Latest News

দ্বীপান্তর! চাবুকের ঘা আর সিগারেটের ছ্যাঁকায় দেশপ্রেমের ইতিহাস লিখেছিল সেলুলার জেল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭। ৮৯ বছর। ভারতের পূর্ব প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের মাঝে অবস্থিত একফোঁটা ভূখন্ড আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (Andaman and Nicobar Islands)। ৮৯ বছর ধরে সেখানেই লেখা হয়েছে নির্মমতার চরম ইতিহাস। সে ইতিহাসই ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের পাতায় আন্দামানের সেলুলার জেলকে (Cellular Jail) অক্ষয় করে রেখেছে।

cellular jail

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত ব্রিটিশ আমলের এই কারাগার এখন দর্শনীয় স্থান। আন্দামানের জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট সেলুলার জেল। ফেলে আসা ইতিহাস এই জেলের অন্দরে আজও যেন মূর্ত হয়ে রয়েছে। দ্বীপে ঘুরতে গেলে তা ছুঁয়ে আসেন পর্যটকরা।

Kalapani Jail- The Black Terror - Leagle Samiksha

পরিসংখ্যান বলছে, সেলুলার জেলে মোট ৫৮৫ জন ভারতীয় বন্দিকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেন্ট্রাল টাওয়ারের নীচে তাকালেও দেখা যায় এই পরিসংখ্যান। সেই বীর বিপ্লবীদের মধ্যে ৩৯৮ জনই বাঙালি। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামকে যে দীর্ঘ সময় ধরে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল বাঙালিরাই, সেলুলার জেলের পরিসংখ্যানেও তা স্পষ্ট হয়ে রয়েছে।

Cellular Jail (Port Blair) - Visitors Guide 2022 - Go2andaman.com

ভারতে রাজত্ব করতে এসে ব্রিটিশ সরকার প্রথম ধাক্কাটা খেয়েছিল ১৮৫৭ সালে। সিপাহি বিদ্রোহের সময় ভারতীয় বিপ্লবীরা চিনিয়ে দিয়েছিলেন তাঁদের জাত। আর সেই থেকেই ভারতের বুকে মাথা চারা দিয়ে ওঠা দেশপ্রেমের অঙ্কুরগুলো বিনাশ করার তোড়জোড় করেছিল ইংরেজ সরকার। মূল ভূখন্ড থেকে অনেকটা দূরে, সাগরের মাঝে দ্বীপে পাহাড় কেটে তারা তৈরি করেছিল কারাগার। ব্রিটিশ আদালতে ভারতীয় বন্দিদের বিচার হত, হয় তাঁদের কপালে জুটত ফাঁসির সাজা। আর না হলে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর।

Andaman Cellular Jail: Ultimate Travel Guide -

আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ এই দ্বীপান্তরের নাম শুনেই শিউরে উঠতেন। কিন্তু বিপ্লব যাঁদের রক্তে বহমান, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ভারতের সেই বীর সন্তানেরা আন্দামানের এই সেলুলার জেলকে বরণ করে নিয়েছিল মন্দিরের মতো। এই জেলে আসতে পারলেই যেন তাঁদের শান্তি।

Inside Cellular Jail: the horrors and torture inflicted by the Raj on  India's political activists | The Independent | The Independent

অথচ সেলুলারের কক্ষে কক্ষে নরক যন্ত্রণা লেখা থাকত রাজবন্দিদের জন্য। ফাঁসিতে মুক্তি পেতেন না যাঁরা, তাঁদের ঠাঁই হত এই জেলের একচিলতে বদ্ধ প্রকোষ্ঠে। চাবুকের ঘা থেকে শুরু করে সিগারেটের ছ্যাঁকা, অমানুষিক অত্যাচার বন্দিদের কাছে ছিল জলভাত। তাঁদের পাটের পোশাক পরতে দেওয়া হত, যাতে একটা সময়ের পর চামড়ায় ফুটে উঠত দগদগে ঘা। আন্দামানের জেলের মধ্যে অজস্র মশার উপদ্রব ছিল, যা প্রতিরোধের জন্য কোনও ব্যবস্থা নেয়নি ব্রিটিশ সরকার। সেলুলারে বন্দিদের শৌচকর্মের জন্য দেওয়া হত সমুদ্রের নোনা জল। পানের জলও ছিল সামান্য বরাদ্দ। আধপেটা খেয়ে, তেষ্টা মুখে নিয়েই বন্দিদের টানতে হত তেলের ঘানি।

Cellular Jail : Timing,Updated Photos,History and reviews 2022

জেলের মধ্যে বন্দিরা যাতে পরস্পর কথাবার্তা বলতে না পারেন, তাই ভিন্ন ভাষাভাষির বন্দিদের পাশাপাশি সেলে রাখা হত। বাঙালির পাশে বাঙালি জায়গা পেতেন না। তবে ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে দেওয়ালে টোকা মেরে মেরে কথা বলার উপায় করে নিয়েছিলেন বন্দিরা। ভাষার দূরত্ব সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

File:INSIDE OF CELLULAR JAIL.jpg - Wikimedia Commons

এই জেলেই ছিলেন বারীন ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীদের মতো বিপ্লবীরা। জেলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁরা সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। বেছে নিয়েছিলেন আমরণ অনশনের পথ। কিন্তু ব্রিটিশরা জোর করে তাঁদের গলায় নল ঢুকিয়ে খাবার খাইয়েছিল বলে শোনা যায়।

Cellular Jail In Andaman And Nicobar

সেলুলার জেলে ব্রিটিশের অমানুষিক অত্যাচারে দিশাহারা হয়ে কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। অত্যাচারে মৃত্যু হলে দেহ সৎকার করা হত না, সমুদ্রের জলে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হত।

১৮৫৮ সালে ৩ কোটি ইঁট খরচ করে আন্দামানের সাগরপাড়ে দ্বীপান্তরের কারাগার বানিয়েছিল ব্রিটিশরা। ১৯০৬ সালে তার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় কারাগার হিসেবে। সেলুলারের প্রতিটি ইঁটে আজও লেগে আছে বীর বিপ্লবীদের রক্ত, ঘাম আর তার সঙ্গে চুঁইয়ে পড়া দেশপ্রেম।

আরও পড়ুন: ১৫ আগস্ট ১৯৪৭, এই অবিস্মরণীয় ঘটনাগুলির সাক্ষী ছিল আনন্দে দিশেহারা কলকাতা

You might also like