সরণি। অতীতের কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। এই ঠিকানাতেই এক সময়ে বসবাস করতেন প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলি (১৮৬১-১৯২৩)। দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। অনেকের মতে সেইসময়ের প্রথম ‘‌লাভ ম্যারেজ’‌। তিনি আর কাদম্বিনী থাকতেন তিনতলায়। কাদম্বিনীরই বয়সি দ্বারকানাথের মেয়ে বিধুমুখীর বিয়ে হয়েছিল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সঙ্গে। তিনিও ওই বাড়িরই দোতলায় থাকতেন। এই বাড়িতেই জন্মেছেন উপেন্দ্রকিশোর ছয় সন্তানের মধ্যে পাঁচজন। সুকুমার রায়ও।

বাড়ির একাংশ ভেঙে আগেই প্লাজা তৈরি হয়েছে। এবার অযত্নে নষ্ট হয়ে যাওয়া মূল বসতবাড়িটিও ভাঙা হচ্ছে। তারপর তৈরি হবে আধুনিক বহুতল। দিন কয়েক আগে সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা গেল, বাড়িতে ঢোকার সব গেট টিন দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। মোতায়েন রয়েছেন বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী। তাঁকে গেট খোলার অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘ঢোকার অনুমতি নেই। আমার চাকরি চলে যাবে।’‌

আগাছা আর বড় বড় বট অশ্বত্থ গজিয়েছে চতুর্দিকে। হেরিটেজ কমিশন কোনও উদ্যোগই নেয়নি বলে অভিযোগ এলাকার লোকজনের। তবে একবার বাড়ি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল কমিশন। তখন কমিশনের চেয়ারম্যান শুভাপ্রসন্ন জানিয়েছিলেন, ওই বাড়ি মেরামত করা হবে। হেরিটেজ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু দিন কয়েক আগে শুভাপ্রসন্ন দ্য ওয়াল–কে ফোনে বললেন, ‘‌ওই বাড়ি একটি পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স কোম্পানি কিনে নিয়েছে। ওরা ওখানে একটা মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং তৈরি করবে। আমরা ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছি।’‌

কিন্তু ওই বাড়ি তো হেরিটেজ। কমিশন সংরক্ষণ করবে বলে আপনি জানিয়েছিলেন, এই প্রশ্ন শুনে রীতিমতো রেগে যান শুভাপ্রসন্ন। বলেন, ‘‌ওই বাড়ি ভেঙে পড়েছে। সারানোর টাকা আপনি দেবেন। পনেরো-কুড়ি কোটি টাকা লাগবে। সরকারের কাছে টাকা নেই। তাই আমরা ছাড়পত্র দিয়েছি। পিসি চন্দ্র জানিয়েছে যেহেতু কাদম্বিনীর বাড়ি, ওঁরা বিল্ডিংয়ে একটা একটা স্মারক রাখবে।’‌

বাড়ির সামনে একটি ক্যাফে আছে। এলাকাটি কলকাতা পুরসভার ৩৮ ওয়ার্ডের অন্তর্গত। তৃণমূল কাউন্সিলর সাধনা বসু বললেন, ‘‌হেরিটেজের বিষয়ে কিছু জানিনা। তবে ওই ক্যাফে অবৈধ। ওরা ওই বাড়ির সামনে জায়গা দখল করে বসেছে। আমি চেষ্টা করেছিলাম তুলে দেওয়ার। ওই বাড়ি নিয়ে বিবাদ র‌য়েছে। এখন পিসি চন্দ্র জুয়েলার্স কিনেছে। যদি হেরিটেজ হয়, তা পুরসভা দেখবে। আমার কিছু করার নেই।’

‌কাদম্বিনীর বাড়ির উল্টোদিকে প্রসন্ন বস্ত্রালয়। মালিক আশিস দাস বললেন, ‘‌এই বাড়ি ছিল দুর্গাচরণ লাহার। সেকারণে আমরা লাহা বাড়ি হিসেবে চিনি। পরে এখানে ক্যালকাটা ট্রেনিং ইন্সটিটিউট নামে একটি প্রতিষ্ঠান হয়। যেখানে পড়তে আসতেন রবীন্দ্রনাথ। উনি তো সামান্যই প্রথাগত শিক্ষা নিয়েছেন। কিছুটা ওই বাড়িতেই বলে শুনেছি।’‌

