Latest News

সংসদে অচলাবস্থার অবসান কোন পথে

দু’পক্ষই অনড়। কেউ কারও কথা শুনবে না। তাহলে আর আলোচনা হবে কী করে। অতএব সংসদের অধিবেশন ভণ্ডুল। গত ১৯ জুলাই সংসদের শীতকালীন অধিবেশন শুরু হয়। শেষ হওয়ার কথা ১৩ অগাস্ট। ইতিমধ্যে ১০৭ ঘণ্টারও বেশি অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। হয়েছে মাত্র ১৮ ঘণ্টা।

অধিবেশন শুরুর ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় এক নিউজ পোর্টালে ফাঁস হয় পেগাসাস কেলেংকারি।

অভিযোগ পেগাসাস নামে এক মিলিটারি গ্রেড স্পাইওয়ারের মাধ্যমে দেশের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, শিল্পপতি, আমলা, সমাজকর্মী ও সাংবাদিকের ফোনে আড়ি পাতা হয়েছিল। খুবই মারাত্মক অভিযোগ, সন্দেহ নেই। সত্যিই যদি এমন আড়ি পাতা হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে, আমাদের দেশে গণতন্ত্র রীতিমতো খর্বিত হয়েছে। ভারত কার্যত পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে উঠছে।

বিরোধীরা জানতে চাইছেন, সরকার কি পেগাসাসের মাধ্যমে আড়ি পেতেছিল? সরকার হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলেনি।

সরকারের পক্ষে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া সত্যিই মুশকিল।

সরকার যদি বলে হ্যাঁ, তাহলে প্রমাণিত হবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ওপরে তার আদৌ আস্থা নেই। যদি বলে না, তাহলে আরও বিপদ। তখন বোঝা যাবে, কোনও বিদেশি রাষ্ট্র আমাদের ফোনে আড়ি পাতছিল। কারণ একমাত্র কোনও সরকারই পেগাসাস ব্যবহার করতে পারে।

সুতরাং সরকার কোনও জবাব দিচ্ছে না। বিরোধীরাও স্থির করেছে সংসদ চলতে দেওয়া হবে না। সরকার জানিয়েছে, অধিবেশন অচল থাকার জন্য ইতিমধ্যে ক্ষতি হয়েছে ১৩৩ কোটি টাকা। পুরো বাদল অধিবেশনই যদি ভণ্ডুল হয়ে যায়, তাহলে ক্ষতির অঙ্ক আরও কয়েকগুণ বাড়বে।

একটা সময় ছিল, যখন সংসদে খুব প্রাণবন্ত বিতর্ক হত। সেকালের সাংবাদিকরা বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন, কীভাবে নেহরুর ভাষণের জবাবে তীক্ষ্ণ এবং সরস মন্তব্য করতেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেই আমলে অধিবেশনের সময় হট্টগোল ছিল বিরল ঘটনা। পুরানো খবরের কাগজের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, ১৯৫২ সালে সরকার প্রিভেনটিভ ডিটেনশন (অ্যামেন্ডমেন্ড) বিল পেশ করলে লোকসভায় খুব হইচই হয়েছিল।

১৯৬৩ সালে লোকসভায় অফিসিয়াল ল্যাংগোয়েজ বিল পাশ হওয়ার সময়েও রীতিমতো বিঘ্নিত হয়েছিল অধিবেশন।

সংসদ অচল করার প্রবণতা বাড়তে থাকে ন’য়ের দশক থেকে। ইউপিএ সরকারের দ্বিতীয় দফায়, অর্থাৎ ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ওই প্রবণতা চরমে ওঠে। তখন অধিবেশনের ৪০ শতাংশ সময় অপচয় হয়েছিল। টু জি স্পেকট্রাম কেলেংকারি, কোল ব্লক বরাদ্দ কেলেংকারি, ভারত-চিন সীমান্ত বিতর্ক এবং নির্ভয়া কাণ্ড নিয়ে দিনের পর দিন সংসদের অধিবেশন চলতে দেননি বিরোধীরা।

এখন যাঁরা সরকারপক্ষে আছেন, সেই বিজেপিও সেদিন অধিবেশন ভণ্ডুল করায় বড় ভূমিকা নিয়েছিল। সংসদ অচল করার পক্ষে যুক্তি সাজিয়েছিলেন বিজেপির শীর্ষ নেতারা। ২০১১ সালের ৩০ জানুয়ারি রাজ্যসভার তৎকালীন সাংসদ অরুণ জেটলি বলেছিলেন, “সংসদের কাজ হল আলোচনা করা। কিন্তু অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা করতে দেওয়া হয় না। এই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের স্বার্থেই সংসদের কাজে বাধা দিতে হয়।”

২০১২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লোকসভার তৎকালীন বিরোধী নেত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, “সংসদকে কাজ করতে না দেওয়াও গণতন্ত্রের একটা অঙ্গ।”

সেই সময় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলতেন, বিজেপি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে। এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাই বলছেন।

ব্যাপারটার মধ্যে একরকম ‘আমরা-ওরা’ আছে। কংগ্রেস মনে হয় ভাবছে, আমাদের আমলে বিজেপি সংসদ চালাতে দেয়নি, ওদের আমলে আমরাই বা দেব কেন?

রাজনীতিকদের আচরণ দেখলে মনে হয় তাঁরা ভীষণ অসহিষ্ণু। প্রতিপক্ষকে বলতেই দেন না। এই যদি নেতাদের মানসিকতা হয়, তাহলে কর্মীরা কী শিখবে? তারা তো মারামারি করবেই।

এবার সংসদে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হতে পারত। পেট্রপণ্যের মূল্য কেন এত বাড়ল, সেই প্রশ্নে বিরোধীরা সরকারকে চেপে ধরতে পারতেন। ভ্যাকসিনের সংকট, কোভিডের দ্বিতীয় ওয়েভের সময় অক্সিজেন ও হাসপাতালের বেড না পাওয়া, সর্বোপরি ফোনে আড়ি পাতা নিয়েও সরকারকে তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে ফেলা যেত। অধিবেশন বন্ধ থাকায় সেই সুযোগ পাওয়া গেল না। .

আসলে সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে একপ্রকার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সমঝোতা থাকা দরকার। বিরোধীদের যেমন ছেলেমানুষের মতো অবাস্তব দাবি তোলা উচিত নয়, তেমন সরকারেরও উচিত, উদার মানসিকতার পরিচয় দেওয়া। সংসদের অচলাবস্থা নিয়ে গত কয়েকদিনে কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন রাজনাথ সিং। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নিজে বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভাল হত। তাঁদের অভিমান ভাঙাতে সুবিধা হত। কিন্তু মোদী তো সংসদেই বিশেষ যান না। সুতরাং অধিবেশন বন্ধ করে জনগণের টাকার অপচয় হবেই।

You might also like