Latest News

Boichoi: বাংলা বই ও পাঠকের দূরত্ব মুছে যেতে বসেছে, নেপথ্যে দুই বাঙালি টেকি

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

গত সপ্তাহেই শেষ হয়েছে কলকাতা বইমেলা। দু’বছর বন্ধ থাকার পরে মেলা হওয়ায় যেমন আনন্দের বান ডেকেছে বইবিক্রেতা থেকে শুরু করে বইপ্রেমীদের মধ্যে, তেমনই অনেকেরই মনে হচ্ছে, মাত্র দু’সপ্তাহের মেলায় যেন আশ মিটল না। সারা বছর ধরেই এমন মেলা চললে ভাল হতো।

এমনটা মনে হওয়া অমূলক নয়। সারা বছর ধরে এমন করে একসঙ্গে এত বইয়ের সমাহার দেখা ও কেনার (Book shopping) সুযোগ আর কোথায় মেলে! বই কেনা বলতে সেই কলেজস্ট্রিটের বইপাড়া। সেখানে গিয়ে ঘুরে ঘুরে বই কেনা অনেক সময়ই হয়ে ওঠে না অনেকের। যাঁরা কলকাতার বাইরে থাকেন তাঁদের জন্য তো কার্যত অসম্ভব। এমনকি বইপাড়ায় কী কী নতুন বই কবে আসছে, সে খোঁজও মেলে না ঠিকমতো। এ আক্ষেপ বইপ্রেমীদের বহুদিনের।

এবার সমাধান এসেছে বইয়ের বাজারে। একেবারে হইহই করে এসে গিয়েছে ‘বইচই’ (Boichoi)। বছর খানেকের কিছু বেশি সময়ে হাজার হাজার পাঠকের কাছে পছন্দের বইয়ের খোঁজ দেওয়া, বই পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে এই প্ল্যাটফর্ম। দেশ-বিদেশের বাঙালি পাঠকের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে আয়ত্তের মধ্যে থাকা অর্থমূল্যের বিনিময়ে। মনের মতো বই যে এমন ঘরে বসে এক ক্লিকেই হাতের নাগালে পাওয়া যেতে পারে, তা যেন বহু পাঠকের কাছেই এত দিন স্বপ্ন ছিল!

বইচইয়ের (Boichoi) নেপথ্যে

এই স্বপ্নপূরণের নেপথ্যে যে দুই বাঙালি রয়েছেন, তাঁদের আক্ষরিক অর্থে ‘বইওয়ালা’ বলা যায় না। বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আঙিনায় তাঁদের চলাচল বেশি। একজন ডেটা সায়েন্সে বিশেষজ্ঞ তো অন্য জন বাঘা প্রযুক্তিবিদ। কিন্তু কেবল বাংলা বইকে ভালবেসে যে নিজেদের অতি উজ্জ্বল পেশাগত কেরিয়ারের পাশাপাশি এমন একটি কাজে হাত দেওয়া যায় এবং সে কাজকে একটা অন্য মাত্রা দেওয়া যায়, তার উদাহরণ অংশুমান ভট্টাচার্য এবং চয়ন মজুমদার।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার পরে মুম্বই চলে গিয়েছিলেন অংশুমান। কয়েক দিন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার পরে সেই জার্নালেরই অনলাইন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এর পরে ডেটাসায়েন্স নিয়ে দীর্ঘদিন বড় কোম্পানিতে চাকরি করা, কলকাতায় ফেরা এবং ডেটা সায়েন্স নিয়েই নিজের একটি সংস্থা তৈরি করে নিজের পেশায় সফল তিনি।

চয়ন আবার ২০ বছর ধরে সারা বিশ্বের নানা প্রান্তে একাধিক সংস্থায় কাজ করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে। এখন তিনি সিঙ্গাপুরে কর্মরত। তার পাশাপাশিই চলছে তাঁর বাংলা বই নিয়ে এই কাজ। বইচইয়ের (Boichoi) যুগ্ম মালিকানা এখন অংশুমান এবং চয়নেরই।

অংশুমান ভট্টাচার্য বললেন, “আমাদের এই ব্যবসায় আসার এমনি কোনও কারণ ছিল না। বাংলা বই পড়তে, বাংলা লিখতে আমি ভালবাসি। বইয়ের প্রতি আকর্ষণ আছে। আমি নিজে দীর্ঘকাল কলকাতার বাইরে থেকেছি। সেই সময় আমি দেখেছিলাম, বাংলা বই খুব একটা পাওয়া যায় না। সারা দেশ জুড়েই যেন দুষ্কর ব্যাপার। অথচ আমি জানি, বাংলা বইয়ে ভাল কনটেন্টের অভাব নেই। এই এত ভাল কনটেন্ট, প্রকাশকরা এত যত্ন করে বই করছেন, সেগুলো কেন পাঠকের কাছে পৌঁছবে না! সেই জায়গা থেকেই এই কাজে আসা।”

