Latest News

CPM: চাকরি-ব্যবসা করে জেলার নেতা হওয়া যাবে না, কঠোর অবস্থান সিপিএমের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, অনিয়ম-অনাচারে ক্লিষ্ট বাংলার রাজনীতিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে বেনজির সাংগঠনিক বিধি কায়েমের পথে হাঁটল সিপিএম (CPM)। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হল, জেলার নেতা তাঁরাই হবেন যাঁরা দলের প্রতি পরিপূর্ণ (whole-timers) ভাবে নিয়োজিত রয়েছেন। যাঁদের ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয়আশয় একেবারে মূল্যহীন। আলিমুদ্দিনের আশা, এ হেন অবস্থান বাকি দলের সঙ্গে শুধু ফারাক গড়ে দেবে না, সিপিএমের পুনরুজ্জীবনেও তা বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

রাজ্য সিপিএমের (CPM) এই সিদ্ধান্ত একেবারেই মৌলিক বলা যেতে পারে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই সাম্প্রতিককে দেখলে আন্দাজ করা যেতে পারে যে, কত বড় পদক্ষেপ করেছে আলিমুদ্দিন। উত্তর চব্বিশ পরগনা সিপিএমে প্রবাদপ্রতিম নেতা ছিলেন তড়িৎবরণ তোপদার। সাংসদ থাকার পাশাপাশি দলের জেলা সম্পাদকমণ্ডলী ও রাজ্য কমিটির সদস্য ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু তিনি হোলটাইমার ছিলেন না। স্কুলে পড়াতেন।

হুগলির রূপচাঁদ পাল ছিলেন নৈহাটি আরবিসি কলেজের অধ্যাপক। সাংসদ থাকার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সিপিএমের হুগলি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর দীর্ঘদিনের সদস্য। অধ্যাপনা থেকে স্বেচ্ছাবসর নিলেও এই নেতা কখনও দলের সর্বক্ষণের কর্মী ছিলেন না।

আবার এই হুগলিতেই সিপিএমকে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রাক্তন উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী প্রয়াত সুদর্শন রায়চৌধুরী। তিনি শ্রীরামপুর কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। অধ্যাপনার চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘদিন জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তো ছিলেনই আবার জেলা সম্পাদকও ছিলেন।

আরও পড়ুন: টোটো চালকদের সঙ্গে ঘর ছাড়লেন একই বাড়ির দুই বউ! বাগদায় হুলুস্থূল

হাওড়ায় সিআইটিউ-র জেলা সম্পাদক ও সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন কনক দাস। তিনি ছিলেন সালকিয়া বামুনগাছি অরবিন্দ স্কুলের শিক্ষক। তিনিও সিসিপিএমের হোলটাইমার ছিলেন না।

চাকরি বা অন্য কাজ করে সিপিএমের নেতৃত্বে থাকার উদাহরণ নেহাত কম নেই। কিন্তু এবার সাংগঠনিক বিষয়ে এ ব্যাপারে কড়া বিধি বাঁধল সিপিএম। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট জানিয়ে দিয়েছে, জেলা সম্পাদকমণ্ডলীতে কোনও অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী নেতাকে রাখা যাবে না। জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের সকলকে হোলটাইমার হওয়া বাধ্যতামূলক। রাজ্য সিপিএম এও বলেছে, যদি কোনও জেলায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ এমন নেতা থাকেন, যিনি চাকরি করতেন বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবার সংগঠনে তাঁর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে, তাঁকে সম্পাদকমণ্ডলীতে আমন্ত্রিত সদস্য করে রাখা যেতে পারে। তবে স্থায়ী সদস্য নৈব নৈব চ।

পার্টি কংগ্রেসের পর সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী গঠন হয়ে গিয়েছে। এবার জেলায় জেলায় সম্পাদকমণ্ডলী গঠনের কাজ চলছে। সেখানেই এই বিধি কার্যকর করছে আলিমুদ্দিন।

