Latest News

কংগ্রেসের ঘরে যে ধন আছে…

দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত কদিন ধরে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে একটা তর্ক ক্রমশ দানা বাঁধছে। সেই তর্ক আদতে উস্কে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস লড়াই ছেড়ে দিয়েছে। ময়দানেই নেই। এবং কংগ্রেসই টিআরপি জোগাচ্ছে বিজেপিকে।

রাজনীতিতে পারশেপশন বিল্ডিং তথা ধারণা তৈরি করা বরাবরই একটা কৌশল। ইদানীং ভাড়াটে ভোট কুশলী এনে জনতা জনার্দনের মগজধোলাইয়েরও নানান ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। হীরক রাজার দেশের মস্তিষ্ক প্রক্ষালক যন্ত্রের মতো কত প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়া, পেড মিডিয়া, ভাড়াটে লেখক, ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে কারও কারও মনে হচ্ছে, সত্যিই তো! কংগ্রেস পার্টিটা কি উঠে যাচ্ছে! বিজেপি বিরোধী শক্তি বলে কি কংগ্রেসকে আর মনে করছে না মানুষ? বিকল্প মাথা তুলছে?

এই সব সাত সতেরো কৌতূহলের মধ্যে একবার তাই ঘুরে দেখা যাক কংগ্রেসের ঘরে কী ধন আছে? অর্থাৎ দেশের কত জন ভোটারের এখনও আস্থা রয়েছে কংগ্রেসের উপর।

লোকসভা ভোটে শেষ বার কংগ্রেস বৃহত্তম পার্টি হয়েছিল ২০০৯ সালে। সে বার ২০৬টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। বিজেপি জিতেছিল ১১৬টি আসন। নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতো সেই ভোটে কংগ্রেস পেয়েছিল ১১ কোটি ৯১ লক্ষ ভোট। যা ভোট পড়েছিল তার মধ্যে ২৮ শতাংশ পেয়েছিল কংগ্রেস। আর বিজেপি পেয়েছিল ১৮ শতাংশ ভোট।

কংগ্রেসের আসন সংখ্যা তার পর ধপ করে কমে গেছে। গত লোকসভা ভোট অর্থাৎ ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেস জিতেছে মাত্র ৫২ টি আসনে। স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহল হতে পারে যে, তা হলে কংগ্রেসের ভোট ১১.৯১ কোটি থেকে কত কমে গেল?

নির্বাচন কমিশনের হিসাব বলছে, ২০০৯ সালের থেকে কংগ্রেসের ভোট কিন্তু কমেনি। দশ বছর পর উনিশের লোকসভা ভোটেও কংগ্রেস পেয়েছিল ১১ কোটি ৯৪ লক্ষ ভোট। বিজেপি ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আর কংগ্রেস পেয়েছিল প্রায় ২০ শতাংশ ভোট।

মজার ব্যাপার হল ২০০৯ সালে লোকসভা ভোটে বিজেপি যখন মাত্র ১১৬টি আসন জিতেছিল, তখন তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ১৮ শতাংশ। সেই তুলনায় কংগ্রেসের ভোট শতাংশ এখনও বেশি। তা ছাড়া ৫২ টি লোকসভা আসনে কংগ্রেস জিতলেও দ্বিতীয় হয়েছে ১৯৬ টি আসনে। অর্থাৎ দেশের ৫৪৩ টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২৪৮ টি লোকসভা আসনে কংগ্রেস হয় প্রথম স্থানে রয়েছে বা দ্বিতীয় স্থানে।

এ ছাড়া এখন তিন রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে কংগ্রেস। রাজস্থান, ছত্তীসগড় ও পাঞ্জাব। দুই রাজ্যে শাসক জোটে রয়েছে—ঝাড়খণ্ড ও মহারাষ্ট্র। মধ্যপ্রদেশ ও কর্নাটকে বিধায়ক ভাঙানোর খেলা না হলে সেখানেও ক্ষমতায় থাকার কথা ছিল কংগ্রেসের। কারণ, বিধানসভা ভোটে এই দুই রাজ্যেই জিতেছিল কংগ্রেস। এ ছাড়া উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্যগুলো বাদ দিলেও ১০ টি বড় রাজ্যে কংগ্রেস এখনও প্রধান বিরোধী দল।

পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, এই পরিসংখ্যান থেকে তাই বলা যেতে পারে কংগ্রেস দুর্বল হলেও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গিয়েছে তা বলা যায় না। বরং দেশের প্রতিটি ৫ জন ভোট দাতার মধ্যে ১ জন কংগ্রেসের সঙ্গে রয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেসের ধার পুরোপুরি চলে গেছে তা বলাও মুশকিল। সদ্য বেশ কিছু রাজ্যে উপ নির্বাচন হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, হিমাচল প্রদেশে কংগ্রেস লোকসভার উপনির্বাচনেও ভাল ব্যবধানে জিতেছে। সেই সঙ্গে জিতে নিয়েছে বিধানসভার আরও তিনটি আসন। বাংলায় উপ নির্বাচনে যেমন নিরঙ্কুশ আসন জিতেছে তৃণমূল, ঠিক তেমনই।

তবে হ্যাঁ এ ব্যাপারে অনেকেই এক মত যে, নেতৃত্ব নিয়ে কংগ্রেসের বড় সংকট রয়েছে। ডানপন্থী দল ক্ষমতার বাইরে থাকলে নেতৃত্ব বার বার প্রশ্নের মুখে পড়ে। নিত্য নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। আবার সেই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর বা নতুন নেতৃত্বের জন্ম নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। যেমন ২০০৪ এবং ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে পরাজয়ের পর বিজেপিতেও নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছিল। লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলী মনোহর জোশী, রাজনাথ সিং, সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলি, নিতিন গডকড়ী, নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে পারস্পরিক টানাপড়েন কম হয়নি। দশ বছরের সেই টানাপড়েনের পর বিজেপি সংকট কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে বল্গাহীন দুর্নীতির অভিযোগের ফলে যে কংগ্রেস বিরোধিতার বাতাবরণ সেই সময়ে তৈরি হয়েছিল, তা বিজেপির সংকট কাটাতে অনুঘটকের কাজ করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, এক সময়ে কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে যে অনাস্থার বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, এখন সেই রোগে ভুগতে শুরু করেছে মোদী সরকারও। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ইউপিএ সরকার যে বেঞ্চমার্ক তৈরি করে গিয়েছিল, তার উর্ধ্বে যেতে পারেনি বর্তমান সরকার। অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় কোনও সাফল্য নেই। বরং কৃষক আন্দোলন শাসক দলের দম্ভকে চুরমার করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের ঘরে যে ধন রয়েছে তা মোটেও কম নয়। প্রায় ১২ কোটি মানুষের সমর্থন রয়েছে সাবেক দলের। ঘুরে দাঁড়ানোর এখন সুবর্ণ সুযোগ।

You might also like