এ প্রসঙ্গে চয়ন আবার জানালেন, বাঙালিরা যে ব্যবসাবিমুখ, সেই ধারণাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন তিনি। সেটা ভেঙেওছেন, একেবারে অন্যভাবে। তাঁর কথায়, “বইচই এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ওয়েবসাইট বা অ্যাপটি খোলামাত্রই বাংলা বইয়ের যে কোনও পাঠকেরই মন ভাল হতে বাধ্য। তিনি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও স্বপ্নের এক বই-জগতে হারিয়ে যাবেন। ঠিক এখানেই বইচইয়ের বিশেষত্ব। এখানেই বইচই আর পাঁচটা বিপণনী সাইটের থেকে আলাদা। এটি কেবল বই বিক্রি করে না, বইয়ের সঙ্গে পাঠকের এক গভীর আত্মিক সংযোগও স্থাপন করে। ২০ হাজারেরও বেশি বাংলা বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে সারা বিশ্বের বাংলা পাঠকদের কাছে এই কাজটি করে চলেছে বইচই।”

সে কথার রেশ ধরেই অংশুমান বললেন, “পাঠককে সর্বক্ষণ বাংলা বইয়ের খোঁজ জুগিয়ে যাওয়ার পিছনেও আমাদের চেষ্টার অন্ত নেই। প্রকাশকরা আমাদের এই ব্যাপারে খুবই সাহায্য করছেন, নিয়মিত জানাচ্ছেন বইয়ের খবর। আমরা সে সব গুগল সার্চে আপডেট করছি। ডিজিটাল মার্কেটিং করছি। শুধু তাই নয়, আমাদের একটা টিম রয়েছে, যাঁরা প্রায় রোজই কলেজ স্ট্রিটে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন প্রকাশকের কাছ থেকে জানছেন, কী বই আসছে, কতগুলি করে সংস্করণ, কেমন চাহিদা। এই সমস্ত তথ্য একছাতার তলায় আসছে অনেক দ্রুত এবং অনেক স্বচ্ছভাবে। সব মিলিয়ে বই বিক্রি এখন অন্য মাত্রা পেয়েছে। প্রকাশকরাও বুঝেছেন, বই বিক্রির আঙিনা কতটা বড় হতে পারে।”

চয়ন এই প্রসঙ্গে আরও জানান, “আমরা এই কাজে প্রযুক্তির উপর একটা বড় ভরসা করেছি। আমাদের কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছি। এবং এটি বেশি কাজে লেগেছে এই মহামারীর সময় থেকে। ঘরে বসে মানুষ এখন অনেক বেশি অলাইন-নির্ভর। তাহলে বই পড়াও বা কেন তেমনই হবে না, সে মোবাইলের স্ক্রিনে পড়াই হোক বা হাতে নিয়ে বাংলা বই পড়াই হোক।”

আরও একটা বিষয় হল, বইচই (Boichoi) কিন্তু পুরোপুরি পরিবেশ বান্ধব। প্যাকিং-শিপিংয়ে কোনও প্লাস্টিক ব্যবহার হয় না। গোটা পদ্ধতিতে কেবল ঠিকানা লেখা চিরকুটটি ছাড়া আর কোনও কাগজও ব্যবহার করা হয় না। পরিবেশের যতটা কম ক্ষতি করা যায়, সেটাও অংশুমান-চয়নদের নজরে রয়েছে।

এই মুহূর্তে বইচইয়ের (Boichoi) গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সওয়া এক লক্ষ, যাঁরা অন্তত একবার না একবার বই কিনেছেন এই ওয়েবসাইট থেকে। দু’বছর ধরে একাধিক বার নিয়মিত বই কিনে গেছেন, এই সংখ্যাটা ৩৭ হাজার। শুধু তাই নয়, বইচইয়ের ভাণ্ডারে এমন ২০০০ বই রয়েছে, যেগুলি মাসে অন্তত একটি না একটি বিক্রি হয়ই। অর্থাৎ বাংলা বইয়ের বাজারে পাঠকের রুচি ক্রমেই ধরা পড়ছে বইচইয়ের বিশাল সংগ্রহের কাছে। এই পদ্ধতিকেই ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করে তোলাই আপাতত লক্ষ্য অংশুমান-চয়নের। তাই শুধুই অনলাইন বিক্রিতে আটকে না থেকে তাঁরা পা বাড়িয়েছেন অফলাইনে ফ্রাঞ্চাইজি দেওয়া, অডিও বুক, ই-বুক তৈরি করা– এসব কাজেও। পাশাপাশি মিলবে এই বাংলার বিভিন্ন হস্তশিল্প, ছবি, গয়নাগাঁটি ইত্যাদিও।

এককথায় বলতে গেলে, এক ছাদের তলায়, থুড়ি, এক স্ক্রিনের তলায়, পরিবেশবান্ধব উপায়ে আগামীকে বাংলা বইয়ে ডুবিয়ে রাখার দিশা দেখাচ্ছে বইচই।

স্কুলে শিশুরা এবার পড়বে গীতা! গুজরাতের শিক্ষানীতিতে ‘নয়া’ সংযোজন

You might also like