Latest News

CPM: আলিমুদ্দিনের অগ্নিপরীক্ষা, ‘১ টাকার হোলটাইমার’ তন্ময়দের নিয়ে তীব্র বিতর্ক পার্টিতে

শোভন চক্রবর্তী

আলিমুদ্দিন স্ট্রিট নিয়ম করেছে। সেই নিয়ম না মানায় হুগলি সিপিএমকে (CPM) ‘কানমলা’ খেতে হয়েছে। ইচ্ছে না থাকলেও নিয়ম মেনেছে কলকাতা জেলা সিপিএম। কিন্তু উত্তর ২৪ পরগনায় গিয়ে সিপিএমের ‘লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা’ যেন বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল। যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে দলে। শুধু তাই নয়, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পার্টিকে যদি আলিমুদ্দিনের নেতারা ‘শায়েস্তা’ করতে না পারেন তাহলে একাধিক জেলার বিদ্রোহের মুখে তাঁদের পড়তে হবে বলে গুঞ্জন রয়েছে দলে।

আরও পড়ুন: বেসরকারি স্কুলের ফি নির্ধারণে কমিশন, যত দ্রুত চালু হয় ততই মঙ্গল

রাজ্য সিপিএম (CPM) এবার কড়া গাইডলাইন জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে জেলা সম্পাদকমণ্ডলীতে তাঁরাই থাকতে পারবেন যাঁরা হোলটাইমার বা সর্বক্ষণের কর্মী। অবসর না নেওয়া পর্যন্ত চাকরি করেছেন, পেনশনভোগী বা ব্যবসা করেন—এমন নেতাদের জেলার নেতা করা যাবে না বলে সার্কুলার গিয়েছে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ পর্যন্ত। সেখানে এও বলা হয়েছে, চাকরি করেন বা করতেন, কিংবা ব্যবসা করেন এমন নেতাদের যদি সম্পাদকমণ্ডলীতে নিতেও হয় তাহলে আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে রাখতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে উত্তর ২৪ পরগনায় সম্পাদকমণ্ডলী গঠনে সেসব বিধি কার্যত কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে।

কেন?

এখানে বলে রাখা ভাল, উত্তর ২৪ পরগনা সিপিএমের যিনি সম্পাদক সেই মৃণাল চক্রবর্তী নিজেই হোলটাইমার নন। তিনি একটি স্কুলে অশিক্ষক কর্মচারী হিসেবে চাকরি করতেন। সূত্রের খবর, তিনি পেনশন গ্রহণ করেন। জানা গিয়েছে, রাজ্য সিপিএমের বক্তব্য ছিল এই জেলায় জেলা সম্পাদককে ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রাহ্য করা যেতে পারে। অন্যদের ক্ষেত্রে তা হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হয়েছেন এমন তিন নেতা যাঁরা নিজেদের যৌবন কমিউনিস্ট পার্টির জন্য উৎসর্গ করেননি। তাঁরা কারা? তন্ময় ভট্টাচার্য, বাবুল কর এবং আহমেদ আলি খান।

তন্ময় ইউনাইটেড ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। বাবুল কর পরিবহণ দফতরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। জানা গিয়েছে মধ্যমগ্রামের নেতা আলি আহমেদ খানের নাকি পৈতৃক হাতপাখার ব্যবসা।

গত রবিবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক চলেছে। সেখানে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী তথা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী ও শ্রীদীপ ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতেই রাজ্য পার্টির গাইডলাইন কার্যত ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছে।

সূত্রের খবর, ‘অ-হোলটাইমার’দের কেন সম্পাদকমণ্ডলীতে নেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে জেলা কমিটির বৈঠকে তীব্র বিতণ্ডা হয়। তখন নাকি মৃণাল চক্রবর্তীরা যুক্তি খাড়া করেন, ‘ওঁরা এক টাকার হোলটাইমার।’ মানে কী? তন্ময়, বাবুল, আলি আহমেদরা এখন সারাদিন পার্টির কাজ করেন। তাঁরা পার্টির থেকে ভাতা নেন না। সাম্মানিক হিসেবে এক টাকা নেন।

দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এই নেতারা সারা জীবন চাকরি করেছেন। আর যাঁরা মার্কশিটে ভাল নম্বর থাকা সত্ত্বেও উজ্জ্বল কেরিয়ারের হাতছানি সরিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হয়েছেন, তাঁরা তাহলে কী করবেন?

