Latest News

‘নোভার্টিস’ লটারি জিতল ১১ মাসের দিয়া, ১৬ কোটির ওষুধ বিনামূল্যে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১১ মাসের ছোট্ট মেয়ে ভুগছিল বিরল জেনেটিক অসুখে। বিকল হয়ে যেতে বসে স্নায়ু। মরণাপন্ন শিশুটিকে বাঁচাতে যে ওষুধের দরকার ছিল, ‘জ়োলজেন্সমা’,  তা বিশ্বে সবচেয়ে দামি ওষুধগুলির মধ্যে একটি। এর একটি ডোজেরই দাম ১৬ কোটি টাকা। ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারে যা ভাবনাচিন্তারও বাইরে। কিন্তু সন্তানের জন্য কি আশা ছাড়তে পারেন কোনও বাবা-মা? তাই বেঙ্গালুরুর তরুণ দম্পতি ভাবনা এবং নন্দগোপাল ক্রাউডফান্ডিং করছিলেন তাঁদের সন্তান দিয়ার জন্য, টাকা জোগাড়ের সমস্ত রকম উপায় বার করছিলেন একটা একটা করে।

কে জানত, এই প্রবল চেষ্টার শেষে অপেক্ষা করে রয়েছে ম্যাজিক! জানা গেছে, গত মাসে একটি ফোনকল আসে ভাবনা-নন্দগোপালের কাছে। তাঁদের বলা হয়, তাঁদের মেয়ে দিয়া নোভার্টিস লটারি জিতেছে! নোভার্টিস হল মার্কিন ওষুধ নির্মাতা সংস্থা, যারা এই ‘জ়োলজেন্সমা’ ওষুধ তৈরি করে। সেই ১৬ কোটি টাকার ওষুধ, যা দিয়ার প্রাণ বাঁচাতে পারে! লটারি জিতে, এই ওষুধটি বিনামূল্যে পেয়েছে দিয়া।

এই ওষুধটি যদি কেউ কিনতে চান, তাহলে তাঁকে আবেদন করতে হয়, নোভার্টিসের কাছে। পাঠাতে হয় রোগীর রক্তের নমুনা। তা দেখে নোভার্টিস সিদ্ধান্ত নেয়, রোগী আদৌ এত দামী ওষুধটি নিতে পারবে কিনা। যদি তা না হয়, তাহলে আবেদন খারিজ হয়।

দিয়ার যখন সাত মাস বয়স, তখন ধরা পড়ে সমস্যা। দিয়ার মা ভাবনা পেশায় একজন পেডিয়াট্রিক ফিজিওথেরাপিস্ট। তিনিই লক্ষ্য করেছিলেন, সমস্যা রয়েছে সন্তানের। সবরকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। এর পরে বেঙ্গালুরুর ব্যাপটিস্ট হাসপাতালের ডাক্তাররা জানান, সে বিরল জিনগত রোগ স্পাইনাল মাস্কুলার অ্যাট্রপি (এসএমএ), টাইপ টু-তে আক্রান্ত। এই রোগে গোটা স্নায়ুতন্ত্রই পঙ্গু হয়ে যেতে শুরু করে। একমাত্র প্রাণ বাঁচাতে পারে জ়োলজেন্সমা ড্রাগ, যার দাম ১৬ কোটি টাকা। দু’বছর বয়স হওয়ার আগেই এই ওষুধ দিতে হয়।

দিয়ার নমুনা পাঠানো হয় নোভার্টিসে। সে ওষুধটি নিতে পারবে বলে জানায় সংস্থা। তাই দিয়ার মা, বাবা ভাবনা ও নন্দগোপাল জোরকদমে ক্রাউড ফান্ডিং শুরু করেন। কয়েক দিনের চেষ্টায় ২.৭ কোটি টাকা তুলেও ফেলেন তাঁরা। তবে তা ১৬ কোটির টার্গেটের তুলনায় কিছুই নয়। তবে সমস্যার সমাধান করে ফেলে নোভার্টিসের লটারি।

বস্তুত, নোভার্টিসের ‘গ্লোবাল ম্যানেজড অ্যাকসেস প্রোগ্রাম’-এর আওতায় এই বিরল রোগে আক্রান্ত ১০০টি শিশু বিনামূল্যে এই ইঞ্জেকশন পায় প্রতি বছর। ওষুধটি করা পাবে তা স্থির করার জন্য একটি লটারি করা হয়। যাতে কোনও সন্দেহের অবকাশ না থাকে, তাই লটারি করে তৃতীয় কোনও পার্টি। সেই লটারিতেই এবছর নাম ওঠে ১০০ জন শিশুর। ছোট্ট দিয়া তাদেরই মধ্যে একজন।

