Latest News

স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুতে চর্চায় লালবাজার লকআপে চারু মজুমদারের মৃত্যু, তদন্তের দাবি ছেলেরও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একজন মারা যান ৪৯ বছর আগে। গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল তাঁর মৃত্যুর ৪৯তম বার্ষিকী। অন্যজন সদ্যপ্রয়াত। কিন্তু দুটো মৃত্যুর মধ্যেই যোগসূত্র দেখতে পাচ্ছেন দেশের বহু মানুষ। দু’জনেই মারা গিয়েছেন বন্দি অবস্থায়, রাষ্ট্রের হেফাজতে। দু’জনের ক্ষেত্রেই অভিযোগ, চিকিৎসার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের, যা আসলে রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়ার শামিল। একজন ফাদার স্ট্যান স্বামী। আর একজন চারু মজমদার।

দিন কয়েক আগে পুলিশি হেফাজতে মারা গিয়েছেন ভীমা কোরেগাঁও মামলায় বন্দি বৃদ্ধ স্ট্যান স্বামী। গুরুতর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। এমনকী আদালতও তাঁর বিষয়ে সময় মতো পদক্ষেপ করেনি বলে অভিযোগ। স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুতে গর্জে উঠেছে দেশের নাগরিক সমাজ। তাঁকে নিয়ে আলোচনায় বারবারেই উঠে আসছে চারু মজুমদারের মৃত্যুর প্রসঙ্গ।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, লালবাজার লকআপে চারুবাবুর মৃত্যুর মতো পুলিশ হেফাজতে অমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা খুব কমই আছে। তাঁর পুত্র অভিজিৎ এবং মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র আদালতে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, পুলিশ লকআপে চারু বাবুকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর তাঁকে জীবনদায়ী ওষুধপত্র দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে বাংলা পিপলস মার্চের সম্পাদক স্বপন দাশগুপ্তর এসএসকেএম হাসপাতালে মৃত্যুর কথাও তুলেছেন কেউ কেউ। বলা হত, পত্রিকাটি ছিল মাওবাদীদের মুখপত্র। ২০০৯-এ এসএসকেএম-এ মারা যান স্বপন। তাঁর ব্লাড ক্যানসার হয়েছিল। অভিযোগ, বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি।

স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু ঘিরে আলোচনায় চারুবাবুকে পুলিশ লকআপে হত্যার অভিযোগটি নিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি উঠতে শুরু করেছে। গতকাল চারুবাবুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে শিলিগুড়িতে আয়োজিত এক সভায় এই দাবি ফের তুলেছেন তাঁর পুত্র অভিজিৎ। কলকাতায় একই দাবি উত্থাপন করেছেন মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র।

তাঁদের বক্তব্য, চারু মজুমদার, সরোজ দত্ত-সহ ষাট-সত্তরের দশকে পুলিশের হাতে নিহত হাজার পাঁচেক মানুষের খুনের তদন্ত হওয়া দরকার। পৃথিবীতে এমন তদন্তের বহু নজির আছে। সুজাত বলেন, আমি চারুবাবুদের রাজনীতি নিয়ে কিছু বলছি না। কিন্তু মানবাধিকার হরণের এমন সব দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও তদন্ত না হওয়াটা দুর্ভাগ্যের।

গত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি নাগাদ প্রকাশিত হয়েছিল লালবাজারের ঝানু গোয়েন্দা বলে পরিচিত অফিসার রুণু গুহনিয়োগীর আত্নজীবনীমূলক বই ‘সাদা আমি কালো আমি’। অভিজিৎ, সুজাতদের বক্তব্য, রুণু গুহনিয়োগীর বইয়ে চারুবাবুর মৃত্যু নিয়ে এমন অনেক তথ্য সামনে আসে, যা নকশালপন্থী এবং মানবাধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল। তার মধ্যে অন্যতম হল, পুলিশ হেফাজতে চারুবাবুর চিকিসা বন্ধ করে দেওয়া। গোপন ডেরা থেকে চারুবাবুকে রুণু গুহনিয়োগীই গ্রেফতার করেছিলেন।

ওই বইয়ের বক্তব্যকে হাতিয়ার করে নয়ের দশকের শেষ প্রান্তে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন অভিজিৎ ও সুজাত। সেই মামলায় তাঁদের আইনজীবী ছিলেন এমন দু’জন, যাঁরা বর্তমানে দেশের দুটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। আইনজীবী হিসেবে তাঁরা জোরদার লড়াই চালান, যাতে চারুবাবু সহ পুলিশের হেফাজতে নিহত নকশাল নেতা-কর্মীর মৃত্যুর তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার আদালতে জানায়, ওই সংক্রান্ত কোনও পুলিশ ফাইলের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আদালত তদন্তের দাবি মঞ্জুর করেনি। পরে সুপ্রিম কোর্টও তদন্তের দাবি খারিজ করে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর কংগ্রেস জমানায় কাশীপুর-বরানগর গণহত্যা নিয়ে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করলেও সত্তরের দশকের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঘটনাগুলি নিয়ে কোনও তদন্ত হয়নি। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দুটি তদন্ত কমিটি গড়লেও সেগুলির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। উল্টে অত্যাচারী অফিসার হিসেবে পরিচিত রুণু গুহনিয়োগীর পদোন্নেতির ব্যবস্থা করে। বিভিন্ন সংগঠন তাঁর সাজা দাবি করলেও বামফ্রন্ট সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং অর্চণা গুহ নিয়োগীর উপর অত্যাচারের অভিযোগের মামলায় সরকার আদালতে রুণুর পক্ষ নেয়।

চারুবাবুর মৃত্যু নিয়ে তদন্তের পুরনো দাবি আবার উঠে আসছে স্ট্যান স্বামীর হেফাজত মৃত্যু নিয়ে আলোচনা, প্রতিবাদ সভায়। স্ট্যান স্বামী পার্কিনসন্স রোগের শিকার ছিলেন। সঙ্গে বয়সজনিত একাধিক অসুস্থতা। চারু মজুদারেরও একাধিক ক্রনিক অসুস্থতা ছিল। স্ট্যানকে তাঁর রাঁচির বাড়ি থেকে মুম্বইতে নিয়ে গিয়ে জেলবন্দি করা হয়। আদালতের কাছে তিনি তাঁর দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে যে সব সুবিধা চেয়েছিলেন সেগুলি দিতেও দু’মাসের উপর দেরি করা হয়। অভিযোগ, চারু মজুমদারকেও তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা তো দূরের কথা, দরকারি ওষুধও দেওয়া হয়নি।

দীর্ঘ ৯ মাসের কারাগারবাসে স্ট্যান স্বামীর কোভিড ধরা পড়লে আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করতেও একপ্রকার ঢিলেমি দেখায় আদালত। ব্যবস্থা নেওয়া হয় শেষ মুহূর্তে, যখন আর কিছু করবার আগেই স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু হয় মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। মৃত্যুর দিনেই তাঁর জামিনের আবেদনের শুনানি ছিল বম্বে হাইকোর্টে।

You might also like