জানা গেল, স্বাধীনতা পরবর্তী কোনও এক সময়ে শরিকি ভাগভাগিতে বাড়িটি বিভক্ত হয়ে যায় দুই ঠিকানায়—১৩এ এবং ১৩বি। ১৩বি অংশটি নিশ্চিহ্ন হয়ে তৈরি হয়েছে প্লাজা। ২০০৫ সালে ১৩ এ অংশটি হেরিটেজ তকমা পায়। কিন্তু গ্রেড আইআইবি ধারায় চিহ্নিত হওয়ায় আইনের ফাঁক রয়েছে। সেই ফাঁক গলে অবশিষ্ট অংশটিও মুছে যাওয়ার অপেক্ষায়।এলাকার অনেকের অভিযোগ, ২০১৫ সাল থেকেই ভাঙার কাজ চলছে। তবে ধীরে ধীরে। কেউ যাতে টের না পায়, সেজন্য বাইরে টিন দিয়ে উঁচু করে ঘিরে দেওয়া হয়েছে।

সুকুমার রায়ের ঠিক পরের বোন পুণ্যলতা চক্রবর্তী লিখিত ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’ নামে স্মৃতিকথায় লেখা, ‘‌যে বাড়িতে আমাদের জন্ম হয়েছিল এবং শিশুকাল কেটেছিল সেটা ছিল এক বিরাট সেকেলে ধরনের বাড়ি। তার বাইরের অংশে আমাদের স্কুল হত, ভিতরের অংশের দোতলায় আমরা থাকতাম আর তিনতলায় আমাদের দাদামশাইরা থাকতেন।’‌ পুণ্যলতার ‘আমরা’ অর্থাৎ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পরিবার। সুকুমারের অন্য ভাইবোনেরা— সুখলতা, পুণ্যলতা, শান্তিলতা ও সুবিনয়, প্রত্যেকেরই জন্ম এখানে।

ডিজিটাল প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হেঁদুয়ার তন্ময় পাল পাশেই একটি দোকানে চা খাচ্ছিলেন। কাদম্বিনী গাঙ্গুলির বাড়ি নিয়ে জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘‌ঈর্ষাকাতর, প্রাচীনপন্থীরা কলকাঠি নেড়ে তাঁর কাছ থেকে প্রথম বাঙালি মহিলা চিকিৎসকের আসন কেড়ে নিয়েছিলেন। ডাক্তারি ডিগ্রির বদলে তাঁকে দেওয়া হয়েছিল ‘গ্র্যাজুয়েট অফ দ্য মেডিক্যাল কলেজ অব বেঙ্গল’ বা জিএমসিবি উপাধি। কিন্তু আটকানো যায়নি। তাঁর স্মৃতি নিঃশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। বাঙালি আসলে আত্মবিস্মৃত জাতি।’‌

মৃত্যুর দিনও সকালেও একটা জটিল অপারেশন করেছিলেন কাদম্বিনী। সেদিনই সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়, মারা যান ডাক্তার আসার আগেই। হাতব্যাগে পাওয়া গিয়েছিল সে দিনের ফি ৫০ টাকা। সেই টাকাই খরচ করা হয়েছিল তাঁর শেষকৃত্যে। কারণ তিনি কখনই স্বামী বা সন্তানের গলগ্রহ হতে চাননি।

৫ মে, সল্টলেক ইএসআই–এর দফতরে কাদম্বিনী গাঙ্গুলি এবং ভারতের প্রথম ও বিশ্বের দ্বিতীয় টেস্ট টিউব বেবির জনক ডক্টর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ছবি উদ্বোধন করা হয়। ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলির প্রপৌত্র রাজীব গাঙ্গুলি ও দীপান্বিতা গাঙ্গুলি। ছিলেন ‘‌পুরনো কলকাতার গল্প’‌ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের সদস্য জয়ন্ত সেন, দীপিকা বন্দোপাধ্যায় জোশি, ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় ও স্বর্ণালী চট্টোপাধ্যায়। কাদম্বিনীর বাসভবন ভেঙে ফেলার বিষয়টির প্রতিবাদ করেছেন তাঁরা। ওই গ্রুপে তরফে জানানো হয়েছে, বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ কাদম্বিনী গাঙ্গুলিকে যথাযথ সম্মানের এক কণাও আমরা দিতে পারিনি। সারা শহরে তাঁর একটি মূর্তি আমরা বসাতে পারিনি। তাঁর বাসভবনও মুছে যাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে।

বাড়ি কেনা ও প্লাজা তৈরির বিষয়টিতে পিসি চন্দ্র জুয়েলার্সের শুভ্র চন্দ্রকে একাধিক বার ফোন ও মেসেজ করা হয়। মেসেজ তিনি দেখেছেন। একবার ফোন ধরে জানান, বিষয়টিতে খোঁজ নিয়ে জানাবেন। পরে আর কিছু জানান নি। ফোন করা হলে উত্তরও দেননি। অনেক রাতে মেসেজের উত্তরে লেখেন, ‘‌আই হ্যাভ নো ইনফরমেশন।’‌

তাজমহলে কয়েকটি বন্ধ ঘরের ছবি প্রকাশ করল এএসআই

You might also like