নোভার্টিসের জিন থেরাপিতেই এই ওষুধের প্রয়োগ হয় যা মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের স্বীকৃতি পেয়েছে। নোভার্টিসের নিজস্ব ফান্ড আছে যেখানে এই ওষুধ কেনার জন্য টাকা জমা করা যায়। তবে সেই টাকা থেকে কিনে দেওয়া ওষুধ যে দিয়া পাবে, তা কেউই প্রথমে ভাবতে পারেননি।

শেষমেশ ১৮ নভেম্বর নোভার্টিস জানায়, ২৭ তারিখ ওষুধটি পেয়ে যাবে দিয়া। পেয়েও যায় সময়মতো। স্বস্তির শ্বাস ফেলেন বাবা-মা।

স্পাইনাল মাস্কুলার অ্যাট্রপি (এসএমএ) রোগ কী?

স্নায়ুর রোগ যা জিনগত ত্রুটির কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। বংশপরম্পরায় ছড়াতে পারে বাবা-মায়ের থেকে সন্তানের শরীরে।

আমরা জানি, মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ুর মাধ্যমে ইলেকট্রিক সিগন্যাল বা বার্তা বা সঙ্কেত চলে আসে পেশিতে। ঐচ্ছিক পেশির সঞ্চালন এই সঙ্কেতের ওপরেই নির্ভর করে। এখন যদি কোনওভাবে মস্তিষ্ক থেকে বার্তা স্নায়ু আর বয়ে নিয়ে যেতে না পারে, তাহলে পেশিও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। পেশির সমস্ত সঞ্চালন তথা নড়াচড়া বন্ধ হতে থাকে। ফলে মানুষ আর হাত-পা, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ চালনা করতে পারে না। ডাক্তাররা বলেন, শিশুদের স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রপির টাইপ-১ ও টাইপ-২ রোগ বেশি মারাত্মক। ঘাড় নরম হয়ে ব্যালান্স হারিয়ে যায়, হাত-পা অবশ হতে থাকে, হাঁটাচলা করতে পারে না শিশু। উঠে বসতেও সমস্যা হয়। খাবার গিলতে, কথা বলতে সমস্যা হয়, শ্বাসযন্ত্রের রোগও দেখা যায়। এসএমএ হলে দু’বছরের বেশি বাঁচতে পারে না শিশু। প্রতি দশ হাজার শিশুর মধ্যে একজন এই বিরল স্নায়ুর রোগে আক্রান্ত হয় প্রতি বছর।

বেঙ্গালুরুর ব্যাপটিস্ট হাসপাতাল বহু বছর ধরেই এই বিরল এসএমএ রোগের চিকিৎসায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে গোটা দেশে। ভাবনা বলেন, “ওদের সিস্টেম খুব ভাল। সকলকে গাইড করেন ওঁরা। কত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা হবে, সেটারও ব্যবস্থা করেন ওঁরাই।” নন্দগোপাল বলেন, “গোটা বছরটা চোখের পলকে কেটে গেল রোলারকোস্টারের মতো। জানুয়ারিতে দিয়া জন্মাল, জুলাই থেকে আমাদের যুদ্ধ শুরু। নভেম্বরে ও ওষুধটা পেল।”

ভাবনা ও নন্দগোপাল জানান, দিয়া ওষুধটি পাওয়ার দু’সপ্তাহের মধ্যেই তার মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন, আগে দিয়া শুয়ে থাকলে ওর পা উঁচু করে ধরলে, সেটা রাখা যেত না। নীচে পড়ে যেত। এখন দিয়া কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও পা-টা উঁচু করে ধরে রাখতে পারে। আগে ওর গোটা শরীর খুব স্টিফ হয়ে যেত। এখন একটু হলেও স্বাভাবিক। বেড়েছে গলার জোরও।তবে দিয়ার যেহেতু জিন-থেরাপি চলছে, তাই তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখন বেশ দুর্বল। এখন মা-বাবার চ্যালেঞ্জ, দিয়া যেন কোনও সংক্রামক অসুখের কবলে না পড়ে। খুব দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়বে তাহলে সে।

নন্দগোপাল জানিয়েছেন, এ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাছে তাঁর প্রত্যাশা, এই ধরনের সমস্ত জেনেটিক অসুখকে বিমার আওতায় আনা হোক। কারণ এই অসুখগুলো বিরল হলেও অসম্ভব নয়। অনেক বাবা-মাই তাঁদের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করছেন।

You might also like