সার্বিক ভাবে পার্টির মধ্যে এই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, কলকাতা, হুগলিতে যদি নিয়ম কার্যকর করতে কড়া হতে পারে আলিমুদ্দিন তাহলে উত্তর ২৪ পরগনা কি কিউবা নাকি? নাকি তন্ময়, বাবুলরা ফিদেল কাস্ত্রো, রাউল কাস্ত্রো?

হুগলিতেও শ্রীদীপ ভট্টাচার্যের উপস্থিতিতে অধ্যাপকের চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নেওয়া শ্রুতিনাথ প্রহরাজকে সম্পাদকমণ্ডলীর স্থায়ী সদস্য করা হয়েছিল। কিন্তু রাজ্য তা খারিজ করে দেয়। পরে শ্রুতিনাথকে আমন্ত্রিত করে কোন্নগরের পল্টু চক্রবর্তীকে সম্পাদকমণ্ডলীতে স্থায়ী হিসেবে নেওয়া হয়। হুগলির ক্ষেত্রে কুমিরজলা রোডের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছিল আলিমুদ্দিন। এখন প্রশ্ন, উত্তর ২৪ পরগনার ক্ষেত্রে কি সেই সাহস দেখাবেন মহম্মদ সেলিমরা।

দলে আরও একটি বিষয় নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। তা হল তাত্ত্বিক নেতা শ্রীদীপ ভট্টাচার্যের ভূমিকা। এবার সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের দৌড়ে ছিলেন শ্রীদীপ। লাস্ট ল্যাপে সেলিম সম্পাদক হয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছে যে দুটি জেলায় সম্পাদকমণ্ডলীতে হোলটাইমার নীতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটল সেই হুগলি ও উত্তর ২৪ পরগনার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শ্রীদীপ নিজে। পার্টিতে এও প্রশ্ন উঠছে, শ্রীদীপ কি সেলিমকে বিড়ম্বনায় ফেলতেই এই কাজ করছেন?

উত্তর ২৪ পরগনা সিপিএমের জেলা কমিটিতে থাকলেও গৌতম দেব এবং নেপালদেব ভট্টাচার্যকে এবার সম্পাদকমণ্ডলীতে রাখা হয়নি। সূত্রের খবর জেলা কমিটির বৈঠকে তা নিয়েও একপ্রস্থ নাটক হয়েছে। জানা গিয়েছে, গৌতম দেবদের সম্পাদকমন্ডলীতে নেওয়া হোক এই দাবিতে সরব হয়েছিলেন একাংশের নেতা। তাঁরাও নাকি অরাজি ছিলেন না। জেলা কমিটির বৈঠকের মাঝে ফের একবার বিদায়ী সম্পাদকমণ্ডলীর বৈঠকের তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। কিন্তু তন্ময় ভট্টাচার্য ভেটো দিয়ে তা রুখে দেন।

সিপিএমের এক নেতার কথায়, উত্তর ২৪ পরগনা বড় জেলা বলে অনেক সময়েই বাড়তি অ্যাডভান্টেজ পায় রাজ্য পার্টিতে। কিন্তু এবার যেটা হয়েছে সেটা খুবই দৃষ্টিকটূ। রাজ্য নেতৃত্ব যদি কড়া হাতে বিষয়টি না ধরে তাহলে জেলায় জেলায় নিয়ম ভাঙার অ্যানার্কি শুরু হল বলে!

You might also like