যেমন কলকাতা জেলার দীর্ঘদিনের দুই জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দেবাঞ্জন চক্রবর্তী ও রাহুল ভট্টাচার্যকে এবারের সম্পাদকমণ্ডলীতে রাখা হয়নি। কারণ তাঁরা হোলটাইমার নন। তাঁদেরকে সম্পাদকমণ্ডলীর আমন্ত্রিত সদস্য করার বিষয়ে রাজ্য সিপিএমের অনুমোদন চেয়েছে প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবন।

তবে কলকাতা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীতে ফৈয়জ আহমেদ খান ও দেবেশ দাস রয়েছেন। কিন্তু তাঁরা হোলটাইমার নন। সিপিএমের ব্যাখ্যা সংখ্যালঘু ও তফসিলি কোটায় এই দুই নেতাকে রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বশে রাখুন রক্তচাপ, একদম বাড়তে দেবেন না

সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটেছে হুগলিতে। গত ১০ মে হুগলির জেলা কমিটির বৈঠকে শ্রুতিনাথ প্রহরাজকে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য করা হয়েছিল। সেই নামের তালিকা ঘোষণাও করে দিয়েছিল সিপিএম। কিন্তু যেই না ওই তালিকা রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীতে জমা পড়েছে, ওমনি তা খারিজ করে দেয় আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। তারপর গত সপ্তাহে ফের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠক করে শ্রুতিনাথকে আমন্ত্রিত করে কোন্নগরের পল্টু চক্রবর্তীকে আমন্ত্রিত থেকে স্থায়ী সদস্য করা হয়েছে সম্পাদকমণ্ডলীতে।

১০ মে হুগলি জেলা কমিটির বৈঠকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্রীদীপ ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন। আবার হুগলির জেলা সম্পাদক দেবব্রত ঘোষ এখন রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীরও সদস্য। হুগলি সিপিএমে অনেকের প্রশ্ন, এই দুই নেতার উপস্থিতিতে কী করে এত বড় ভুল হল?

শ্রুতিনাথ ছিলেন উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজের বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক। তা ছাড়া তিনি ওয়েবকুটারও নেতা ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি অধ্যাপনার চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নেন।

সিপিএম সূত্রে এও জানা গিয়েছে, শ্রুতিনাথ যখন জানতে পারেন তাঁকে জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর স্থায়ী সদস্য রাখার ক্ষেত্রে অনুমোদন দিচ্ছেন না রাজ্য পার্টি, তখন নাকি তিনি কিছুটা অভিমানেই পার্টির একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যান। পরে যদিও তাঁকে জেলা সম্পাদক আলাদা করে ডেকে বোঝানোর পর বরফ গলেছে বলে খবর।

এখন সিপিএমে কৌতূহল তৈরি হয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনায় কী হবে তা নিয়ে। এমনিতেই জেলা সম্মেলনে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছিল এই জেলায়। সম্মেলন শেষে কমিটি গঠনই করা যায়নি কোন্দলে। এক সপ্তাহ পর বারাসতে ভোটাভুটি হয়েছিল। তারপর মধ্যরাত পর্যন্ত চলেছিল গণনা। পরের দিন আলিমুদ্দিনে ডেকে সম্পাদক নির্বাচন করা হয়েছিল। এ হেন জেলায় তন্ময় ভট্টাচার্য, বাবুল করের মতো নেতারা গত বার পর্যন্ত সম্পাদকমণ্ডলীতে ছিলেন। উত্তর দমদমের প্রাক্তন বিধায়ক তন্ময় ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। বাবুল কর ছিলেন পরিবহণ দফতরের কর্মী। সিপিএমের একটি সূত্রের দাবি, হোলটাইমার বিধি মেনে এই দু’জনকে বাদ পড়তে হবে এবার। আবার তা করতে গেলে কী কোন্দল অপেক্ষা করছে তা নিয়েও রাজ্য সিপিএমের অনেক নেতার দুশ্চিন্তা রয়েছে।

You might also like